অভয়কর বিশ্বাসকেও অত্যন্ত উত্তেজিত মনে হলো।
মাসুদ ইরানীর লোককে দেখে তিনি এগিয়ে এলেন, নিজেকে কিছুটা প্রকৃতিস্থ করবার চেষ্টা করে বললেন–আপনি মাসুদ ইরানীর ওখান থেকে এসেছেন বুঝি?
মাথার ক্যাপ খুলে সাহেবী কায়দায় কুর্ণিশ জানিয়ে বললো মাসুদ ইরানীর লোক–হাঁ, আমি তাঁর ওখান থেকেই এসেছি। আপনি বুঝি–
হাঁ আমিই মিঃ বিশ্বাস। একটু থেমে বললেন অভয়কর বিশ্বাস–এই কিছুক্ষণ পূর্বে আমার একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। বসুন আপনি।
মাসুদ ইরানীর লোক আসন গ্রহণ করবার পূর্বে বললো–আমার নাম সাঈদ ইরানী, সম্পর্কে আমি মাসুদ। ইরানীর ছোট ভাই। ভাই-এর কথায় আমি আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে এসেছি।
ধন্যবাদ! খুশি হলাম অনেক। বললেন অভয়কর বিশ্বাস।
সাঈদ ইরানী অদূরস্থ ভীম সিং-এর যন্ত্রণা-বিকৃত মুখখানার দিকে তাকিয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বললো–আপনার দুর্ঘটনার জন্য আমি দুঃখিত, জানি না কি ঘটেছে?
অভয়কর বিশ্বাস গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–কিছুক্ষণ পূর্বে এক জমকালো পোশাক-পরা দুবৃত্ত আমার অফিস রুমে হানা দেয় এবং আমার বিশ্বস্ত কর্মচারী ভীম সিংকে রিভলভারের গুলীতে আহত করে পালিয়ে যায়।
আশ্চর্য! সে শুধু ভীম সিংকে আহত করেই পালায়? টাকা-পয়সা—
না, সে সব নেবার সুযোগ তার হয়নি।
এমন সময় বাইরে পুলিশ ভ্যানের হর্ণের শব্দ শোনা যায়।
অভয়কর বিশ্বাস বলেন–পুলিশ এসেছে।
কক্ষের বাইরে ভারী বুটের শব্দ শোনা যায়।
সাঈদ ইরানী তার মাথার ক্যাপটা আর একটু টেনে দেয় সম্মুখে।
কক্ষে প্রবেশ করেন ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ এবং লালবাজার থানার ওসি মিঃ ভৌম। পিছনে দু’জন। পুলিশ।
অভয়কর বিশ্বাস তাদের অভ্যর্থনা জানালেন।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ বললেন–দুবৃত্ত আপনার কর্মচারীকে জখম করার সঙ্গে সঙ্গেই পালিয়েছে?
হ ইন্সপেক্টার!
কিন্তু এখন আমরা কি করতে পারি বলুন?
তবু পুলিশে সংবাদ না দিয়ে পারলাম না। দেখুন দুবৃত্ত আমার পিছনে ভয়ানকভাবে লেগেছে। সব সময়। আমাকে আশঙ্কা নিয়ে কাটাতে হচ্ছে। আচ্ছা আপনারা বসুন, আমি সব খোলসা করে বলছি।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ এবং মিঃ ভৌম আসন গ্রহণ করলেন।
অভয়কর বিশ্বাস বললেন–হাঁ, তার পূর্বে এর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই। ইনি বিখ্যাত পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানীর সহোদর সাঈদ ইরানী।
সাঈদ ইরানী কুর্নিশ জানালো সাহেবী কায়দায়।
ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ এবং মিঃ ভৌম হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডসেক করলেন সাঈদ ইরানীর সঙ্গে।
তারপর অভয়কর বিশ্বাস দুবৃত্ত সম্বন্ধে সমস্ত বর্ণনা করলেন, শুধু চেপে গেলেন তিনি শ্রমিক সর্দার নাসির। আলীর সম্পর্কে সব কথা। পুলিশ অফিসারদ্বয় ডায়েরী করে চললেন।
সাঈদ ইরানী গম্ভীর মুখে সব শুনলো। অভয়করের মিথ্যা উক্তি শ্রবণে এক টুকরা হাসির রেখা ফুটে উঠলো তার মুখে।
এবার সাঈদ ইরানী উঠে দাঁড়ালো– চলি আবার দেখা হবে মিঃ বিশ্বাস, গুড নাইট।
পুলিশ অফিসারদ্বয়ের সঙ্গে পুনরায় করমর্দন করলো সে; তারপর বেরিয়ে গেলো অফিস-রুম থেকে।
অফিস-রুমের অদূরেই সাঈদ ইরানীর প্লিমাউথ গাড়িখানা দাঁড়িয়েছিল। গাড়ির ড্রাইভ আসনে বসে ষ্টার্ট দিলো সে।
নাইট গার্ড লৌহগেট খুলে ধরলো, নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেলো সাঈদ ইরানীর বিরাট প্লিমাউথখানা।
বালিগঞ্জ হয়ে গাড়িখানা সোজা কালীঘাট অভিমুখে ছুটে চললো।
*
কালীঘাট বজ্ৰবিহারী দেব শর্মার বাড়ির পিছনে এসে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো সাঈদ; ইরানী কিন্তু এখন তার দেহে সম্পূর্ণ জমকালো পোশাক। মুখে কালো গালপাট্টা, দক্ষিণ হস্তে রিভলভার।
বজ্ৰবিহারীর বিরাট বাড়ির দ্বিতল একটি কক্ষে তখনও আলো জ্বলছে।
জমকালো মূর্তি বাড়ির প্রাচীর বেয়ে উঠে গেলো উপরে, তারপর যে কক্ষে আলো জ্বলছিলো সে কক্ষের পিছনে পানির পাইপ বেয়ে দ্বিতলে এসে পৌঁছলো।
এ কক্ষ বজ্ৰবিহারী দেব শর্মার শয়নকক্ষ।
কলকাতার নামকরা ব্লাক মাচ্যান্ট’ বজ্রবিহারী শর্মাকে সবাই চেনে। এমন একটা হৃদয়হীন জঘন্য মনোবৃত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিকে কেউ সমীহ না করলেও তার পরম আত্মীয়ের অভাব হয় না। মানুষের সর্বনাশ করে দুটো পয়সা সংগ্রহ করতে তার এতটুকু বাঁধতো না।
শুধু বজ্রবিহারী শৰ্মাই নয় এমনি আরও অনেক ব্যক্তিই আছেন যাদের নাম কালো মূর্তির মনের পাতায় লেখা হয়ে গিয়েছিলো।
মাসুদ ইরানীর ছোট ভাই সাঈদ ইরানীর বেশে কালো মূর্তি বজ্রবিহারী শর্মার শয়নকক্ষের পিছন শার্শীর পাশে এসে দাঁড়ালো।
বজবিহারী তখন তার টেবিলে বসে টাকার গাদা নিয়ে হিসাব করছিলেন। রাতে কারবারের সমস্ত। টাকা তিনি বাড়ি আনেন, পরদিন পাহারাদারসহ ব্যাঙ্কে গিয়ে জমা দিয়ে আসেন।
আজ প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা তিনি বাড়ি এনেছেন। সে টাকা গণনা করে গুছিয়ে রাখছিলেন বজ্ৰবিহারী শর্মা। কাল ভোরে ব্যাঙ্কে পাঠাবেন।
টাকা গণনা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এমন সময় কালো মূর্তি আচমকা প্রবেশ করলো তার কক্ষে।
বজ্ৰবিহারী চোখ তুলতেই কালোমূর্তি রিভলভার চেপে ধরলো তার বুকে–খবরদার, একটু শব্দ করবে তাহলেই গুলী করবো।
বজ্রবিহারীর চোখে মুখে ভীতিভাব ফুটে উঠলো। অস্ফুট ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন কে তুমি?
আমি তোমার যম! দক্ষিণ হস্তে রিভলভার বজ্রবিহারীর বুকে চেপে ধরে বাম হস্তে টাকার ফাইলগুলো পকেটে তুলে নিলো কালোমূর্তি তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–কালোবাজারী কারবার বন্ধ না করলে আমাকে প্রতি সপ্তাহে তোমার লভ্যাংশের সম্পূর্ণ টাকা দিয়ে দিতে হবে। কোনোরকম চালাকি করলে বা পুলিশের সাহায্য গ্রহণ করলে মৃত্যু অনিবার্য।
