একসঙ্গে চমকে তাকায় সবাই দরজার দিকে। অভয়কর বিশ্বাস এবং অন্যান্য সকলে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে দেখতে পায়, জমকালো মূর্তির উভয় হস্তে উদ্যত রিভলভার। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠে কক্ষস্থ সকলের মুখ।
নাসির আলী হামাগুড়ি দিয়ে সোজা হয়ে বসে। তারও দু চোখে বিস্ময়। এ কালোমূর্তির জন্যই তাকে এভাবে নিমর্ম সাজা দেয়া হচ্ছিল। সে নিজেও জানেনা কে এ কালোমূর্তি, যার জন্য তার এ অবস্থা।
ভীম সিং ফিরে তাকাতেই তার দক্ষিণহস্তে বিদ্ধ হলো কালোমূর্তির রিভলভারের একটি গুলী। ভীম সিং এর হাত থেকে ছিটকে খসে পড়লো-সূতীক্ষ্ণ চাবুকখানা, আর্তনাদ করে বসে পড়লো সে মেঝেতে।
ক্ষণিকের জন্য কক্ষস্থ সবাই হকচকিয়ে গেলো।
কালোমূর্তি মুহূর্ত বিলম্ব না করে নাসির আলীর হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলো, তারপর দ্রুত তাকে সঙ্গে করে বেরিয়ে গেলো কোম্পানীর লৌহগেটের সম্মুখে থেমে থাকা গাড়ির পাশে।
লৌহগেটের পাহারাদারদ্বয়কে পূর্বেই কৌশলে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে রেখেছিলো, কাজেই চট করে কেউ বাধা দিতে পারলো না কালোমূর্তির চলার পথে।
নাসির আলীকে ড্রাইভিং আসনের পাশে বসিয়ে কালোমূর্তি বসলো ড্রাইভিং আসনে, তারপর গাড়ি ছুটতে শুরু করলো উল্কাগতিতে।
অভয়কর বিশ্বাস তার পাঠান পাহারাদারগণকে হুকুম দিতে দিতে কালোমূর্তির গাড়ি কোম্পানীর এরিয়া ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। রাতের আঁধারে মিশে গেলো বড় রাস্তার বাকে।
নাসির আলীকে দুপুরবেলা ধরে এনে গোটাদিন কারখানার এক অন্ধকার ঘরে বন্দী করে রেখেছিলো ভীম সিং। রাতে যখন মালিক কোম্পানীতে এলেন তখন নাসির আলীকে তার সম্মুখে হাজির করা হলো এবং তার উপর চললো নির্মম অত্যাচার।
অভয়কর বিশ্বাস এবং তার দলবল কল্পনাও করতে পারে নি নাসির আলীর উপর অত্যাচার চলাকালে পুনরায় কালোমূর্তির আর্বিভাব ঘটতে পারে। তারা পরম নিশ্চিন্তে নাসির আলীর উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে যাছিলো। তাদের ধারণা, কালোমূর্তি সেজে স্বয়ং নাসির আলীই এ কাজ করতো বা করেছে।
তা না হলেও কালোমূর্তি নাসির আলীর লোক।
এ মুহূর্তে অভয়কর বিশ্বাস এবং তার অন্যান্য সাঙ্গপাঙ্গ হাবা বনে গিয়েছিলো। কোম্পানীর লৌহফটকে রাইফেলধারী পাঠান পাহারাদার থাকা সত্ত্বেও কালোমূর্তি কি করে কোম্পানীর মধ্যে প্রবেশে সক্ষম হলো এবং কোম্পানীর মধ্যেও বহু লোকজনের চোখে ধূলো দিয়ে একেবারে কারখানার অফিসরুমে এসে ভীম সিংকে আহত করে বন্দী নাসির আলীকে নিয়ে উধাও হলো।
কালোমূর্তি তো উধাও হয়েছে, তার পিছনে ছুটেও এখন তাকে পাকড়াও করা হয়তো সম্ভব হবে না। উপস্থিত তারা ভীম সিং-এর হাতের ক্ষত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
*
গাড়ি এসে থামলো নির্জন গঙ্গাতীরে।
অনেক পথ ঘুরে ফিরে তবে কালোমূর্তি তার গাড়ি নিয়ে এ জনহীন গঙ্গার ধারে এসে গাড়ি থামালো।
নাসির আলীর মুখে কোনো কথা নেই। সে নিজেও ভীষণভাবে আশ্চর্য হয়ে গেছে, তার মনেও বিপুল জানার বাসনা–কে এ কালোমূর্তি যে তাকে উপস্থিত বিপদ থেকে বাঁচিয়ে আনলো।
কালোমূর্তি বুঝতে পারলো–নাসির আলী তার আচরণে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে গেছে। মুখের আবরণ উন্মোচন না করেই বললো সে খুব অবাক হয়েছে নাসির আলী! বিশেষ করে আমার জন্যই তোমাকে ওরা শাস্তি দিচ্ছিলো। তোমার এ কষ্টের জন্য দায়ী আমিই।
কথার ফাঁকে নাসির আলীর হাতের বাঁধন মুক্ত করে দিলো কালোমূর্তি, তারপর আবার বললো–নাসির আলী, আমার পরিচয় জানার জন্য তুমিও অত্যন্ত উৎসুক হয়ে পড়েছো জানি। শোন তবে, আমি তোমাদের হিতৈষী বন্ধু–এটুকুই আমার পরিচয়।
হিতৈষী বন্ধু! অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো নাসির আলী।
হাঁ, ভয় পেয়ে না নাসির আলী, যখনই বিপদে পড়বে তখনই আমাকে পাশে পাবে।
নাসির আলীর মুখে কোনো কথা সরলো না।
কালোমূর্তি বললো–নাসির আলী, এবার তুমি বাস ধরে তোমার বাড়িতে ফিরে যাও। ভীম সিং-এর হাত নিয়ে সবাই ব্যস্ত আছে, তোমার সন্ধানে আজ আর কেউ আসবে না।
নাসির আলী বললো–আচ্ছা হুজুর।
নাও বাস্ ভাড়ার জন্য পয়সা।
কালোমূর্তি কয়েক আনা পয়সা বের করে নাসির আলীর হাতে গুঁজে দিলো।
নাসির আলী গঙ্গার তীর বেয়ে বড় রাস্তায় উঠে এলো।
কালোমূর্তি অন্ধকারে তার পোশাক পাল্টে ফেললো। সুন্দর প্যান্ট-সার্ট-টাই-পরা এক ভদ্রলোক বনে গেলো সে। তার পরিত্যক্ত পোশাকগুলো লুকিয়ে রাখলো ড্রাইভিং আসনের নিচে।
আবার ফিরে এলো সে কোম্পানীর লৌহফটকের সম্মুখে।
গাড়ি থামতেই ছুটে এলো দুজন লোক। একজন বললো– আপনি কোথা থেকে আসছেন স্যার?
ড্রাইভিং আসন থেকে বললো ভদ্রলোক–আমি ষ্টার থিয়েটার হল থেকে আসছি, মাসুদ ইরানীর লোক।
লোক দুটির একজন ভিতরে চলে গেলো এবং অল্পক্ষণ পরে ফিরে এলো আসুন ভিতরে।
কোম্পানীর গেট খুলে গেলো, গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো মাসুদ ইরানীর লোক।
গাড়ি অফিস-রুমের দরজায় পৌঁছতেই সসব্যস্তে ছুটে এলেন অভয়কর বিশ্বাসের প্রধান সহকারী–আসুন। অফিস-রুমে।
মাসুদ ইরানীর লোক লক্ষ্য করলো, তার গাড়ির পাশেই অদূরে আর একটি গাড়ি দাঁড়িয়েছিলো, গাড়িখানা যে হসপিটালের গাড়ি তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মাসুদ ইরানীর লোক অফিস-রুমে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ালো। ভীম সিং মেঝেতে বসে আছে, মুখমণ্ডল তার যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে উঠেছে। ডাক্তার এবং আরও দু’জন লোক তার হাতে ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে ব্যস্ত।
