এবার থেকে তোমাদের মজুরি ডবল বাড়িয়ে না দিলে কিছুতেই কাজ করবেনা।
তাহলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে বাবু।
যাতে তোমরা না মরো সে চেষ্টা আমি করবো।
কিন্তু মালিক কাল রাতে আমাদের পাওনা টাকার ডবল দিয়েছেন।
সে টাকা পেয়েই বুঝি ভুলে গেছো সব?
না বাবু, তা কি আর ভুলি। জানি, একটা কোনো নতুন ফন্দি এঁটেছেন তারা।
হাঁ, নতুন ফন্দিই বটে, শোন তোমরা কাল রাতে যে ডবল মজুরি পেয়েছে তার জন্য তোমাদের সাজা পেতে হবে।
সাজা? কেন? বললো নাসির আলী।
বনহুর বললো–মালিক নিতান্ত বাধ্য হয়েই তোমাদের টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যাক সে কথা, আমি তোমাদের যেভাবে বলবো সেভাবে কাজ করবে।
গণেশ আর সে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো একবার। হয়তো কোনোরকম সন্দেহের দোলা লেগেছে তাদের মনে। হঠাৎ অজানা অচেনা একটা যুকের মুখে এসব কথা–আশ্চর্য হয়ে গেছে ওরা।
বনহুর বললো–নাসির আলী, অভয়কর বিশ্বাস তোমাদের উপর জুলুম চালাবে, কিন্তু কিছুতেই তোমরা কাজে রাজি হবে না। আমি জানি, তোমাদের দ্বারা যে সিমেন্ট তৈরি হয় তার অর্ধেক ভেজাল মেশানো থাকে।
বাবু, এ কথা আপনি কি করে জানলেন? বললো নাসির আলী।
গণেশের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠলো, আবার নাসির আলী আর গণেশ একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো। কারণ তাদের সিমেন্ট কারখানার ভেজাল ব্যাপারের গোপন রহস্য একমাত্র কারখানার ভিতরের লোক ছাড়া আর কেউ জানে না।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–সিমেন্টে আর একচুল ভেজাল মেশানো চলবে না।
বাবু, আমাদের কোনো দোষ নেই। বললো গণেশ।
নাসির আলী বললো আপনি নিশ্চয়ই সি. আই. ডি পুলিশের লোক?
হাঁ, পুলিশের লোক বটে। আচ্ছা, মনে থাকবে আমি যা বললাম?
থাকবে বাবু।
যদিও তোমরা ধর্মঘট ভেঙেছো, তবু তোমরা কাজে যোগ দেবে না, যতক্ষণ মালিকা তোমাদের পারিশ্রমিক ডবল বাড়িয়ে না দেন। আর দ্বিতীয় কথা-কারখানায় যে সিমেন্ট তৈরি হবে তাতে কোনো রকম ভেজাল মেশাতে পারবে না।
মালিক যদি হুকুম করেন তাহলে আমরা কি করবো?
তোমরা তাহলে কাজ করতে রাজি হবে না।
কিন্তু–
কোনো কিন্তু নয় নাসির আলী। হ, এ নাও–বনহুর পকেট থেকে এক তোড়া নোট বের করে নাসির আলীর হাতে দেয়–এ টাকা তুমি বস্তির প্রত্যেক ব্যক্তিকে দেবে। কেউ যেন অভাবের তাড়নায় মালিকের শয়তানিতে সাহায্য করতে এগিয়ে না যায়।
কথা শেষ করে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করলো না বনহুর; চলে গেলো যে পথে এসেছিলো সে পথে।
নাসির আলী আর গণেশ স্তব্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো চিত্রার্পিতের মত।
*
বনহুর চলে যাওয়ার অল্পক্ষণ পর ভীম সিং তার কয়েকজন লোক নিয়ে হাজির হলো বস্তিমধ্যে। কর্কশ কঠিন কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়লো–নাসির। নাসির–
ভীম সিং-এর গলার আওয়াজ পেয়ে কেঁপে উঠলো বস্তির লোক। সবাই জানে ভীম সিং কতবড় নির্দয় আর হৃদয়হীন। পিশাচের চেয়েও ভয়ঙ্কর সে।
নাসির আলী তখন বস্তির মধ্যে লোকজনদের ডেকে একটু পূর্বে বনহুরের মুখে শোনা উক্তিগুলোই করছিলো এবং টাকাগুলো সকলের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে দিচ্ছিলো।
ভীম সিং-এর হুঙ্কারে নাসির আলী ওদিকে শ্রমিকদের দলের মধ্য হতে বেরিয়ে আসে। ভীম সিং-এর সম্মুখে এসে দাঁড়ায়।
গর্জে ওঠে ভীম সিং–নাসির। আভি চলো কারখানা মে তুম হারা যানে হোগা।
নাসির আলী স্থির কণ্ঠে বললো–এখন যেতে পারবো না।
কিয়া? যানে নাহি সেকোগে?
না, এখন আমার সময় নেই।
তুমকো জানে হোগা। ভীম সিং গর্জন করে উঠলো। পরক্ষণেই ইংগিত করলো তার দু’জন পাঠান সঙ্গীকে।
সঙ্গে সঙ্গে পাঠান সঙ্গীদ্বয় নাসির আলীর দু’বাহু চেপে ধরলো। তারপর টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে অদূরে থেমে থাকা গাড়িতে উঠিয়ে নিলো তাকে।
*
কারখানার অফিস-ঘর।
চেয়ারে উপবিষ্ট অভয়কর বিশ্বাস। কোম্পানীর আরও দু’জন বড় সাহেবও বসে রয়েছেন। সকলেরই চোখে মুখে ক্রুদ্ধ হিংস্রভাব।
ভীম সিং ও আরও একজন পাঠান পাহারাদার দণ্ডায়মান। ভীম সিং-এর হস্তে তীক্ষ্ণ চাবুক, চোখ দুটি যেন অগ্নিগোলকের মত জ্বলজ্বল করছে।
অফিস রুমের প্রশস্ত মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে পড়ে আছে শ্রমিকদের সর্দার নাসির আলী। জামা তার ছিঁড়ে গেছে, রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার পিঠের চামড়া কেটে।
অভয়কর বিশ্বাস গর্জে উঠলেন–যতক্ষণ না ও আসল কথা স্বীকার করছে ততক্ষণ চাবুক চালাও।
সঙ্গে সঙ্গে ভীম সিং-এর হস্তের চাবুক সপাং করে পড়ে নাসির আলীর পিঠে।
অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠে নাসির আলী–উঃ মা গো…
ভীম সিং দাঁতে দাঁত পিষে বলে–বোল শালা, বোল কোন আদমী কালা পোশাক লেকর আতা হ্যাঁ?
আমি বলছি কিছু জানিনা। আমি কিছু জানিনা..
জানতা নেহি? কথার সঙ্গেই ভীম সিং-এর হাতের চাবুক সপাং করে পড়লো নাসির আলীর পিঠে।
জানিনা! জানিনা কে সে কালো পোশাক-পরা আদমী।
আমি জানিনা…হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে নাসির আলী।
অভয়কর বিশ্বাস উঠে আসেন, বুটের লাথি লাগান ওর হাতের কনুই-এ জানিস না বললেই আমরা বিশ্বাস করবো তোর কথা।
নিশ্চয়ই সে তোদের দলের লোক।
আমি কসম খেয়ে বলছি, আমি জানিনা!
ফের মিছে কথা! ভীম সিং, ওর জান বের করে নে।
বহুৎ আচ্ছা বড় সাহেব। ভীম সিং পুনরায় নাসির আলীর দেহে আঘাত করার জন্য চাবুক উঠায়।
সঙ্গে সঙ্গে দরজায় এসে দাঁড়ায় কালোমূর্তি–খবরদার, আর একবার আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে মরবে।
