বনহুর এসে দাঁড়ালো এ বস্তির মধ্যে। দেহে তার স্বাভাবিক পাজামা আর পাঞ্জাবী সাধারণ ড্রেস।
বনহুরকে দেখেই কতগুলো অর্ধ-উলঙ্গ হাড়-জিড়জিড়ে ছেলেমেয়ে এসে ঘিরে দাঁড়ালো–অবাক হয়ে সবাই দেখছে বনহুরকে। তাদের এ নিকৃষ্ট বস্তিতে কোনো ভদ্রলোক তো আসে না কোনোদিন, তাই ওদের চোখে এত বিস্ময়।
কতগুলো অর্ধ-উলঙ্গ নারী কুঠিরের মধ্য থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো, সম্মুখে বেরুবার মত কাপড় তাদের দেহে নেই। ময়লা জীর্ণ তালিযুক্ত কাপড় দিয়ে কোনোরকমে যেন লজ্জা নিবারণ করছে ওরা।
বনহুর এগুলো বস্তির ভিতরে। বিরাট কলকাতা শহরের বড় বড় অট্টালিকার আড়ালেও যে এমন। অপরিচ্ছন্ন-অপরিস্কার বিদঘুঁটে বস্তি আছে ভাবতেও যেন কেমন লাগে। যেমন বস্তি তেমনি তার মানুষগুলো। শহরের পরিচ্ছন্ন বাবুদের পাশে এরা যেন এক একটা অদ্ভুত জীব।
বনহুর যত এগোয় তত অবাক হয়।
একটা বস্তির ছোট হোটেলের পাশে এসে থমকে দাঁড়ায় বনহুর, দেখতে পায়–কতগুলো নেংটা ছেলে মেয়ে একটা ডাষ্টবিনের পাশে স্থূপাকার ময়লা আবর্জনার মধ্যে এটো পাতা আর উচ্ছিষ্ট মাংসের হাড়গোড় নিয়ে মারামারি-কাড়াকাড়ি করছে। বর্ষার দিন না হলেও ভেঁজা সঁাত সেঁতে জায়গা–একটা উৎকট দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে সেখান থেকে। হয়তো মাছের পঁচা আঁশের গন্ধ হবে। বনহুর দাঁড়াতে পারে না, এগিয়ে যায় হোটেলটার দিকে।
হোটেলের মালিক পায়া-ভাঙা একটা টেবিলের সামনে হাতল ভাঙা একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে হিসাব লিখছিলো। কতগুলো বস্তির কুলি-মজুরের দল হোটেলের চালার নিচে বসে খোশ গল্প করছিলো আর টিনের বাটিতে চা পান করছিলো।
হঠাৎ মালিকের নজর পড়ে গেলো বনহুরের দিকে। এমন ধরনের ভদ্রলোক সচরাচর এদিকে কোনোদিন দেখেনি সে, তাড়াতাড়ি আসন ছেড়ে এগিয়ে এলো–স্যার, কি চাই?
বনহুর বললো–বস্তির সর্দারকে আমার প্রয়োজন কোন্ দিকে যাবো?
মালিক বললো–নাসির আলীকে খুজছেন স্যার?
হাঁ ঠিক বলেছো।
মালিক ডাকলো গণেশ, গণেশ—
কি বলছো দাদা? ওদিকের বেঞ্চিতে বসে পান চিবুচ্ছিলো একটি লোক; মালিকের ডাকে জবাব দিলো।
মালিক বললো আবার–গণেশ, তোদের সর্দারকে উনি খুঁজছেন, ডেকে দে দেখি।
গণেশ গা-মোড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, তারপর এগিয়ে এলো বনহুরের সামনে কাকে চান বাবু?
তোমাদের সর্দারকে চাই।
চলুন বাবু। আগে আগে চললো গণেশ।
বনহুর তাকে অনুসরণ করলো। তার গাড়িখানা বস্তির গলির মুখে রেখে এসেছে।
নোংরা অপরিস্কার কর্দমযুক্ত গলির মধ্যে এগুতে এগুতে বললো গণেশ–বাবু, আমরা যেমন জায়গায় বাস করি তেমন জায়গায় আপনাদের আসা চলে না। কোনো রকমে জীবনে বেঁচে আছি আমরা।
বললো বনহুর–তা দেখতেই পাচ্ছি!
গলির দু’পাশে স্থূপাকার আবর্জনা, পথ চলতে কষ্ট হচ্ছিলো বনহুরের, দুর্গন্ধে পেটের নাড়িভূড়ি বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিলো তার।
পথ চলতে দু’পাশের খুপড়িগুলোর মধ্যে নজর যাচ্ছিলো, ভিজে স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে কতগুলো কালি-মাখা হাড়ি-পাতিল ছড়িয়ে আছে। কোনোটার মধ্যে খেঁজুর পাতার চাটাই বিছিয়ে জীর্ণদেহী কোনো মহিলা শিশুকে আঁকড়ে ধরে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলো। কোনোটার মধ্যে নেংটা দুটো ছেলে ভাতের ফ্যান নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। তাদের চারপাশে বনবন করে উড়ছে মাছিগুলো। বনহুরের চোখে এসব দৃশ্য যেন অসহনীয় লাগছে। এমনিভাবে মানুষ কোনো দিন বাঁচতে পারে!
একটা খুপড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো গণেশ। খানিকটা জায়গা চটের আড়াল করে উঠান তৈরি করা হয়েছে। একপাশে কতগুলো হাঁস-মুরগী কাঁচ কাঁচ করে ঘুরছিলো!
গণেশ ডাকলো–আলী ভাই, আলী ভাই–
অর্ধবয়স্ক এক বলিষ্ঠ পুরুষ বেরিয়ে এলো গণেশের সঙ্গে। একজন ভদ্রলোককে দেখে আদাব দিলো সে।
গনেশ বললো–বাবু এ আমাদের নাসির আলী ভাই।
বনহুর নাসির আলীর পা থেকে মাথা অবধি নজর বুলিয়ে নিয়ে বললো–তুমি কি খিদিরপুর অভয়কর বিশ্বাসের সিমেন্ট কারখানার কাজ করো?
জ্বি হা।
কথা আছে তোমার সঙ্গে।
বাবু, এখানে দাঁড়িয়ে তো কথা হয় না, কিন্তু–নাসির আলী ভিতরে চলে গেলো, একটু পরে ফিরে এলো একটা ছোট্ট টুল নিয়ে। দ্বিধাজড়িত গলায় বললো–কোথায় বসতে দি বাবু–
থাক থাক বসতে হবে না, দাঁড়িয়েই হবে। নাসির আলী, সিমেন্ট কারখানায় তোমরা কতজন আন্দাজ কাজ করো?
একটু চিন্তা করে বলে নাসির আলী প্রায় দু’হাজার আড়াই হাজারের মত–একটু থেমে বলে সে– আপনি কি আমাদের মালিকের লোক?
না, তোমাদের মালিকের লোক আমি নই।
আপনি তাহলে—
মনে করো আমি তোমাদেরই একজন।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নাসির আলী আর গণেশ বনহুরের পৌরুষদীপ্ত সুন্দর মুখখানার দিকে। কে এ যুবক যে তাদের এ নিকৃষ্ট বস্তির মধ্যে বিনা সঙ্কোচে প্রবেশ করে এমন সহানুভূতিপূর্ণ কথা বলতে পারে! চিরদিন যারা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর তিরস্কার পেয়ে এসেছে। মতোয় ভরে উঠে ভদ্ৰযুবকের আবেগমধুর গম্ভীর কণ্ঠস্বরে।
বনহুর বলে–নাসির আলী, আমি তোমাদের সাহায্য করতে চাই। তোমাদের মালিক যেন আর তোমাদের উপর অত্যাচার-অনাচার-উৎপীড়ন চালাতে না পারে এ ব্যবস্থাই আমি করবো।
বাবু!
নাসির আলী আমার কথা মত চলতে পারবে?
পারবো। কি করতে হবে বলুন বাবু?
তোমরা সমস্ত শ্রমিক মিলে কাজ বন্ধ করে দাও।
তাতো দিয়েছিলাম। দু’সপ্তাহ আমরা ধর্মঘট করেছিলাম। বাবু এ কদিনে আমরা শুকিয়ে মরেছি। আমাদের ঘরে তো কোনো খাবার নেই, তাই মালিক যা দেন তাতেই আমরা খুশি হয়ে কাজ করি।
