না স্যার, আমি সন্ধ্যার পর আর কোথাও গাড়ি নিয়ে যাইনি।
বলো কি যতীন?
স্যার!
সর্বনাশ, তাহলে ঐ বদমাইস বেটা শয়তান আমার ড্রাইভার সেজে—
কথা শেষ না করে বাম হস্তের তালুতে দক্ষিণ হস্তে মুষ্টিঘাত করেন।
এমন সময় সরকার ভূতনাথ বাবু ব্যস্তভাবে এসে দাঁড়ান– স্যার, কোম্পানীর অফিস থেকে ম্যানেজার বাবু ফোন করেছেন। জরুরি সংবাদ আছে স্যার।
জরুরি! কি আবার জরুরি সংবাদ এলো এ সাত সকালে। অভয়কর বিশ্বাস হলঘরের দিকে চললেন।
নিজস্ব কক্ষে প্রবেশ করে রিসিভার তুলে নিলেন হাতে-হ্যালো স্পিকিং অভয়কর বিশ্বাস–কি বললেন–কি বললেন–ভীম সিং তার কামরায় বন্ধন অবস্থায়–হ্যাঁ একি বলছেন–হাত–পা-মুখ সব মজবুত করে বাধা–! এখানেও আমার ড্রাইভারের সে একই অবস্থা– হাঁ নিশ্চয়ই সেই দুবৃত্ত শয়তানের কাজ। আচ্ছা। এক্ষুণি আসছি–
রিসিভার রেখে পায়চারী শুরু করলেন অভয়কর বিশ্বাস। কে তার পিছনে এমন করে লেগেছে–কার এতোবড় সাহস! তার ড্রাইভারকেও গ্যারেজে বন্ধন অবস্থায় রেখে তার গাড়ি ড্রাইভ করে নিয়ে গিয়েছিলো, আর সে জমকালো ছায়ামূর্তিই ভীম সিংকে তার কামরায় হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছে, তারই এ-কাজ। কিন্তু কে সে দুর্দান্ত দুরাত্মা।
*
বনহুর তার ক্যাবিনে বিশ্রাম করছিলো।
মিঠু টেবিলে চা-নাস্তা সাজিয়ে রেখে বললো–স্যার, চা দিয়েছি।
ও! অন্যমনস্কভাবে কিছু চিন্তা করছিলো বনহুর, মিঠুর কথায় উঠে দাঁড়ালো– চা দিয়েছিস?
হাঁ স্যার।
বনহুর চায়ের টেবিলে এসে বসে। চায়ের কাপ হাতে তুলে নিতেই নজর পড়ে টেবিলো সেদিনের। পত্রিকাখানার উপর। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে পত্রিকাখানা তুলে নেয় হাতে। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে প্রকাশ পেয়েছে–
“প্রকাশ্য রাজপথে দুর্দান্ত ডাকতি”
কলিকাতার বিখ্যাত ব্যবসায়ী শ্ৰীযুক্ত বাবু অভয়কর বিশ্বাসের প্রধান ম্যানেজার বিনোদ সেন গত রাত্রে যখন তাদের খিদিরপুর কোম্পানী থেকে বিশ হাজার টাকা নিয়ে বালিগঞ্জ অফিসে ফিরছিলেন তখন এক জমকালো পোশাক-পরা দুবৃত্ত তার গাড়ি আটক করে সমস্ত-টাকা কেড়ে নেয়। ঐ রাত্রেই পুনরায় সে জমকালো পোশাক-পরা দুর্বত্ত শ্ৰীযুক্ত বিশ্বাসের নিজস্ব কামরায় হানা দেয় এবং তাকে জোরপূর্বক তাঁর কোম্পানীর ম্যানেজারের নিকটে ফোন করতে বাধ্য করে। শ্রীযুক্ত বিশ্বাসকে তার শ্রমিকদের ডবল পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়। শ্রীযুক্ত বিশ্বাস দুৰ্বত্তের রিভলভারের ভয়ে তার কথামত কাজ করতে বাধ্য হন। পুলিশ এ ব্যাপার নিয়ে জোর তদন্ত চালাচ্ছে।
বনহুরের মুখমণ্ডল গম্ভীর হলো, একটা সিগারেট বের করে অগ্নিসংযোগ করে একমুখ ধূয়া ছুঁড়ে দিলো সম্মুখ দিকে–তারপর হঠাৎ অদ্ভুত ভাবে হেসে উঠলো সে হাঃ হাঃ হাঃ–
মনিবের সম্মুখে চা-নাস্তার প্লেট দিয়ে একপাশে দাঁড়িয়েছিলো মিঠু। যদিও সে হোটেলেই বয় হিসেবে কাজ করে তবু বনহুর ওকে হোটেলের ম্যানেজারের কাছে বলে নিজস্ব চাকর হিসেবে গ্রহণ করেছে। অবশ্য যত দিন এ হোটেলে থাকবে বিশেষ করে ততদিনের জন্য। এ জন্য বেশ কিছু টাকাও জমা দিয়েছে হোটেল অফিসে। মিঠুকে বনহুরের প্রথম থেকেই ভাল লেগেছিলো, বেশ কর্মঠ এবং বিশ্বাসী বলে মনে হয়েছিলো তার। মিঠুর মিষ্টিমধুর স্বভাব তাকে মনোমুগ্ধ করেছিলো। আসলে বনহুর সূতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান, সে এক নজরে মানুষকে চিনে নিতো। এমনকি সে লোকের মুখ দেখলেই তার অন্তরের কথা বুঝে নিতো, অদ্ভুত এ দক্ষতা ছিলো তার। মিঠুকে তাই বনহুর এ্যাণ্ড হোটেলে আপন করে নিতে পেরেছিলো প্রথম দিন থেকেই। ছেলেটি সরল এবং বিশ্বাসী তাতো-কোনো সন্দেহ নেই। মিঠুও হঠাৎ যেন ভালবেসে ফেলেছিলো নতুন আগন্তুকটিকে। এ হোটেলে কাজ করার পর তাকে বহু লোকের তত্ত্বাবধান করতে হয়েছে, কিন্তু কাউকে তার এতো ভাল লাগেনি। প্রথম নজরে মিঠুর একটা শ্রদ্ধা এসে গিয়েছিলো বনহুরের প্রতি।
হঠাৎ বনহুরের হাসিতে অবাক হয়ে যায় মিঠু, বলে–স্যার, কাগজে কি লিখা আছে?
বনহুর অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো, মিঠুর কথায় কোনো জবাব দেয় না। সিগারেট থেকে অবিরত ধূম নির্গত করে চলে। কুণ্ডলীমান ধুম্ররাশির দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তায় তালিয়ে যায়–শুধু অভয়কর বিশ্বাসকে। সায়েস্তা করলেই চলবে না–এমন আরও কতগুলো দুর্দান্ত শয়তান আছে, তাদেরকেও দমন করতে হবে। বাংলাদেশে যখন সে আগমন করেছে তখন সে দেখে নেবে একবার সবাইকে–
স্যার চা-নাস্তা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো যে।
মিঠুর কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর–ঊ!
স্যার, চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
বনহুর চায়ের কাপটা তুলে নেয় হাতে।
চা-নাস্তা খাবার পর উঠে পড়ে বনহুর–মিঠু, আমি বাইরে যাচ্ছি, ফিরতে হয়তো দেরি হবে।
আচ্ছা স্যার।
বনহুর বেরিয়ে যায়।
মিঠু বনহুরের পরিত্যাক্ত পোশাক-পরিচ্ছদগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে।
বনহুরের গাড়ি এসে থামলো মানিকতলা শ্রমিকদের বস্তির পাশে।
অপরিচ্ছন্ন নিকৃষ্ট একটা জায়গা।
টিন এবং খোলার ছোট ছোট চালাঘর। কোনটার বা চালের খানিকটা অংশ নেই, সেখানে গুঁজে রাখা হয়েছে কেরোসিন তেলের টিনের পাত বা ছেঁড়া চট। ঘরগুলোর বেড়াও মজবুত নয়, বাঁশের চাটাই বা ঐ ধরণের এটা সো দিয়ে কোনো রকমে চারধার ঘেরাও করা হয়েছে।
