অভয়কর বিশ্বাস এবার সোজ হয়ে বসলেন, তারপর বললেন– সব দিয়ে দিয়েছেন?
শ্রমিকের টাকার কথা বলছেন স্যার?
হাঁ, সব দেয়া হয়েছে বুঝি?
আপনি বলায় আমি সেভাবে শ্রমিকদের—
সর্বনাশ করেছেন! সর্বনাশ করেছেন ম্যানেজার বাবু। সর্বনাশ করেছেন।
স্যার আপনি–
ম্যানেজার বাবু, যে ডাকু আপনার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা কেড়ে নিয়েছে, সে ডাকুই আমাকে ফোন করতে বাধ্য করেছে। আমাকে রিভলভারের ভয় দেখিয়ে বাধ্য করেছিলো আপনার কাছে ফোন করতে।
স্যার এ আপনি কি বলছেন?
অদ্ভুত কালো পোশাক পরা এক যুবক–মাথায় ক্যাপ, মুখে কালো রুমাল বাঁধা, দক্ষিণ হস্তে রিভলভার হঠাৎ আমার কক্ষে প্রবেশ করে সে আমাকে বাধ্য করে নিয়েছিলো।
ম্যানেজার বললেন–স্যার, ঠিক আমার গাড়ি রুখে যে ব্যক্তি টাকা কেড়ে নিয়েছে তার দেহেও কালো পোশাক ছিলো মাথায় ক্যাপ, মুখে কালো রুমাল বাঁধা। আমাকে রিভলভার দেখিয়ে বিশ হাজার টাকা ব্যাগ সমেত সে নিয়ে উধাও হয়েছে।
অভয়কর বলে উঠলেন–একই ব্যক্তি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কে সে যার এতাবড় সাহস আমার সঙ্গে শয়তানী করে–
একটু থেমে বললেন অভয়কর বিশ্বাস –পুলিশে সংবাদ দিয়েছেন?
ম্যানেজার বাবু বললেন–হাঁ, আমি সঙ্গে সঙ্গে লালবাজার থানায় গিয়ে ডায়রী করেছি।
বেশ, এখন আমি নিজে পুলিশ সুপারের অফিসে গিয়ে সব জানিয়ে আসবো। হাঁ, শুধু পুলিশে জানিয়েই। আমি ক্ষান্ত হবো না ম্যানেজার বাবু।
বলুন স্যার?
আমার কোম্পানীর শ্রমিকদের মধ্যেই কেউ এ শয়তানী করেছে, আমি বুঝতে পেরেছি।
ম্যানেজার বাবু বললেন–আমার সে রকম সন্দেহ হচ্ছে। কারণ, শ্রমিকদের প্রতি ডাকুর এমন দরদ কেন?
দেখুন কারো সাধ্য নেই, আমার উপর শয়তানি করে নিজেকে গোপন রাখে। আমি প্রতিটি শ্রমিককে পাকড়াও করে এনে এর প্রতিশোধ নেবো। আচ্ছা, আমার কারখানার ফায়ারম্যানকে ডাকুন, আমি তার দ্বারাই সন্ধান নেবো বা নিতে সক্ষম হবো।
তখনই ফায়ারম্যানকে ডাকা হলো।
বিশালদেহী বলিষ্ঠ জোয়ান একটি লোক এসে দাঁড়ালো কোম্পানীর অফিস-রুমে।
লোকটাকে দেখলেই ভয় হয়। যে কোনো দুর্বল লোকের প্রাণ শিউরে উঠবে তার চেহারা দর্শনে। অভয়করের সিমেন্ট কারখানার হেড় ফায়ারম্যান সে নাম ভীম সিং।
অভয়কর বিশ্বাস এ ভীম সিংকে সব সময় সমীহ করে চলতেন; কারণ এর দ্বারা তিনি অনেক কু-কর্ম সাধন করতে সক্ষম হতেন অনায়াসে। কলকাতার নামকরা গুণ্ডা-সর্দার মহাতক সিং-এর পরম বন্ধুজন ভীম সিং।
অভয়কর বিশ্বাস ভীম সিংকে বললেন–ভীম সিং, এক বাৎ শুনো!
বলিয়ে বড় সাহাব?
তুমারা যানে হোগা মেরা সাৎ।
কাহা বড় সাহাব বলিয়ে?
ভীম সিং-এর গোঁফজোড়া খাড়া হয়ে উঠলো…এমনি আরও কত রাতে অভয়কর বিশ্বাস ভীম সিংকে আদেশ দিয়েছেন–কারো বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে বেটাকে পাকড়াও করে আনতে। হয়তো বা কারো সুন্দরী। স্ত্রী বা কন্যাকে চুরি করে আনার বেলাতেও ভীম সিং। কোনো শ্রমিক অপরাধ করলে তাকে সাজা দেবার বেলাতেও সে, কাজেই আজ আবার কোন্ কাজে তার ডাক পড়েছে ভেবে পায় না ভীম সিং। অবশ্য এসব। কাজে তার মাইনে বাদেও মোটা টাকা বখশীস আছে। ভীম সিং অভয়করের সিমেন্ট কারখানায় প্রায় দশ বছর হলো চাকরি করছে। আজকাল ভাঙা ভাঙা বাংলা শিখেছে কিছুটা, তবু বলতে তার অসুবিধা হয়। কারখানায় কয়েকজন পাঠান এবং শিখ পাহারাদার আছে, এরা সবাই অভয়কর বিশ্বাসের বিশ্বস্ত কর্মচারী। যেমন দুর্দান্ত তেমনি ভয়ঙ্কর এদের আচরণ।
অভয়কর বিশ্বাস বললেন–মেরা গাড়িমে তুম্ চলো।
ভীম সিং বড় সাহেবকে অনুসরণ করলো।
*
অভয়কর বিশ্বাসের গাড়ি সোজা গিয়ে পৌঁছলো শ্যামবাজার একটি ছোট্ট গলির মধ্যে। পোড়ো বাড়ির মত একটা অপরিস্কার বাড়ির সম্মুখে গাড়ি রুখতে বললেন অভয়কর বিশ্বাস ড্রাইভারকে।
অভিজ্ঞ ড্রাইভারটাও আজ যেন কেমন বোকাটে বনে গেছে। অভয়কর বিশ্বাস এ নতুন বিপদের সম্মুখীন। হয়ে আজ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন নইলে তিনি ড্রাইভারের আচরণে অসন্তুষ্ট হতেন।
অভয়কর বিশ্বাস গাড়িতেই বসে রইলেন। গাড়ি থেকে নেমে গেলো ভীম সিং।
ভাঙাচোরা বালি খসে পড়া পোড়া বাড়ির মত ঠিক দেখতে বাড়িটা। ভীম সিং চলে গেলো, একটু পরে। একটা ভীষণকায় লোকসহ ফিরে এল সে।
লোকটা গাড়ির মধ্যে অভয়কর বিশ্বাসকে দেখে কুর্ণিশ জানালো–বাবুসাব আপ!
হাঁ, মহাতক সিং একটা বিপদে পড়ে আমি তোমার স্মরণাপন্ন হয়েছি।
আপ অন্দরমে আইয়ে না বাবুসাব?
না, এখানে বসেই দুটো কথা তোমাকে বলে যাবো, তারপর আসবো।
কহিয়ে বাবুসাব? মহাতক সিং নিজের কণ্ঠকে যতদূর সম্ভব নরম করে বললো।
অভয়কর বিশ্বাস এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলেন।
হেলে বললো মহাতক সিং–এ গলি মে কই নাহি আসবে বাবুসাব, আপ বাত কহিয়ে?
অভয়কর বিশ্বাস বললেন–আজ রাত সাড়ে আটটায় কিংবা ন’টা হবে আমার ম্যানেজার বাবু খিদিরপুর থেকে বিশ হাজার টাকা নিয়ে ফিরছিলো, পথে তার গাড়ি আটক করে এক জমকালো পোশাক পরা দুবৃত্ত তার নিকট হতে সমস্ত টাকা কেড়ে নিয়েছে–
বিশ হাজার রুপিয়া। বললো মহাতক সিং।
ভীম সিংও কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনছিলো।
অভয়কর বিশ্বাস বললেন আবার–বিশ হাজার টাকা তো সে ম্যানেজারের নিকট হতে নিয়েছে, তারপর আমার বাড়িতে হানা দিয়ে জোরপূর্বক আমাকে বাধ্য করিয়েছিলো কোম্পানীর ম্যানেজারের নিকটে ফোন করতে–
