অভয়, এ সামান্য বিশ হাজার টাকার জন্য তুমি মরে যাবে না।
মরবো না। বিশ হাজার কেন বিশ লক্ষ টাকার লোকসান গেলেও মরবে না অভয়কর বিশ্বাস। তবু যে দুবৃত্ত সাহস পায় তার গায়ে আঁচড় দিতে তাকেও সে রেহাই দেবে না কোনোদিন।
আচ্ছা চলি। আলবার্ড বিদায় গ্রহণ করলেন।
অভয়কর বিশ্বাস অর্ধগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে ফিরে দাঁড়াতেই দরজায় একটা জমকালো ছায়ামূর্তি ভেসে উঠলো, চমকে উঠলো অভয়কর বিশ্বাস।
জমকালো মূর্তির হস্তে উদ্যত রিভলভারের দিকে তাকিয়ে আরষ্ট হয়ে গেলো তার কণ্ঠ।
ছায়ামূর্তি এগিয়ে এলো, রিভলভার উদ্যত তার হস্তে। পাশে দাঁড়ালো এসে অভয়করের, চাপা কণ্ঠে বললো–চেয়ারে বসুন।
অভয়কর বিশ্বাস অধর দংশন করছিলেন, বললেন–কে তুমি?
জবাব পরে পাবেন, বসুন চেয়ারে।
অভয়কর বিশ্বাস আসন গ্রহণ করলেন, তারপর বললেন–তুমিই আমার ম্যানেজারের কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা কেড়ে নিয়েছো?
হাঁ।
আবার কি চাও?
সামান্য বিশ হাজার দিয়েই রেহাই পেতে চান?
কি চাও তা হলে?
রিসিভার হাতে উঠিয়ে নিন। জমকালো ছায়ামূর্তি তার হস্তস্থিত রিভলভার অভয়কর বিশ্বাসের কপালের বাম পাশে চেপে ধরলো রিং করুন আপনার কোম্পানীর ম্যানেজারের কাছে।
অভয়কর বাধ্য হলেন রিসিভার হাতে তুলে নিতে। এমন একটা অবস্থায় পড়বেন তিনি কোনো দিন কল্পনাও করেননি। রিসিভার তার হাতের মুঠায় ইচ্ছা করলে তিনি এক্ষুণি পুলিশ অফিসে ফোন করতে পারেন। কিন্তু কোনো উপায় নেই, দস্যুর রিভলভার তার ললাটে ঠেকে রয়েছে। জীবনের মায়া কার না আছে।
অভয়করকে ভাবতে দেখে গম্ভীর চাপা কণ্ঠে গর্জে উঠলো কালো ছায়ামূর্তি–চালাকি করলে মরবেন। যা বললাম তাই করুন।
অগত্যা অভয়কর তার ম্যানেজারের নিকট রিং করলেন– হ্যালো হ্যালো—
গলার স্বর স্বাভাবিক করে ফোনে কথা বলুন। কালো ছায়ামূর্তি অভয়কর বিশ্বাসের কানে মুখ নিয়ে কথাটা বললো। হাঁ, এবার বলুন যে শ্রমিকের দল আজ কদিন ব্যাপী ধর্মঘট চালানোর পর তারা কারখানার বাইরে ফুটপাতে অপেক্ষা করছে তাদের ন্যায্য পাওনার দাবি নিয়ে–তাদের পাওনার ডবল যেন দিয়ে দেয়া হয়। বলুন, বলুন–
অভয়করের চোখে শর্ষে ফুল ঝরে পড়ে, হাজার হাজার শ্রমিক তার কারখানায় কাজ করে, এদের প্রাপ্য মজুরি তার ডবল দিতে গেলে যে লক্ষ টাকার বেশি লাগবে! তবু বলতে বাধ্য হলেন অভয়কর– হ্যালো– ম্যানেজার বাবু–
ওপাশ থেকে ভেসে আসে ম্যানেজার বাবুর গলা–হ্যালো–বলুন স্যার—
আমার কোম্পানীর শ্রমিকগণ যারা ক’দিনব্যাপী ধর্মঘট চালানোর পর সন্ধ্যা থেকে কারখানার বাইরে ধন্না দিচ্ছে তাদের টাকা…মানে ওদের পাওনা টাকার উপর কিছু বেশি–
চাপাকণ্ঠে গর্জে উঠলো কালো ছায়ামূর্তি–কিছু বেশি নয়, বলুন ডবল দিতে।
হ্যালো– ওদের ডবল দাম দিয়ে দিন।
ওপাশ থেকে ম্যানেজারের অবাক গলা–স্যার, আজ এতগুলো টাকা দুবৃর্ত চুরি করে নিলো তারপর আবার–
–হ্যাঁ দিয়ে দিন—
আবার ম্যানেজারের কণ্ঠ–স্যার কোম্পানীর অফিস থেকে টাকা দেবো?
কালোমূর্তি রিভলভার দিয়ে অভয়করের ললাটে চাপ দিয়ে বললো–বলুন, হাঁ।
অভয়কর ঢোক গিলে বললেন–হাঁ।
রাখুন রিসিভার।
অভয়কর রিসিভার রেখে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন তুমি কে?
জমকালো মূর্তি চাপা গম্ভীর কণ্ঠে বললো–আমি হিতৈষী বন্ধু।
কার?
তোমার এবং দেশের। এবার কালোমূর্তি রিভলভার অভয়করের বুকে চেপে ধরে বললো–চলুন। বাথরুমে। আপাততঃ ওখানেই আপনাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
বাথরুমে।
হাঁ। যতক্ষণ আপনার কোম্পানী থেকে শ্রমিক দল বিদায় গ্রহণ না করে ততক্ষণ আপনি ঐ বাথরুমে বন্দী থাকবেন।
অভয়কর কালোমূর্তির আদেশ পালনে বাধ্য হলেন। বাথরুমে প্রবেশ করে কালোমূর্তি পকেট থেকে সিল্কের রুমাল এবং নায়লনের দু’খানা কর্ড বের করে অভয়করকে মজবুত করে বেঁধে ফেললো। মুখখানা রুমালে বাধলো, আর হাত বাধলো মজবুত কর্ড দিয়ে। তারপর বেরিয়ে এলো বাথরুম থেকে, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলো।
ভয়ঙ্কর অভয়কর বিশ্বাসকে কালোমূর্তি কাবু করে ফেলেছিলো। তার বুদ্ধি–কৌশল আর রিভলভারের চাপ দিয়ে।
অভয়কর বিশ্বাস যে কক্ষে বসতেন সে কক্ষে কারো প্রবেশ নিষেধ ছিলো। যতক্ষণ তিনি কলিং বেলে হাত না দিতেন ততক্ষণ কেউ প্রবেশ করতে সক্ষম হতো না সে কক্ষে। কাজেই অভয়করকে কালোমূর্তি বাথরুমে বন্দী করলেও কেউ জানলো না।
*
অভয়কর বিশ্বাসকে যখন বাথরুম থেকে বের করে আনা হলো তখন রাত বারোটা বেজে গেছে। তিনি ছাড়া পেয়েই গাড়ি নিয়ে ছুটলেন কোম্পানী অভিমুখে।
কিন্তু অভয়কর বিশ্বাস যখন কোম্পানীর লৌহগেটের সম্মুখে এসে পৌঁছলেন তখন তার মাথায় বাজ পড়লো। শ্রমিকদল খুশি মনে বিদায় নিয়ে চলে গেছে নিজ নিজ আবাসে।
অভয়কর বিশ্বাস মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন অফিসরুমের সোফায়।
মালিকের আগমনে বিলম্ব দেখে চঞ্চলভাবে ঘর-বার করছিলেন ম্যানেজার বাবু। তিনি বিশ হাজার টাকা। চুরি যাওয়ার সংবাদ ফোনে জানানোর পর মালিক জানালেন, এক্ষুণি আমি আসছি অথচ তিনি পরক্ষণেই। পুনরায় ফোনে জানালেন ধর্মঘটকারী শ্রমিকদের পাওনা টাকার ডবল পরিমাণ তাহাদের দিয়ে দিতে –ম্যানেজার ভেবে পাননা একি ব্যাপার!
এক্ষণ মালিককে হন্তদন্তভাবে কোম্পানীর অফিস রুমে প্রবেশ করে সোফায় বসে পড়তে দেখে ম্যানেজার ঘাবড়ে গেলেন। তিনি ফ্যানের স্পীড বাড়িয়ে দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন, বিনীত কণ্ঠে বললেন–স্যার।
