অভয়কর বিশ্বাস বিপত্নীক হলেও তার বাড়িতে মেয়েমানুষের অভাব নেই। আত্মীয়-স্বজনের চেয়ে পরিচিত জনগণই বেশি। সম্পর্কে এক বিধবা বৌদি বিপত্নীক অভয়করের দেখাশোনা করে। আরও আছে যুবতী চাকরানীর দল।
অভয়কর বিশ্বাসের একটি মাত্র কন্যা আরতী।
পিতা এবং ভ্রাতাগণের ঠিক বিপরীত ছিলো আরতী। শিক্ষিতা-বুদ্ধিমতী-জ্ঞানবতী তরুণী ছিলো সে। পিতার অসৎ আচরণের জন্য আরতী শুধু দুঃখিতই ছিলো না অত্যন্ত ব্যথিত এবং চিন্তিত ছিলো। ভাইগুলোও সব অধঃপতনে গেছে এটাও তার কম দুঃখ নয়।
আরতী ভাইগুলোর চেয়ে বয়সে ছোট হলেও একেবারে তার বয়স কম নয়। মা হারা হলেও আরতী নিজের প্রতি ছিলো অত্যন্ত সতর্ক। লেখাপড়া, গান-বাজনা এবং গৃহকর্মে নিপুণা ছিলো সে। ধনকুবের-কন্যা হলেও আরতী ছিলো আদর্শ যুবতী।
যতক্ষণ পিতা বাড়িতে থাকতেন ততক্ষণ আরতী উপর থেকে নিচে নামতো না। চাকার-বাকর দাস-দাসী ছিলো অগণিত; তাছাড়া পিতার বৌদি ছিলেন, তিনিই পিতার তদারক করতেন। আরতী নিচে নেমে আসার প্রয়োজন বোধ করতো না। কোনো কোনোদিন হঠাৎ যদি নিচে নেমে আসতো কোনো কাজের চাপে, তাহলে পিতা আর বিধবা বৌদির আচরণে লজ্জায় মরে যেতে যেন। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে পারতো না সে।
আজ অভয়কর বিশ্বাস আধুনিক ড্রেসে তরুণ যুবকের মত নিজেকে সজ্জিত করে নিয়েছিলেন। হলঘরের মেঝেতে তিনি ঘন ঘন পায়চারী করছিলেন। মাঝে মাঝে হাতঘড়িটা দেখছিলেন তিনি।
এমন সময় একখানা গাড়ি এসে থামলো অভয়কর বিশ্বাসের রাজ প্রাসাদসম বাড়িখানার গাড়ি-বারান্দায়।
অল্পক্ষণ পর হল ঘরে প্রবেশ করলেন আলবার্ড।
মুখমণ্ডল গম্ভীর চিন্তাযুক্ত; ঠিক যেন অপরাধীর মত মন্থর গতিতে কক্ষে প্রবেশ করে মাথা নিচু করে দাঁড়ালেন।
অভয়কর বিশ্বাস ফিরে তাকিয়েই হুঙ্কার ছাড়লেন– এসেছো? কিন্তু সে কই?
আলবার্ড মুখ তুললেন, ঢোক গিলে বললেন–অভয়, তাকে কিছুতেই আনতে পারলাম না!
তাহলে তুমি এলে কেন?
চমকে মুখ তুললেন আলবার্ড।
অভয়কর বিশ্বাস গম্ভীর রাগতকণ্ঠে বললেন– আবার তোমার বাড়িতে আশ্রিতা অথচ তুমি তাকে আনতে পারলে না?
আমি অনেক চেষ্টা করেছি, তুমি বিশ্বাস করো অভয়, আমি—
চুপ করো, আমি তোমার নেকামি শুনতে চাইনে।
আলবার্ড অভয়করের ধমক খেয়ে চুপ করে গেলেন।
অভয়কর পায়চারী শুরু করলেন, ক্রুদ্ধ সিংহের মত আপন মনে গর্জন করতে লাগলেন তিনি। যেমন ক্ষুধিত সিংহ মুখের আহার থেকে বিতাড়িত হলে তার অবস্থা হয়–ঠিক তেমনি।
আলবার্ড প্রমাদ গুণলেন, অভয়করকে খুশি করাই হলো এখন তার চিন্তা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন। তিনি–অভয়, তুমি আমার প্রতি বিরূপ হচ্ছো কেন? আমার হাতের মুঠায় রয়েছে শ্যালন। সে আসতে না চাইলেও আমি তাকে জোরপূর্বক নিয়ে আসবো তোমার বাড়িতে।
কিন্তু কথাটা বলে কিছুতেই নিজের মনে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না, কারণ শ্যালনকে জোর করে আনা এখানে সম্ভব হয়ে উঠবে না। সে যদি নিজ ইচ্ছায় না আসে তাকে ধরে-বেঁধে নিয়ে আসা মুস্কিল। হঠাৎ বলে উঠেন আলবার্ড পুনরায় অভয়, বসো একটা বুদ্ধি এঁটেছি, সে ভাবে কাজ করলে নিশ্চয়ই শ্যালনকে এখানে নিয়ে আসা মোটেই কষ্টকর হবে না।
কি বুদ্ধি তুমি এঁটেছো বার্ড? একরত্তি একটা মেয়ের সঙ্গে তুমি পারলেনা, আশ্চর্য মানুষ তুমি! কথাটা বলে আসন গ্রহণ করলেন অভয়কর বিশ্বাস।
আলবার্ড তার পাশের সোফায় বসলেন, তারপর বললেন– এক কাজ করলে মন্দ হয় না।
কি কাজ?
শ্যালন অত্যন্ত ভালবাসে মাসুদ ইরানীর পিয়ানো বাজনা। তাকে মাসুদ ইরানীর পিয়ানো বাজনা শোনার ছলনায় আনা যায় এখানে।
বেশ তাই হবে। একটা উৎসবের আয়োজন করে। সে উৎসবে মাসুদ ইরানী পিয়ানো বাজাবে আর শ্যালন হবে তার শ্রোতা। হাঃ হাঃ হাঃ তারপর–
তারপর সবাই বিদায় গ্রহণ করলে—
শ্যালন হবে আমার শিকার, তাই না?
হা। একটু থেমে বললেন আলবার্ড অভয়, শ্যালনকে তোমার হাতে তুলে দিলে তুমি আমায় কোটি টাকার ঋণ থেকে মুক্তি দেবে?
তুমি দেখছি মস্ত এক ফন্দি আঁটছো বার্ড!
ফন্দি নয় অভয়, তুমি জানো–শ্যালন তার বাবার একমাত্র কন্যা। ম্যাকমারার মৃত্যুর পর সে-ই তার বিশাল ঐশ্বর্যের একমাত্র উত্তরাধিকারিণী, কাজেই কোটি টাকার সম্পত্তি তোমার হাতে অনায়াসেই এসে যাচ্ছে।
সে দেখা যাবে। অভয়কর বিশ্বাস সিগারেট কেস বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলেন।
এমন সময় টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো সশব্দে।
রিসিভার তুলে নিলেন হাতে অভয়কর–হ্যালো–ম্যানেজার বাবু–কি বললেন–বিশ হাজার টাকা কেড়ে নিয়েছে–
আপনার কাছ থেকে–কি বললেন–জমকালো পোশাক-পরা একটি লোক– আপনি কি চুপ করেছিলেন… রিভলভার ছিলো তার হাতে…আচ্ছা আমি এক্ষুণি আসছি। রিসিভার রেখে উঠে দাঁড়ালেন। অভয়কর।
আলবার্ডের চোখেমুখে বিস্ময়, ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন তিনি অভয়, কি সংবাদ?
অত্যন্ত সাংঘাতিক। সিমেন্ট কারখানার ম্যানেজারবাবু খিদিরপুর ডগ থেকে বিশ হাজার টাকা নিয়ে বালিগঞ্জ আমার অফিসে ফিরছিলেন, পথে তার গাড়ি রোধ করে এক জমকালো পোশাক-পরা দুবৃত্ত সব কেড়ে নিয়েছে–
আশ্চর্য এ সন্ধ্যারাতে কলকাতা শহরে প্রকাশ্য রাজপথে ডাকাতি! আলবার্ডের মুখ চুন হয়ে গেছে কথাটা শুনে।
অভয়কর বিশ্বাসের দু’চোখে আগুন টিকরে বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন তিনি–কার এমন সাহস আমার টাকায় হস্তক্ষেপ করে! কলকাতার সেরা গুণ্ডা মহাতক সিং আমার হাতের পুতুল। আজই আমি খুঁজে বের করে পুলিশে দেবো বেটাকে। বার্ড, তুমি অচিরেই একটি দিন দেখে আমার বাড়িতে উৎসবের আয়োজন করো। আর সে উৎসবে মাসুদ ইরানী বাজাবে পিয়ানো। শ্যালনকে আমি ঐদিন–যাও। আর শোন, আমি এখন খুব ব্যস্ত থাকবো কারণ যতক্ষণ আমার অর্থ হরণকারীকে গ্রেপ্তার করতে না পারবো ততক্ষণ আমার স্বস্তি নেই।
