কিন্তু কি করে তা সম্ভব! অভয়কর যদি বিরূপ হয় তাহলে তার সমস্ত কারবার বন্ধ হয়ে যাবে। কোম্পানীগুলোতে লালবাতি জ্বলবে। এমনকি হয়ত অভয়কর কৌশলে তাকে পথে বসাতে কসুর করবে না, ছিনিয়ে নেবে সমস্ত সম্পদ।
এর চেয়ে তার মৃত্যু ভাল। যারা তার এতো সহৃদয় বন্ধু তারাই তখন উপেক্ষার হাসি হাসবে। না না, এসব সহ্য করতে পারবেন না। তার চেয়ে শ্যালনকে তুলে দেবেন অভয়কর বিশ্বাসের হাতে। সামান্য একটা মেয়ের জন্য আলবার্ড তার সবকিছু বিসর্জন দিতে পারেন না।
ভোরে টেলিফোনে জানিয়ে দিলেন আলবার্ড তার পরম বন্ধু অভয়করকে এ সুসংবাদটা–আজ রাতেই তুমি তোমার কক্ষে পাবে শ্যালনকে।
টেলিফোনের ওপাশে বীভৎস এক হাসির শব্দ হলো–থ্যাঙ্ক ইউ বন্ধু–থ্যাঙ্ক ইউ–জানি তুমি আমার আশা পূর্ণ করবে।
রিসিভার রেখে সোজা হয়ে বসলেন আলবার্ড, ঠিক সে মুহূর্তে তাকিয়ে দেখলেন–কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন বিখ্যাত পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানী। দীর্ঘ বলিষ্ঠ দীপ্তময় সুন্দর পুরুষ। মাথায় বাদামি রঙ এর কোকড়ানো চুল। এক জোড়া ভ্রর নিচে দুটি উজ্জ্বল নীল চোখ। দেহে হালকা রঙ-এর পোশাক–ঠিক ইরান দেশীয় ড্রেস। মাথায় হালকা রঙ-এর পাগড়ি।
আলবার্ড উজ্জ্বল কণ্ঠে বলে উঠলেন–আপনি!
শান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এলো মাসুদ ইরানী–কাল রাতে ভুল করে আমার ডায়রী রেখে গিয়েছিলাম।
বসুন, আমি এনে দিচ্ছি। হয়তো আর্থার উঠিয়ে রেখেছে।
মাসুদ ইরানী আসন গ্রহণ করলো।
কিছুক্ষণ পূর্বে অভয়করের সঙ্গে আলবার্ড যে ব্যাপার নিয়ে ফোনে আলোচনা করেছিলেন সে কথার রেশ এখনও তার মন থেকে মুছে যায়নি, অন্যমনস্কভাবে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
এমন সময় মিসেস আলবার্ড কক্ষে প্রবেশ করলেন। মাসুদ ইরানী তাকে অভিবাদন করলেন।
মিসেস বার্ড বললেন–শ্যালন মাসুদ ইরানীর আগমন জানতে পেরেছে, সে তার পিয়ানো বাজানো শুনতে চায়।
আলবার্ড হেসে বললেন –বেশ তো, তাকে আসতে বললো। এবার মাসুদ ইরানীর দিকে তাকিয়ে বললেন–শুনলেন তো, মত আছে আপনার?
মাসুদ ইরানী বললো–কারো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখা-আমার মতের বিরুদ্ধে, কাজেই আমাকে পিয়ানো বাজাতে হবে।
মিসেস বার্ড চলে গেলেন। একটু পরে ফিরে এলেন সঙ্গে শ্যালন। শ্যালনের হস্তেই মাসুদ ইরানীর ডায়রীখানা।
শ্যালন ডায়রীখানা মাসুদ ইরানীর হাতে দিয়ে বললো–সবাই কক্ষত্যাগ করার পর আর্থার দাদা ডায়রীখানা এ কক্ষে কুড়িয়ে পেয়ে আমাকে নিয়ে দিয়েছিলেন, আমি তেমনি রেখে দিয়েছিলাম খুলে দেখিনি।
থ্যাঙ্ক ইউ! মাসুদ ইরানী দাঁড়িয়ে শ্যালনের হাত থেকে ডায়রীখানা নিলো।
শ্যালন আর মিসেস বার্ড আসন গ্রহণ করলো।
ওদিকে ডায়াসের পাশে রাখা পিয়ানোর কাছে গিয়ে বসলো মাসুদ ইরানী। সুরের ঝঙ্কারে কক্ষটা মুখর হয়ে উঠলো। মাসুদ ইরানীর হস্তে জীবন্ত হয়ে উঠলো যেন পিয়ানোখানা।
তন্ময় হয়ে গেলো শ্যালন পিয়ানোর সুরে।
মিসেস বার্ডের মনেও আনন্দের স্রোত বয়ে চললো।
মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে শ্যালন মাসুদ ইরানীর মুখের দিকে।
এক সময় মাসুদ ইরানী পিয়ানো বাজানো শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।
শ্যালন বিস্ময় ভরা কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো–অপূর্ব!
মাসুদ ইরানীর মুখে হাসি ফুটলো।
সেদিনের মত মাসুদ ইরানী বিদায় গ্রহণ করলো আলবার্ড মহল থেকে।
মাসুদ ইরানীকে তার গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলেন আলবার্ড। স্ত্রী এবং শ্যালনকে লক্ষ্য করে বললেন–এমন পিয়ানোবাদকের সন্ধান পাওয়া মুস্কিল। আমার ভাগ্য, তাই আমার উৎসব আসরে মাসুদ ইরানীর মত বাদ্যকরের আগমন হয়েছিলো।
মিসেস বার্ডও অকুণ্ঠ গলায় প্রশংসা করলেন মাসুদ ইরানীর।
আলবার্ড লক্ষ্য করলেন– শ্যালনের মুখমণ্ডল মাসুদ ইরানীর প্রশংসায় স্ফীত-উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
এ-কথা সে-কথার পর এক সময় বললেন আলবার্ড–মা শ্যালন, আজ রাতে এক স্থানে বেড়াতে যাবো, যাবে তুমি?
খুশি ভরা কণ্ঠে বললো শ্যালন–কোথায় যাবে কাকা? অনেকদিন শ্যালন কারো বাড়ি বেড়াতে যায়নি কিনা, বেড়াতে যাওয়ার নাম শুনে আনন্দে আপ্লুত হলো সে।
আলবার্ড হঠাৎ বলেই ফেললেন–আমার বন্ধু অভয়কর বিশ্বাসের বাড়িতে—
সঙ্গে সঙ্গে শ্যালনের মুখ অমাবস্যার অন্ধকারের মত কালো হয়ে উঠলো।
আলবার্ড নিজের ভুল বুঝতে পারলেন।
শ্যালনকে অভয়করের বাড়ি যাওয়ার কথাটা বলায় সে গম্ভীর হয়ে পড়লো।
শ্যালন শেষ পর্যন্ত কিছুতেই আলবার্ডের বাড়ি যাওয়ায় রাজি হলো না।
প্রমাদ গুনলেন আলবার্ড-এখন উপায়? অভয়করকে কথা দিয়েছেন আজ রাতেই শ্যালনকে পৌঁছাবেন তার ওখানে।
শ্যালন ক্রুদ্ধভাবে কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেলো নিজের কক্ষে।
আলবার্ড মিসেস আলবার্ডসহ তার কক্ষে গিয়ে অনেক করে বোঝাতে লাগলেন, কিন্তু শ্যালন আর কিছুতেই বাইরে যেতে রাজি হলো না।
শেষ পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়েও কোনো ফল ফললো না। অগত্য আলবার্ড নিজেই গমন করলেন বালিগঞ্জে বন্ধুবর অভয়করের বাড়িতে।
*
অভয়কর বিশ্বাস বিপত্নীক।
সন্তান-সন্ততি যারা আছে তারাও মানুষ নয়। পিতার প্রচুর অর্থ কাজেই লেখাপড়ায় তাদের কি প্রয়োজন। সারা দিনরাত কে কোথায় থাকে বা কাটায় এসব সন্ধান নেবার সময় নেই অভয়কর বিশ্বাসের। তিনটি ছেলে অভয়করের। কেউ বিদ্যায় বিদ্যাপতি না হলেও জুয়া আর মদের আড্ডায় বেশ নাম কিনেছে। ঘোড়ার রেস খেলায় পাকা খেলোয়াড় এক-একজন–কোনো বার লক্ষ টাকা হারলো, দ্বিতীয় বার উঠিয়ে নিলো তার ডবল। শহরে তাদের নাম-ডাক আছে যথেষ্ট।
