শ্যালনের মুখ গম্ভীর হলো।
একটু পরে অভয়কর স্বয়ং উঠে গেলেন শ্যালনের পাশে। হাতে তার কাঁচপাত্র; কি যেন বলে কাঁচপাত্রটা বাড়িয়ে ধরলেন শ্যালনের দিকে।
শ্যালন কাঁচপাত্রটা গ্রহণ না করে আসন ত্যাগ করলো এবং চলে গেলো পাশের কামরায়।
অভয়কর ফিরে এলেন নিজ আসনে, আলবার্ডের সঙ্গে একবার দৃষ্টি বিনিময় হলো তার।
মাসুদ ইরানীর হস্তে পিয়ানোটা মুহূর্তের জন্য থেমে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মাসুদ ইরানী নিজেকে সামলে নিলো অতি সাবধানে।
*
আনন্দোৎসব শেষ হলো রাত বারোটায়।
আলবার্ড স্বয়ং সম্মানিত অতিথিগণকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন।
অভয়কর বিশ্বাস এবার বিদায় চাইলেন, তখন আর একবার আলবার্ডের মুখে তাকিয়ে চাপাকণ্ঠে কিছু বললেন।
আলবার্ডের মুখে হাসি ফুটলেও সে হাসি যেন নিরস আনন্দহীন মনে হলো।
অভয়কর গাড়িতে বসে হাত নাড়লেন।
আলবার্ডের মুখ তখন কালো হয়ে উঠেছে।
সবগুলো গাড়ি যখন এক এক করে বিদায় নিয়ে চলে গেলো, তখন আলবার্ড অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন।
আর্থার এসে দাঁড়ালো তার সামনে–বাবা, এ তোমার অন্যায়।
জানি কিন্তু কোনো উপায় নেই! অভয়কর বিশ্বাস আমার কাছে এখনও কোটি টাকা পায়।
তাই বলে ঐ শয়তান লোকটার কাছে শ্যালনের মত নিরীহ একটি মেয়েকে–না না এ হতে পারে না বাবা। এ হতে পারে না—
আর্থার, তুমি আমার সব কথা জানো না। অভয়কর আমার বন্ধু হলেও আমি তার কাছে সর্বতোভাবে ঋণী। অভয় যদি আমার উপর বিরূপ হয় তাহলে আমার সমস্ত কারবার বন্ধ হয়ে যাবে।
নিজের স্বার্থের জন্য তুমি—
হাঁ, উপায় নেই কোন।
আলবার্ড চলে যান নিজের কামরায়।
থ’মেরে দাঁড়িয়ে থাকে আর্থার পিতার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে।
কলকাতার মার্চেন্টপ্রিন্স অভয়কর বিশ্বাসকে তে না জানে!
বড় বড় কয়েকটি কোম্পানীর মালিক তিনি। তার সবচেয়ে বড় কোম্পানী সিমেন্ট কারখানা। দৈনিক হাজার হাজার ব্যাগ সিমেন্ট তার কারখানা থেকে দেশ-বিদেশে চালান যায়। আসে লক্ষ লক্ষ টাকা।
অভয়করের কারবারের সঙ্গে কলকাতা শহরের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট কন্ট্রাক্টরের যোগাযোগ ছিলো। তারা শহরে বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন অভয়কর বিশ্বাসের কারখানার সিমেন্ট ব্যাগের সাহায্যে। কিন্তু সে সব প্রতিষ্ঠান গড়েই উঠেছে শুধু তার অস্তিত্ব কতদিন টিকবে কে তা জানে!
শত শত শ্রমিক এ কারখানায় দিবারাত্রি পরিশ্রম করে চলেছে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সপ্তাহ পর পায় তারা যৎসামান্য কয়েকটি টাকা। যা তারা পায় তা দিয়ে তাদের সংসার চলে না, অর্ধাহারে অনাহারে গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে নিয়ে আস্তাকুঁড়ের মত কুঁড়ে ঘরে বাস করে পথের কুকুরের মত।
আর অভয়কর বিশ্বাস কোটি কোটি টাকার মালিক। কলকাতা শহরের বুকে তার অগণিত বাড়ি-গাড়ি আর ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য।
এহেন অভয়করের নজর পড়লো বাপ-মরা কচি একরত্তি মেয়ে শ্যালনের উপর। শ্যালনকে দেখে তার ভাল লেগেছে, তাই অভয়কর বিশ্বাস উৎসব আসরেই গোপনে কথাটা জানিয়ে বসলেন আলবার্ডের কাছে।
কথাটা শুনে আলবার্ড মনে মনে শিউরে উঠলেও মুখে তিনি হাসিভরা ভাব টেনে শ্যালনকে বলেছিলেন– মা, আমার বন্ধু অভয়কর বিশ্বাস তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে চান।
অভয়কর তাই আসরেই কাঁচপাত্র হস্তে গিয়েছিলেন শ্যালনের সঙ্গে আলাপ জমাতে; কিন্তু শ্যালন অভয়করের আচরণ পছন্দ করেনি সে ক্রুদ্ধ হয়ে কক্ষ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলো নিজের কক্ষে।
শ্যালন উৎসব-আসর থেকে রাগতঃ হয়ে চলে গেলেও অভয়কর বিশ্বাস ভরসা হারান নি। কারণ আলবার্ড তার হাতের পুতুল। আলবার্ড ধনকুবের নামে লোকসমাজে পরিচিত হলেও আসলে সে অভয়কর বিশ্বাসের অনুগ্রহের পাত্র। অভয়কর জানেন, আলবার্ড কিছুতেই তাঁর ইচ্ছাকে অপূর্ণ রাখতে পারবে না। যদিও তাঁর বয়স পঞ্চাশের অধিক হয়েছে, তবু তার নাইট-ক্লাবে রাত্রি কাটানো অভ্যাস। বিলাতী মদ আর নারী-ভোগ। তার জীবনের এক পরম নেশা।
অভয়কর বিশ্বাসের টাকার অভাব নেই, তাই যা মন চায় তাই তিনি করেন।
শুধু অভয়কর বিশ্বাসই নয়, এমনি আরও কিছুসংখ্যক ধনকুবের মার্চেন্টপ্রিন্স আছেন যারা লোকসমাজে বাস করে মানুষ নামে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু হৃদয় তাদের মানুসের মত নয়। পশুর মত অন্তঃকরণ নিয়ে পিশাচের মত আচরণ করে চলেন তারা নিরীহ জনগণের প্রতি। নিজেদের ঘরে মা-বোন-স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও পরের মা-বোন-স্ত্রীর প্রতি লালসাপূর্ণ যৌনভাব পোষণ করতে কিছুমাত্র কসুর করেন না।
শুধু ধনকুবের ব্যবসায়ী ব্যক্তিগণই নয়, অমন কত বড় বড় চাকুরীজীবী মহান ভদ্রলোক আছেন যাদের মুখোসের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক-একটি ভয়ঙ্কর পৈশাচিক শয়তান–প্রাণ। যাদের মন আছে কিন্তু হৃদয় বলে কোনো জিনিস নেই। নিরীহ জনগণের বুকের রক্ত শুষে নিয়ে যারা বেঁচে থাকার প্রয়াস পায়। দেশের মেরুদণ্ড যারা সে সব অসহায় অবুঝ মানুষগুলোর হাড় চিবিয়ে যারা রস পান করে তারাই আজ সভ্য সমাজের অধিনায়ক।
অভয়কর বিশ্বাসকে খুশি করবার জন্য আলবার্ডের চোখে ঘুম নেই। সারারাত্রি তিনি কক্ষমধ্যে পায়চারী করে কাটালেন। কিন্তু শ্যালন তার কন্যাস্থানীয় পিতৃহারা অসহায় একটি তরুণী। আলবার্ড নিজের অধর। নিজে দংশন করতে লাগলেন। কি করে এক প্রৌঢ় বিশালদেহী পুরুষের হাতে তুলে দেবেন এ ফুলের মত সুন্দর নিষ্পাপ মেয়েটিকে! অনেক চিন্তা করেও কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হলেন না। আজ ম্যাকমারা নেই, তার কন্যা তারই গচ্ছিত সম্পদ। না না, তা হয় না। নিজ স্বার্থের জন্য এতোবড় অন্যায় তিনি করতে পারবেন না।
