আলম, তুমি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, যেভাবে গাড়ি চালাচ্ছে তাতে এক্সিডেন্ট না হয়ে বসো!
হেসে উঠলো বনহুর ধনবান দুহিতা তুমি! জীবনের মায়া তোমাদের বেশি।
শ্যালন এবার অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, বলে সে –আলম, তুমি নাকি দস্যু কিন্তু এতো কোমল, এতো মায়াভরা তোমার প্রাণ!
হাসালে শ্যালন! আমি তোমাকে বড্ড অবুঝ ভাবতাম–কিন্তু আসলে তুমি অবুঝ নও।
আলম!
হাঁ, এবার চলো তোমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে আসি।
আমাকে নিয়ে এতোক্ষণ এভাবে ঘোরার কি মানে হলো বলো তো?
আবার তুমি ছেলেমানুষের মত কথা বললে শ্যালন। কত দিন পর তোমাকে একান্ত ঘনিষ্ঠভাবে পেয়েছিলাম, তাই তোমাকে ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না।
তুমি যেখানে থাকো নিয়ে চলো আমাকে।
তা হয়না শ্যালন, তা হয় না—
কেন হয় না?
আমি দস্যু ডাকু কিন্তু শয়তান নই।
শ্যালন আর কোনো কথা বলতে পারে না, নিশ্চুপ বসে থাকে।
বনহুরের গাড়িখানা এবার সোজা পার্ক সার্কাস অভিমুখে ছুটতে শুরু করে।
*
শ্যালনকে পৌঁছে দিয়ে বনহুর যখন ক্যালকাটা গ্র্যাণ্ড-হোটেলে ফিরে আসে তখন ভোরের আকাশে সূর্য উঁকি দিচ্ছে।
বয় মিঠু ছুটে এলো, ব্যস্তকণ্ঠে বললো সে–স্যার, গোটা রাত কোথায় ছিলেন?
বনহুর কোট-টাই খুলে মিঠুর হাতে দিয়ে বললো–কেন, আমার জন্য খুব বুঝি ভেবেছিলি?
হাঁ স্যার।
কেন?
কলকাতা শহরে হারিয়ে যাবো, তাই?
স্যার ঠিক তা নয়, তবে কলকাতা শহর–সব সময় এক্সিডেন্ট লেগেই আছে কিনা।
বনহুর বুঝলো, মিঠু তাকে এ কদিনের মধ্যে অনেকখানি ভালবেসে ফেলেছে। হেসে বললো সে–ভয় নেই মিঠু, ফিরতে বিলম্ব হলে আমার জন্য চিন্তা করিসনে। আমার কাজ যে রাতেই।
অবাক হয় মিঠু–রাতে! সে কি রকম কাজ স্যার? লোকে কাজ করে দিনে–যত অফিস, আদালত, কাঁচারী, দোকানপাট–
মিঠুর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠে বনহুর–সব দিনে, হয়, তাই না?
হাঁ স্যার?
কিন্তু আমার অফিস রাতে।
কি কাজ করতে হয় স্যার আপনাকে?
বনহুর গম্ভীর হয়ে পড়ে, ছোকরা বড় চালাক–কোনো গোয়েন্দা দলের লোক নাকি? এতো কথা জিজ্ঞাসার মানে কি? বনহুর বললো–আমার নাস্তা নিয়ে আয়। আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি। ওঃ কি কাজ করতে হয় জানতে চাস্ না?
হাঁ স্যার? শুনলে আমার মনটা নিশ্চিন্ত থাকবে।
হেসে বললো বনহুররাতে শহরে আমাকে ডিউটি দিতে হয়– মানে পাহারা দিতে হয়, বুঝলি?
সেতো পুলিশ আর চৌকিদারের কাজ, আপনি তো ভদ্রলোক।
আমি ভদ্রলোক, তাই ভদ্র-সন্তানদের ঘরে পাহারা দিতে হয়।
ওঃ বুঝেছি। সাহেবদের বাড়ি!
হাঁ। এবার চলে যা, চট পট যা হয় খাবার এনে দে। খেয়ে ঘুমাবো, বুঝলি?
আচ্ছা স্যার।
মিঠু চলে যায়।
বনহুর বাথরুমে প্রবেশ করে।
*
আলবার্ড মুক্তিলাভ করে ফিরে আসার পর তিনি তাঁর পরম আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে একটা আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করলেন। কলকাতার বিশিষ্ট ভদ্রমহোদয়গণ এ উৎসবে বাদ পড়লেন না। বিশেষ করে ধনী ব্যবসায়ী মার্চেন্ট-প্রিন্সগণ এ উৎসবে সর্বশ্রেষ্ঠ অতিথির আসন গ্রহণ করলেন।
পার্ক-সার্কাস রোডের মোড়ে আলবার্ডের হোয়াইট ওয়াশ করা বিরাট বাড়িখানার সম্মুখভাগে অসংখ্য প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে।
আর একখানা কার এসে থামলো গাড়িগুলোর পাশে। মডেল পন্টিয়াক গাড়ি। গাড়ির মধ্যে হতে নেমে এলেন এক প্রৌঢ় ভদ্র লোক-মার্চেন্ট প্রিন্স অভয়কর বিশ্বাস। কলকাতায় তার বিশ্বাস কোম্পানী নামে অনেকগুলো কারবার আছে।
আলবার্ডের বিশেষ একজন বন্ধুস্থানীয় লোক এ অভয়কর বিশ্বাস। আলবার্ড বিশ্বাস কোম্পানীর কয়েকটি কারবারের সঙ্গে জড়িত আছেন। এ কারণেও অভয়করকে তিনি বেশ সমীহ করে চলেন।
বিরাটা হলঘর মার্চেন্ট প্রিন্স মহোদয়গণের আগমনে জমকালো হয়ে উঠেছে। টেবিলে-টেবিলে নানারকম খাদ্যসম্ভার থরে থরে সাজানো। সুস্বাদু পানীয় বস্তুর অভাব নেই।
একপাশে উঁচু একটা স্থানে পিয়ানোবাদক ও অন্যান্য বাদ্যকরগণ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেছে। পিয়ানোর টুং টাং শব্দ কক্ষমধ্যে এক মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি করে চলেছে।
রাত বেশি নয়–সবে মাত্র আটটা।
কক্ষমধ্যে উজ্জ্বল নীলাভো আলো পরিবেশটাকে আরও মধুময় করে তুলেছিলো।
পিয়ানোর টুং টাং আওয়াজের সঙ্গে মার্চেন্টপ্রিন্সগণের হস্তে ছুরি-কাঁটা-চামচের শব্দ আর তাঁদের হাসি গল্পের লহরী মিলে অদ্ভুত এক সুরের সৃষ্টি হচ্ছিলো।
শুধু পুরুষকণ্ঠের হাস্যধ্বনিই নয়, নারীকণ্ঠের উজ্জ্বল কলকণ্ঠ মাতিয়ে তুলেছিলো কক্ষটাকে।
মিসেস আলবার্ডও যোগ দিয়েছেন মেয়েদের মধ্যে।
শ্যালনও এ আসরে বাদ পড়েনি।
ওদিকের একটা সোফায় বসে আছে চুপচাপ। উজ্জ্বল নীলাভ আলো তার সোনালী চুলগুলোকে নীলচে করে তুলেছে। শুভ্র গাউনের উপর জড়িয়ে বুটি করা ফুলগুলো ঝম করছে আলোক রশ্মিতে। অপূর্ব সুন্দর লাগছে আজ শ্যালনকে।
শ্যালন নিশ্চুপ বসেছিলো তার টেবিলের পাশে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো সে এ সব।
পিয়ানোবাদক মাসুদ ইরানীর হস্তে অপূর্ব সুরের ঝঙ্কার উঠেছে। সমস্ত কক্ষটা যেন সুরের মূর্ঘনায় খান খান হয়ে পড়েছে। এমন সুর তারা ইতিপূর্বে কোথাও শোনেনি।
আনন্দে আপ্লুত সবাই।
সকলের হৃদয়েই একটা সুরের মূৰ্ছনা।
হঠাৎ অভয়কর আলবার্ডের দিকে তাকিয়ে কিছু ইংগিত করলেন।
আলবার্ড উঠে গেলেন শ্যালনের পাশে, কি যেন ফিস ফিস করে বললেন।
