এতক্ষণে শ্যালন আড় নয়নে তাকালো একবার বনহুরের মুখের দিকে। লাইট-পোষ্টের বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি চলন্ত গাড়ির মধ্যে প্রবেশ করে মাঝে মাঝে আলোকিত করে তুলছিলো গাড়ির ভিতরটা। শ্যালন দেখলো দস্যু বনহুর রূপে আলমকে। সুন্দর বলিষ্ঠ একটা পুরুষ-মুখ তার মনকে পুলকিত করে তুললো। এবার সে কথা বললো–দস্য হলেও তুমি আমার প্রাণরক্ষক।
একটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো বনহুরের ঠোঁটের কোণে। দৃষ্টি তার গাড়ির সম্মুখে সীমাবদ্ধ, বললো সে তা না হলে তুমি আমায় ঘৃণা করতে?
কোনো কথা বলে না শ্যালন।
বনহুর আবার বললো–শ্যালন, দস্যু আমি নই, দস্যুতা আমার পেশা নয়।
তাহলে তুমি দস্যুতা করো কেন?
জানি এ প্রশ্নই তুমি আমাকে করবে। শ্যালন, শুধু তুমি নও, এ প্রশ্নের জবাব আমাকে অনেকের কাছেই দিতে হয়েছে। কেন আমি দস্যুতা করি, তাই না? চুপ রইলে কেন, জবাব দাও?
ভয় পাচ্ছো, তাই না?
শ্যালন কেমন যেন বোবা বনে গেছে।
বনহুর বললো আবার–শ্যালন, আজ কতদিন হলো আমরা বাংলাদেশে এসেছি বলতে পারো?
৭ই জুন সকাল বেলা আমরা ডায়মণ্ড হারবারে এসে পৌঁছেছি।
আর আজ ২৩ শে আগষ্ট–তিনমাস হতে চলেছে তাই না?
হা।
এ তিন মাসব্যাপী আমি শুধু তোমার বাবার হত্যা রহস্য উদ্মাটনেই ব্যস্ত ছিলাম না। অবসর মুহূর্তে আমি চষে ফিরেছি সমস্ত কলকাতা শহর। কলকাতায় বাস করেও অনেকে যা জানেনা বা দেখেনি। আমি তাই জেনেছি আর দেখেছি। শুনেছিলাম বাংলাদেশ সোনার দেশ। এখানের মাটিতে নাকি সোনা ফলে। শস্য শ্যামলা জননীরূপী বাংলাদেশ। আর আমি কি দেখলাম জানো?
শ্যালন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে, নিষ্পলক নয়নে বাকহীন চিত্রার্পিতের মত।
বনহুর গাড়ি চালিয়ে চলেছে, ফাঁকা জনশূন্য পথ। এ-পথ সে-পথ করে আপন মনে গাড়ি ছুটছে, কোনো স্থিরতা নেই গন্তব্যস্থলের। এ তিন মাসের মধ্যে শ্যালনকে যেন আজ সে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠরূপে পাশে পেয়েছে। জনমুখর কলকাতা নগরীর বুকে বনহুর হাঁপিয়ে পড়েছিলো। এতো লোকের মাঝেও সে নিজেকে একান্ত একা মনে করেছিলো। আজ শ্যালনকে পাশে পেয়ে বনহুর যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। অন্তরের মধ্যে যে কথাগুলো এতদিন বেদনার দানার মত স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে উঠেছিলো, আজ যেন খসে পড়লো একজন শ্রোতা পেয়ে। শ্যালনকে বনহুর ভালবাসে; অন্তর দিয়ে স্নেহ করে কুৎসিৎ লালসাপূর্ণ মন নিয়ে নয়! মানুষ যেমন ফুল। ভালবাসে, তেমনি শ্যালন বনহুরের কঠিন পুরুষ প্রাণে এক অভিনব আনন্দ দেয়।
ফুলের পরশে, ফুলের গন্ধে মানুষ নবজীবন লাভ করে। বনহুর শ্যালনের মধ্যে খুঁজে পায় তার অতৃপ্ত হৃদয়ের এক মধুর আস্বাদ। আজ শ্যালনকে পেয়ে বনহুর মুখর হয়ে উঠে, বলে সে মনের কথা।
ডালহৌসী স্কোয়ার রোড ধরে বনহুরের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিলো সেক্রেটারিয়েটের দিকে। প্রশস্ত পীচঢালা মসৃণ পথ। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা পথের নির্জনতাকে আরও ভাবময় করে তুলেছিলো।
বনহুর বললো–দেখলাম এ দেশের আসল রূপ। মাটিতে সোনা ফললেও কোনো অদৃশ্য হস্তের স্পর্শে সোনা পাথর বনে যায়। শস্য-শ্যামলা জননীর বুকের রক্তই শুধু শুষে নেয় না মানুষ রূপী এ জানোয়ারের দল এরা বাংলার মানুষগুলোর বুকের পাঁজর গুঁড়িয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
আলম এসব তুমি কি বলছো?
সত্যি শ্যালন, এ তিন মাস ব্যাপী আমি বাংলার যে রূপ দেখলাম, সে অতি ভয়ঙ্করী রূপ। এখানে যারা মানুষ তারাই মানুষরূপী শয়তান। তারাই আসল মানুষগুলোর হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে ছিঁড়ে ভক্ষণ করে। ভক্ষণ করে তাদের দেহের মাংস। প্রতিটি রক্তবিন্দু নেয় শুষে। রাক্ষসের চেয়েও নৃশংস এরা এ মানুষনামী ভদ্র মুখোশধারীর দল।
বনহুরের কথাগুলো চলন্ত গাড়ির মধ্যে আগুনের টুকরার মত খণ্ড খণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিলো। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে শ্যালন তার মুখের দিকে।
বনহুর গাড়ি চালাচ্ছিলো, কিন্তু মনের দৃষ্টি তার কোনো অজানার দিকে ছুটে চলছে।
বনহুর বলে চলে–যাদের অস্থি-পাঁজর চুর্ণ করে দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে গড়ে উঠেছে মানুষ নামী প্রাণীদের বেঁচে থাকার চলার পথ, তারাই আজ নিষ্পেষিত নির্যাতিত গৃহহীন সম্বলহীন–ফুটপাতে তাদের আশ্রয়স্থল–
বনহুর যেন হাঁপিয়ে উঠে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। আবার বলে সে–তিনতলায় বাস করে মানুষনামী প্রাণীগুলো পান করে সুধা আর ওদেরই উচ্ছিষ্ট নিকৃষ্ট পদার্থগুলো নিয়ে ডাষ্টবিনের চারপাশে কাড়াকাড়ি করে কঙ্কালসার জড়াগ্রস্ত নিঃসম্বল অসহায় মানুষের দল। যাদের দেহের রক্তের মূল্যে বাংলার এতো মান।
একটু থামলো বনহুর; তারপর বললো–চেয়ে দেখো শ্যালন, ঐ যে পথের দু’ধারে রাজপ্রাসাদ সম অট্টালিকাগুলো দেখছো এগুলো কাদের জান? কাদের হৃদয় নিংড়ানো প্রচেষ্টা দিয়ে গড়ে উঠেছে এ সব ইমার? আংগুল দিয়ে দেখালো বনহুর ফুটপাতের দিকে–ঐ যে যারা পথের ধুলায় কুঁকড়ে পড়ে আছে, ওদেরই বুকের পঞ্জর গুঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে এসব বালাখানা। আজ ওরা নিঃসহায়, অসহায়, আশ্রয়হীন। রোদ বৃষ্টি-ঝড়ে নেই এতোটুকু মাথা গুঁজবার ঠাই। ক্ষুধায় নেই এক মুষ্ঠি খাবার। ডাষ্টবিনের মধ্যে যারা খাবারের সন্ধান করে ফেরে। যাদের লজ্জা নিবারণের জন্য নেই এক খণ্ড বস্ত্র। শ্যালন, বলো–বলো তুমি–একটাই কি আমাদের ভদ্রবেশি মানুষ নামী জীবনগুলোর সমাজের প্রতি ন্যয়বিচার?
