এই ভয়ঙ্করের বুকে আজ সমর্পণ করবো তোমার পিতার হত্যা রহস্যের অমূল্য সম্পদ–বনহুর পকেট থেকে বের করলো একটি ছোট্ট ক্ষুদ্র বাক্স খুলে ফেললো সেটা। সঙ্গে সঙ্গে একটা উজ্জ্বল নীলাভ আলো অন্ধকারে ঝক ঝক করে উঠলো।
শ্যালন মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলো ভয় আর ভীতি, বললো–ওটা কি?
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–এটাই লুকানো ছিলো তোমার বাবা ম্যাকমারার ছোট্ট জামার চোরা পকেটে। আর এটার জন্যই নিহত হয়েছেন তিনি। এথোল এবং হুইসন স্মিথও এর জন্য মৃত্যুবরণ করেছে। পুলিশ কমিশনার বিনয় সেন এটার লোভ সামলাতে পারলেন না তারও মৃত্যু ঘটলো এই এটার জন্য–
আলম ওটা তুমি আমাকে দাও।
উঁ হু ওটা কারো জন্য নয়–বনহুর নীলাভো উজ্জ্বল বস্তুটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো গঙ্গার বুকে।
শ্যালন বিস্ময়ভরা কন্ঠে বললো–এ কি করলে আলম!
হাঁ ওটা আমি গঙ্গার বুকে বিসর্জন দিলাম। কারণ ওটা যার কাছে থাকবে তাকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে।
আলম, ওটা কি ছিলো?
ওর নাম মাণিক–সাত রাজার ধন।
শ্যালনের দু’চোখে বিস্ময়, অবাক গলায় বললো–মাণিক হাতে পেয়ে তুমি গঙ্গার জলে ফেলে দিলে?
হেসে বললো বনহুর–দস্যু বনহুরের কাছে সবই তুচ্ছ।
শ্যালন অন্ধকারে অবাক চোখে তাকালো, কণ্ঠ তার আড়ষ্ট হয়ে গেছে, কোনো কথা তার মুখ দিয়ে। বের হলো না।
২.০৯ বন্ধনহীন দস্যু বনহুর
দস্যু বনহুর! ভয়ার্ত অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো– শ্যালন।
অন্ধকারে যদিও শ্যালনের মুখমণ্ডল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না, তবু বুঝতে পারলো বনহুর, শ্যালন এ নাম শুনে ভীষণ আতঙ্কে শিউরে উঠেছে। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে তার ভয়-বিহ্বলকাতর মুখ। হেসে বললো বনহুর– হাঁ দস্যু বনহুর। কিন্তু সে তোমার হিতৈষী বন্ধু।
নিকষ অন্ধকারে কম্পিত কণ্ঠস্বর শ্যালনের –কিন্তু—
বনহুর ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায় শ্যালনের পাশে কোনো কিন্তু নেই; আমাকে তুমি বিশ্বাস করো। শ্যালন, বাংলাদেশে আমার পরিচয় কেউ জানে না। শুধুমাত্র তুমিই জানলে আমি কে? আমার বিশ্বাস, তুমি কাউকে আমার পরিচয় জানাবে না।
আবার প্রতিধ্বনি করলো শ্যালন–আলম!
এবার বনহুরের কণ্ঠে এক বিরহ বেদনা-বিধুর সুর–শ্যালন, এ বাংলা দেশে আমার কেউ নেই–বন্ধনহীন আমি।
স্তব্ধ হয়ে গেলো বনহুরের কণ্ঠ।
শ্যালনের মুখেও কোনো কথা নেই।
নিমতলা শ্মশানঘাটের উন্মত্ত বাতাস তখন সাঁ সাঁ করে বইছে। অদূরে ভয়ঙ্করী রূপধারিনী কলস্রোতা গঙ্গা। তারাবিহীন জমকালো আকাশ।
শ্যালনের কাঁধে হাত রাখলো বনহুর কি ভাবছো?
চমকে উঠলো শ্যালন।
হাসলো বনহুর–ভয় পেয়েছো?
জমাট অন্ধকারে বনহুরের মুখে তাকালো শ্যালন, কিন্তু কোনো জবাব দিতে পারলো না।
বনহুর বললো–চলো তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
যন্ত্রচালিতের মত অগ্রসর হলো শ্যালন।
গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো উভয়ে। বনহুর গাড়ির দরজা খুলে ধরলো–ওঠো!
বিনা বাক্যে ড্রাইভিং আসনের পাশে সীটে উঠে বসলো শ্যালন জড়পুতুলের মত নিশ্চুপ হয়ে।
ড্রাইভিং আসনে বসে ষ্টার্ট দিলো বনহুর। গাড়ি ছুটতে শুরু করলো।
জনহীন রাজপথ।
পথের দু’ধারে লাইট-পোষ্টগুলো নীরব প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে, কর্তব্যের আদেশে যেন গেড়ে গেছে পা’ গুলো।
ক্কচিৎ দু’একটা গাড়ি দেখা যাচ্ছে, ছুটে চলে যাচ্ছে বনহুরের গাড়িখানার পাশ কাটিয়ে।
নিশ্চুপ গাড়ি চালিয়ে চলেছে বনহুর।
পাশে জড় পদার্থের মত বসে আছে শ্যালন।
বনহুরের দৃষ্টি সম্মুখপথে।
হঠাৎ বললো বনহুর এক সময় এমন চুপ মেরে গেলে কেন শ্যালন? গাড়ি এখন নিমতলা শ্মশান ঘাট ছেড়ে অনেক দূরে এসে পড়েছে, ভয় নেই তোমার।
শ্যালন তবু নীরব, বনহুরের কথায় সে কোনো জবাব দেয় না। যেমন বসেছিলো তেমনি রয়েছে।
বনহুর একবার ফিরে তাকিয়ে দেখে নেয় শ্যালনকে, বলে –শ্যালন, মাণিকের মোহে, না দস্যু বনহুর নাম শ্রবণে তুমি নির্বাক হয়ে গেলে। কই, কোন কথাই তো তুমি বলছো না?
বনহুরের চিন্তাধারা মিথ্যা নয়। শ্যালনকে আজ দুটো ব্যাপারই স্তব্ধ করে দিয়েছিলো। একটি হলো অমূল্য সম্পদ মাণিক হাতে পেয়েও তুচ্ছ সামান্য বস্তুর মত গঙ্গার বুকে বিসর্জন দিয়েছে আলম আর একটি হলো আলম সাধারণ মানুষ নয়–সে? বিশ্ববিখ্যাত দস্যু। যে দস্যুর নামে পৃথিবীর সমস্ত দেশ আতঙ্কে আতঙ্কিত। সে বিশ্ববিখ্যাত দস্যু বনহুর তার পাশে উপবিষ্ট। শ্যালন যেন নিজ কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সে বাস্তব জগতে আছে না কল্পনার জগতে–নিজেই যেন ভেবে পাচ্ছে না। দস্যু বনহুর যে স্বাভাবিক মানুষ এ যেন তার চিন্তাধারার বাইরে।
এতদিন শ্যালনের মনে দস্যু বনহুর সম্বন্ধে একটা ভয়ঙ্কর কঠিন বিদঘুঁটে চেহারার প্রতিচ্ছবি আঁকা হয়েছিলো। দস্যু বনহুর নাম শুনলে শিউরে উঠতো সে। ঈশ্বর নাম স্মরণ করতো সে তখন। আর আজ সে দস্যু বনহুর তার পাশে–কত বড় হৃদয় হলে সে মাণিকের মত অমূল্য সম্পদকে সামান্য তুচ্ছ জিনিসের মত ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে। আর কত বড় নির্ভীক প্রাণ হলে সে এ গভীর রাতের অন্ধকারে নিমতলা শ্মশান ঘাটের অসংখ্য কঙ্কালের স্কুপের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনে কথাবার্তা বলতে পারে–কৃতজ্ঞতা আর অফুরন্ত শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে শ্যালনের মাথাটা।
বনহুর বলে–বেশ, কথা না বললে বুঝতে পেরেছি আমার উপর ঘৃণায় মন তোমার বিষিয়ে উঠেছে।
