বাড়ির চাকর-বাকর সবাই ঘুমিয়ে।
এমন সময় শ্যালনের দরজার টোকা পড়লো।
শ্যালন আজ কিছুতেই ঘুমাতে পারেনি। যখন সে জানতে পেরেছিলো হুইসনের হত্যাকারী আলম নয়। তার বাবা আর এথোল কাকাকে যে খুন করেছিলো সেই খুন করেছিলো হুইসনকে এবং সে এখন জীবিত নয়–মূত। আলম খুনী নয় সে নির্দোষ–নিষ্পাপ। শ্যালন আনন্দে আজ আত্মহারা– আলমকে সে ভালবাসে। বিশ্বাস করে। সেও যে খুনী বলে স্বীকার করেনি কোনো দিন, প্রমাণ হলো সত্যি সে খুনী নয়–
হঠাৎ চমকে উঠে শ্যালন, একবার– দু’বার–তিনবার টোকা পড়লো দরজায়।
শ্যালন ভয় পেলো না আজ। একটা দুর্বার সাহস তাকে শয্যা থেকে ঠেলে দিলো যেন–শ্যালন! দরজা খুলে দিতেই দেখলো। সম্মুখে দাঁড়িয়ে আলম।
শ্যালন আনন্দধ্বনি করে উঠলো তুমি!
বনহুর বললো–শ্যালন, চুপি চুপি আমার সঙ্গে চলে এসো খুব শীঘ্র করে।
তোমার সঙ্গে?
হা ভয় নেই, আবার পৌঁছে দেবো।
শ্যালন দরজাটা ভাল করে বন্ধ করলো, তারপর বললো–চলো।
আমার হাত ধরো শ্যালন। বাড়ির পিছনের সরু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেতে হবে। ওদিকের রাস্তায় আমার গাড়ি অপেক্ষা করছে।
শ্যালন বনহুরের হাত ধরে তার গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ালো।
বনহুর ড্রাইভিং আসনের দরজা-খুলে বললো উঠে পড়ো।
শ্যালন গাড়িতে উঠে বসলো।
বনহুর ড্রাইভিং আসনে, স্টার্ট দিলো এবার।
শ্যালন বললো–কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?
তোমাকেও যদি হত্যা করি সেই ভয় হচ্ছে বুঝি?
আমাকে হত্যা করবে, বেশ তো করো।
সাবাস শ্যালন, তুমি নির্ভীক নারী। যা হোক তাহলে সত্যি ভয় পাওনি।
না মোটেই ভয় পাইনি। আলম, আমি সব শুনেছি।
কি শুনেছো?
হুইসনের হত্যাকারী তুমি নও। আমার বাবাকে যে হত্যা করেছে সেই হত্যা করেছে এথোল আর হুইসনকে।
এতো সংবাদ তুমি কোথায় পেলে শ্যালন?
আর্থার আমাকে বলেছে, আরও বলেছে–তুমিই নাকি তার বাবাকে সদ্য ফাঁসির মঞ্চ থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে।
আমি! গাড়ির সম্মুখে দৃষ্টি রেখে বললো বনহুর।
আলম, তুমি নিজেকে অমনভাবে গোপন রাখতে চাও কেন?
কারণ আমি দোষী।
শ্যালন হেসে উঠে–তোমার সব দোষ আমি জানি। আর্থার দাদার কাছে ভয় দেখিয়ে টাকা নিয়ে গিয়েছিলে–এই তো! কিন্তু তার বাবার মঙ্গলের জন্যই তুমি ও কাজ করেছিলে তাও জানি।
গাড়ি তখন সোজা গঙ্গার দিকে ছুটে চলেছে।
শ্যালন বললো–একি এতো রাতে গঙ্গা তীরে কেন?
তোমার সঙ্গে একটা প্রয়োজনীয় কথা আছে শ্যালন।
কি এমন কথা আলম? আমার যেন কেমন সন্দেহ হচ্ছে। এতো রাতে গঙ্গার তীরে—
প্রথমেই বলেছি ভয় নেই।
কিন্তু—
কিন্তু নয় শ্যালন, কথা আছে।
গাড়ি নিয়ে গঙ্গার ধারে এসে পৌঁছলো বনহুর আর শ্যালন।
বনহুর বললো–এবার নামতে হবে।
শ্যালন তাকালো চারদিকে গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন গঙ্গাতীর। কেমন যেন একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে। সাঁ সাঁ করে বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে কেমন একটা উৎকট শব্দ। কোনো অশরীরী আত্মা যেন চলাফেরা করছে সেখানে।
শ্যালন বনহুরের কথা মত নেমে দাঁড়ালো।
একটা হিমশীতল হাওয়া শ্যালনের দেহে যেন কাঁপন ধরিয়ে দিলো। গভীর রাতে গঙ্গার হাওয়া বড় ঠাণ্ডা।
শ্যালন ভীষণভাবে ভয় পেয়েছে; কিন্তু কিছু বলতে পারছে না, মনে মনে ভাবছে–তাকে এভাবে গভীর রাতে নির্জন গঙ্গাতীরে নিয়ে আসার কি মনে হয়। তবে কি কোনো কু-অভিসন্ধি নিয়ে তাকে এখানে এনেছে আলম।
কিন্তু যাকে নাকি ভালবাসা যায়, বিশ্বাস করা যায়, তাকে নাকি ভয় পাওয়া যায় না। শ্যালন গঙ্গাতীরে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘাবড়ে গেলেও আলমকে সে ভয় পেলো না। আলমের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো শ্যালন।
বনহুর হেসে বললো–শীত পাচ্ছে বুঝি?
হাঁ, বড্ড শীত।
বনহুর নিজের শরীর থেকে কোটটা খুলে শ্যালনের দেহে জড়িয়ে দিলো, তারপর ওর হাত ধরে নিয়ে গেলো একেবারে গঙ্গার ধারে।
শ্যালন বনহুরের হাতখানা আঁকড়ে ধরে রাখলো, একবার ভীত কণ্ঠে বললো–এখানে আমাকে কেন নিয়ে এলে আলম? আমার ভাল লাগছে না।
শ্যালন, এখনই ঘাবড়ে গেছে কেন তোমাকে এখানে এনেছি জানলে আরও ঘাবড়ে যাবে।
কেন?
যদি বলি তোমাকে হত্যা করবো বলে ফুসলিয়ে নিয়ে এসেছি?
তুমি আমাকে হত্যা করবে?
হাঁ।
তাহলে এখানে কেন, আমার ঘরেই তো আমাকে হত্যা করতে পারতে?
হেসে উঠলো বনহুর–তাহলে বুঝতে পেরেছো আমি তোমাকে এখানে হত্যার জন্য আনিনি। শ্যালন, তোমার বাবা কেন নিহত হয়েছেন জানো?
এখানে আমি ও কথা শুনতে চাইনে আলম।
তোমাকে শুনতে হবে।
না, আমাকে নিয়ে চলো।
কোথায়? আর্থারের বাসায়?
হাঁ!
কিন্তু সে আশ তুমি ত্যাগ করো শ্যালন।
আলম! শ্যালন করুণ কণ্ঠে ডাকলো এবার। সত্যি সে দারুণ ভয় পেয়ে গেছে।
বনহুর পকেট থেকে বের করলো রিভলভার, চেপে ধরলো শ্যালনের বুকে–তোমাকে আমি খুন করবো।
আর্তনাদ করে উঠে শ্যালন–বাঁচাও বাঁচাও–
বনহুর অট্টহাসি হেসে উঠে-হাঃ হাঃ হাঃ এখানে গলা ফেটে চিৎকার করলেও কেউ জানবে না, কেউ সাড়া দেবে না। কারণ এটা শ্মশানঘাট। নিমতলা শ্মশান–
শ্যালন ভুলে গেলো আলমের হাতে রিভলভার; ঝাঁপিয়ে পড়লো সে তার বুকে, কণ্ঠ জড়িয়ে ধরে থর থর করে কাঁপতে লাগলো।
বনহুর বললো–শ্যালন, ভয় নেই। আমি তোমাকে হত্যা করতে আনিনি। এই নিমতলা শ্মশানঘাটে আজ তোমার পিতার হত্যাকারীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
উঃ কি ভয়ঙ্কর জায়গা।
