মিঃ ভৌম পার্সেল খুলে ফেললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য কণ্ঠে বললেন–এযে দেখছি টেপ রেকর্ড!–
অফিসের সবাই ঘিরে ধরলো, ব্যাপার কি?
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ টেপরেকর্ডটা নেড়েচেড়ে সোজা করে রাখলেন, দেখলেন ফিতে ফিট করাই রয়েছে। তিনি আলগোছে চালু করে দিলেন টেপ রেকর্ড।
একি সবাই চমকে উঠলো–এযে মিঃ বিনয় সেনের গলা। স্তব্দ হয়ে শুনছে পুলিশ অফিসারগণ।
কে–কে–কে তুমি—
চাপা অস্পষ্ট একটা কণ্ঠ–আমি ম্যাকমারার প্রেত আত্মা—
হ্যাঁ কি বললে—
আমি তোমার বন্ধুর আত্মা–
টেপরেকর্ডে বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো কথা নেই। পুলিশ অফিসের কক্ষ যেন নিস্তব্দ মেরে গেছে। সবাই তাকাচ্ছে এ ওর মুখে।
আবার শব্দ ফুটলোকি চাও তুমি আমার কাছে—
অদ্ভুত চাপা ফিসফিসে আওয়াজ–যা তুমি নিয়েছে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে–
ভয়ার্ত চঞ্চল কণ্ঠ পুলিশ কমিশনারের–না, না, আমি তোমাকে দেবোনা–তুমি তো মরে গেছো, কি করবে ওটা নিয়ে–
–ফিসফিসে অস্ফুট কণ্ঠ–মরেও আমি স্বস্তি পাচ্ছিনে–তুমি আমাকে হত্যা করেছো–আমিও তোমাকে হত্যা করে আমার জিনিস ছিনিয়ে নেবো–
মিঃ রাজেন্দ্রের চোখে-মুখে কঠোর কর্তব্যের ছাপ ফুটে উঠেছে। কঠিন হয়ে উঠছে তাঁর মুখমণ্ডল। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনছেন।
–আমি পুলিশ ডাকবো—
কমিশনারের গলা টেপ্ রেকর্ডে হলেও চিনতে ভুল হয় না পুলিশ ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথের।
ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলে ফোনটা সশব্দে বেজে উঠে টেপ রেকর্ড বন্ধ করে দিয়ে রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে কানে ধরতেই বিবর্ণ হয়ে উঠে ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথের মুখমণ্ডল–মিঃ সেন মৃত–
পুলিশ অফিসে যেন বাজ পড়লো।
রিসিভার রেখে ব্যস্তকণ্ঠে বললেন মিঃ রাজেন্দ্রনাথ–সর্বনাশ হয়েছে, মিঃ ভৌম কমিশনার মিঃ সেনকে তাঁর কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
তখনকার মত টেপ রেকর্ড সাবধানে তুলে রেখে সবাই মিলে পুলিশ ভ্যানে ছুটলেন কমিশনার ভবনের দিকে।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য কয়েকজন বিশিষ্ট পুলিশ অফিসার সহ কমিশনার ভবনে পৌঁছে তারা দেখলেন পুলিশ সুপার মিঃ বোস ব্যস্তভাবে পায়চারী করছেন। আরও অনেকে কয়েকজন পুলিশ অফিসারও রয়েছে সেখানে।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ অভিজ্ঞ ইন্সপেক্টার, তিনি আসায় মিঃ বোস তাঁকে নিয়ে কমিশনার কক্ষে প্রবেশ করলেন।
রাজেন্দ্রনাথ এবং অন্যান্য অফিসারগণ বিস্ময়ভরা নয়নে দেখলেন– কমিশনার মিঃ সেন লৌহ। আলমারীর পাশে ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, স্থির আড়ষ্ট তার দেহ। চোখদুটো অধমেলিত।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ মিঃ সেনের হাতখানা স্পর্শ করে বললেন–বহুক্ষণ আগে শেষ হয়ে গেছেন।
পুলিশ সার্জন পরীক্ষা করে বললেন–হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মিঃ সেনের মৃত্যু ঘটেছে।
মিঃ বোস বলেন–কেউ তাঁকে হত্যা করেনি।
না। বললেন সার্জন।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ বললেন–মিঃ সেনের মৃত্যু সম্বন্ধে আমরা অল্পক্ষণ পর স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হবো। কিছুক্ষণ পূর্বে পুলিশ অফিসে পাঠানো ‘টেপরেকর্ড ব্যাপারটা’ বললেন তিনি।
এবার সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন টেপরেকর্ড না শোনা পর্যন্ত সবাই উদ্বিগ্ন রইলো।
.
ঢং ঢং করে রাত দুটো বাজার শব্দ শোনা গেলো। কলকাতা শহর সম্পূর্ণ সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েনি এখনও। তবে সন্ধ্যারাতের উচ্ছলতা নেই এখন। গাড়ি-ঘোড়া, যান-বাহন চলছে, কেমন যেন শিথিলতা এসেছে তাদের চলার মধ্যে।
দোকান-পাট গম গম না করলেও দুচারটে ষ্টল, হোটেল এখনও সরগরম করে বসে পান-বিড়ি সিগারেট খাচ্ছে ট্যাক্সিচালক, ট্রাম-বাসের কণ্ডাকটার আর কুলী-মজুরের দল। যারা সেদিনের শেষ উপার্জনের দুটো পয়সার আশায় এতোক্ষণও ছুটো ছুটি করে ফিরছিলো পয়সাওয়ালা বাবুদের পিছু পিছু তারাই এখন আসর জমিয়ে বসেছে।
রাত বেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্লান্ত অবশ দেহটা নিয়ে একটু রস-রচনা সৃষ্টি করে চলেছে ওরা।
পথের দুধারের বাড়িগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে।
নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে বাড়ির মালিকগুলো তাদের ছেলে-মেয়ে বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে। গেটের পাহারাদার এতোক্ষণ ঝিমুচ্ছিলো টুলটায় বসে বসে, এবার সে দাঁড়িয়ে খাটিয়ায় শুয়ে নাক ডাকতে শুরু করেছে।
পার্ক সার্কসের মোড়ে বিরাট তিন তলা আলবার্ডের বাড়িটাও নিস্তব্দ হয়ে গেছে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এতোদিন পর আজ কতকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে আর্থার। তাই নিদ্রাটাও হয়েছে ঘন। আজ পুলিশ অফিস থেকে তাকে ডাকা হয়েছিলো,এবং জানানো হয়েছে তার পিতা ম্যাকমারা হত্যা ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাঁকে অচিরেই মুক্তি দেয়া হবে।
আর্থার আরও জেনেছিলো–ম্যাকমারা, এথোল এবং হুইসনকে একই ব্যক্তি হত্যা করেছে তিনি হলেন বিনয় সেন। কিন্তু ম্যাকমারার প্রেত-আত্মার বেশে কে তার ওখানে গিয়েছিলো যে হত্যাকারীকে আবিস্কার করে তার পিতাকে নির্দোষ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে–তবে কি সে আলম?
আর্থারের মনে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠেছিলো আলমের সেদিনের কথাগুলো–তোমার পিতাকে নির্দোষ প্রমাণে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন–নিশ্চয়ই ম্যাকমারা কাকার প্রেত-আত্মারূপে বিনয় সেনকে খুনী প্রমাণে সক্ষম হয়েছে আলম। শ্রদ্ধাবনত হয়ে আসে আর্থারের মাথাটা।
এসব চিন্তা করতে করতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে আর্থার।
ওদিকের কক্ষে ঘুমিয়েছেন আর্থার জননী। অসুস্থ মানুষ তিনি, রাত জাগতে পারেন না মোটেই।
