আবার আসবে বলো?
আসবো। শ্যালনের বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নেয় বনহুর, তারপর বলে–আসিবাই, বাই–
বনহুর বেরিয়ে যায়, শ্যালন ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় বেলকোনির ধারে, ঝুঁকে পড়ে হাত নাড়ে।
বনহুরের গাড়িখানা অদৃশ্য হয়ে যায় মোড়ের বাঁকে।
*
কমিশনার ভবন।
গভীর রাত।
একখানা গাড়ি গিয়ে থামলো কমিশনার ভবনের অনতিদূরে বাগানের ওপাশে। জমকালো পোশাক পরা একটি ছায়ামূর্তি নেমে এলো গাড়ি থেকে। কৌশলে বাগান মধ্যে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলো কমিশনার ভবনের পিছন দিকে।
পুলিশ কমিশনার বিনয় সেন গভীর নিদ্রায় অচেতন।
হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো তাঁর। চোখ মেলে তাকাতেই আড়ষ্ঠ হলেন তিনি। একটা জমকালো ছায়ামূর্তি তাঁর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
কক্ষ সম্পূর্ণ অন্ধকার।
বিনয় সেন জেগে উঠার পূর্বেই ডিম লাইট অফ করে দিয়েছিলো ছায়ামূর্তি।
কমিশনার জেগে উঠেই গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–কে–কে–কে তুমি?
চাপা কণ্ঠে বললো ছায়ামূর্তি-আমি ম্যাকমারার প্রেত আত্মা!
হ্যাঁ কি বললে? ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর বিনয় সেনের।
আমি তোমার মৃত বন্ধুর আত্মা।
বিনয় সেন বিছানায় সোজা হয়ে বসে চিৎকার করতে যাবেন। কিন্তু কণ্ঠ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। একে নিদ্রার ঘোের এখনও তার সম্পূর্ণ কাটেনি, তারপর মৃত বন্ধুর আত্মা– ফিস্ ফিস্ করে চাপা কণ্ঠে ছায়ামূর্তি কথা বলছিলো, সম্পূর্ণ অদ্ভুত সে কণ্ঠ স্বর ঠিক যেন ম্যাকমারার গলার আওয়াজ বলে মনে হলো তাঁর।
বিনয় সেন বললেন–কি চাও তুমি আমার কাছে?
যা তুমি নিয়েছো আমার বুক থেকে ছিনিয়ে।
না, না আমি তোমাকে দেবোনা! তুমিতো মরে গেছো কি করবে ওটা নিয়ে?
মরেও আমি স্বস্তি পাচ্ছিনা, তুমি আমাকে হত্যা করেছে আমিও তোমাকে হত্যা করে আমার জিনিস ছিনিয়ে নেবো।
আমি পুলিশ ডাকবো।
ফোন অকেজো হয়ে গেছে।
বিনয় সেন সুইচ্ টিপে আলো জ্বালাতে চেষ্টা করলেন; কিন্তু আলো জ্বললোনা।
হেসে উঠলো ছায়ামূর্তি আলো জ্বলবেনা আর!
এ তুমি কি করেছে?
আমি প্রেত আত্মা, আমি সব পারি।
তোমাকে আমি গুলী করে হত্যা করবো।
চাপা স্বরে হেসে উঠলো ছায়ামূর্তি–হত্যা করবে! করো–
বিনয় সেন ড্রয়ার খুলে বের করলো রিভলভার। ছায়ামূর্তিকে লক্ষ্য করে গুলী ছুড়লো। কিন্তু একি গুলী তো বের হচ্ছে না। পর পর ফায়ার করে বিফল হলেন তিনি। এবার আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না।
ছায়ামূর্তি বিনয় সেনকে জাগাবার পূর্বেই মেইন সুইচ অফ করে দিয়েছিলো। আর বের করে। নিয়েছিলো রিভলভারের গুলী। ফোনের কানেকশানও নষ্ট করে দিয়েছিলো সে। বিনয় সেনের মাথা ঘেমে দর দর করে ঘাম ঝরে পড়ছে। বিবর্ণ পাংশু মুখে ধপাস্ করে বসে পড়লেন বিছানায়। চিৎকার করে বললেন–পাবে না, সে জিনিস তুমি পাবে না।
তবে মরো–ছায়ামূর্তি দু’হাত বাড়িয়ে বিনয় সেনের গলা টিপে ধরলো।
কি ঠাণ্ডা, ঠিক যেন বরফের মত দু’খানা হাত ৷ শিউরে উঠলেন বিনয় সেন, জীবিত মানুষের স্পর্শ এমন হিমশীতল হয়না। ঢোক গিলে বললেন বিনয় সেন–দাঁড়াও দাঁড়াও আমি দিচ্ছি–
দাও—
আলো না জ্বাললে কি করে দেবো?
বলো আমি বের করে নিচ্ছি। চাবি দাও।
চাবি! না, না, আমি –আমি দিচ্ছি–বিনয় সেন অন্ধকারে লৌহ আলমারী খুলে ফেললেন, হাতড়ে বের করলেন একটা ছোট্ট বাক্স।
অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। খুদে বাক্সটা খুলে ফেললেন বিনয় সেন, সঙ্গে সঙ্গে একটা নীলাভ আলো উজ্জ্বল তারার মত চক চক করে উঠলো বিনয় সেনের হাতের মুঠায় ক্ষুদ্র বাক্সটার ভিতরে। বিনয় সেন বলে উঠলেন আপন মনেইনা, না, আমি এটা দেবো না-আমি এটা দেবো না–এটা হস্তগত করতে আমি শুধু তোমাকেই হত্যা করিনি, হত্যা করেছি বন্ধু এথোলকে, আমি হত্যা করেছি হুইসনকে–
এথোলকে কেন তুমি হত্যা করেছিলে?
এথোল জানতো এই অমূল্য রত্নটির কথা এবং সে জেনেছিলো আমিই ওটা নিয়েছি–তাই আমি ওকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
আর হুইসন?
সে আমাকে ম্যাকমারা হত্যার দিন দেখেছিলো আলবার্ডের বাড়ির কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে। আমি–আমি মৃত্যুর হুমকি দেখিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলাম; কিন্তু হুইসন মৃত্যুর ভয়ে কয়েকদিন মুখ বন্ধ করে থাকলেও সে নিজকে আয়ত্বে রাখতে পারেনি, সে বলতে গিয়েছিলো ম্যাকমারার ভাবী জামাতা মিঃ আলমের কাছে।
তারপর?
আমি তাকে শেষ পর্যন্ত বলবার সুযোগ দিই নাই—
ছায়ামূর্তি বলে উঠলো “তুমি তাকে হত্যা করলে?
হ্যাঁ, আমি বাধ্য হয়ে হুইসনকে হত্যা করেছি। জানো ম্যাকমারা, শুধু এই রত্নটার লোভে আমি নিজেকে সংযত রাখতে পারিনি। পুলিশ কমিশনার হয়েও আমি এতো হীন কাজে প্রবৃত্ত হয়েছি। তাই ওটা আমি ভিক্ষা চাই তোমার কাছে–
তা হয় না, ওটার জন্য তুমি একটি নয় তিন তিনটি খুন করেছো, এখন তোমাকেও হয়তো মরতে হবে–কাজেই ওটা আমার কাছেই থাক। ছায়ামূর্তি এক ঝটকায় বিনয় সেনের হাত থেকে কেড়ে নিলো উজ্জ্বল বস্তুসহ ক্ষুদে বাক্সটা। তারপর বললো–এবার তুমি নিশ্চিন্ত—
*
কথা শেষ করে ছায়ামূর্তি বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
পুলিশ অফিসে মিঃ রাজেন্দ্রনাথ কাজ করছিলেন।
অন্যান্য পুলিশ অফিসারগণ নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত।
এমন সময় পিয়ন একটা পার্সেল রেখে বললো–স্যার সই দিন।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ রিসিটে নাম সাইন করে পার্সেলটা মিঃ ভৌমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো– খুলে দেখুন কি এলো।
