তাহোক। মিঠু, তোমাকে আমি নাম ধরে ডাকবো, কেমন?
তাই ডাকবেন স্যার।
আচ্ছা মিঠু, এ হোটেলে তুমি কতদিন কাজ করছো?
বছর তিন-চার হবে।
দেখ মিঠু, সত্যি তোমাকে আমার বড় ভাল লেগেছে।
কত সাহেব আসেন আবার চলে যান; কিন্তু কেউ আমাদের সঙ্গে আপনার মত এমন করে কথা। বলে না। আপনাকেও আমার খুব ভাল লেগেছে স্যার।
সত্যি! বনহুর খেতে খেতে আনন্দধ্বনি করে উঠে।
মিঠু হাসে–হাঁ স্যার। খাওয়া শেষ হলে বনহুর দশ টাকার একখানা নোট গুঁজে দেয় মিঠুর হাতে–তোমার বখশীস্।
দশ টাকা।
হাঁ। শোন মিঠু, আমাকে অনেক সময় নানা কাজে বাইরে ঘোরাফেরা করতে হবে, কারণ আমি কলকাতায় জরুরি এক কাজ নিয়ে এসেছি, বেশ কিছুদিন থাকতে হবে।
টাকাটা খুশি হয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বললো মিটু–স্যার আমাকে সব সময় পাবেন। যা। বলবেন তাই করবো।
বেশ, আমার কথা মতো কাজ করো, কেমন?
করবো স্যার।
বনহুর জামা-কাপড় পরে নিয়ে তখনকার মত বেরিয়ে পড়লো, ক্যাবিনে তালা বন্ধ করে চাবিটা নিজের পকেটে রাখলো সে।
একটা ট্যাক্সি ডেকে চেপে বসলো বনহুর, ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে বললো–ভবানীপুর।
*
হুইসন নিহত হবার পর ম্যাকমারার ছাত্রগণ দেশে ফিরে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। তারা আর একটি দিনও কলকাতায় থাকা উচিৎ মনে করছে না।
বনহুর আজ তাদের নিকটেই উপস্থিত হলো গিয়ে।
ম্যাকমারার ছাত্রগণ মিঃ আলমকে পেয়ে সবাই ঘিরে ধরলো, একবাক্যে সবাই জানালো–আর তারা থাকতে রাজি নয়।
বনহুরও এতে আপত্তি করলো না, এবং তাদের যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখালো। শ্যালনকেও তার দেশে পৌঁছে দেবার জন্য নিয়ে যেতে বললো সে।
ম্যাকমারার ছাত্রদলের নেতা মিঃ লুই, শ্যালনকে দেশে নিয়ে যাবার জন্য স্বীকার করলো। লুই নিজে গেলো পার্ক সার্কাসে আর্থারের বাড়িতে, বললো–আমরা চলে যাচ্ছি, চলো তোমাকে তোমার দেশে পৌঁছে দেব।
কিন্তু শ্যালন কিছুতেই স্বীকার হলোনা, সে মৃত পিতার কথা স্মরণ করে রোদন করে চললো। তারপর কান্না থামিয়ে বললো–দেশে আমি কার কাছে ফিরে যাবো, কে-ই বা আছে আমার! আমি যাবো না, আলমকে ছাড়া আমি কোথাও যাবোনা।
আর্থার বোঝালো–সে একজন খুনী-হত্যাকারী। তোমার পিতাকেও সে হত্যা করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু এতো শোনা সত্ত্বেও শ্যালন আলমকে অবিশ্বাস করতে পারলো না। সে বললো–আমি জানি, সে হত্যাকারী নয়! আমার মন বলছে সে নির্দোষ।
মিঃ লুইও এ কথা বিশ্বাস করতে পারেনি, মিঃ আলম যে হুইসনকে হত্যা করেনি, এটা তারা। জানে। এতোদিন তারা আলমের সঙ্গে এক সাথে কাটিয়েছে, ওকে চিনতে বাকি নেই তাদের। কাজেই আলম যে তাদের নিকটে গিয়েছে এবং এক্ষণে সেখানেই অবস্থান করছে এ কথা প্রকাশ করে না লুই আর্থারের নিকটে।
শ্যালনের কাছ থেকে বিফল হয়ে ফিরে আসে লুই হোটেলে। সব কথা খুলে বলে তার দলবল এবং মিঃ আলমের কাছে। শ্যালন আর দেশে ফিরে যেতে রাজি নয়। দেশে তার নাকি আপনজন বলতে কেউ নেই। তাছাড়া আলমকে সে কিছুতেই কলকাতায় রেখে ফিরে যাবে না।
কথাটা শুনে হাসলো বনহুর, কোনো উত্তর দিলো না মিঃ লুই এর।
শেষ পর্যন্ত ম্যাকমারার ছাত্রগণ শ্যালনকে কলকাতায় রেখেই ফিরে যাওয়া মনস্থ করে নিলো।
বনহুর নিজে গিয়ে তাদের খিদিরপুর ডকে জাহাজে তুলে দিয়ে এলো। জাহাজে যাতে ছাত্রগণের কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য বনহুর নিজ অর্থ ব্যয় করে সব ব্যবস্থা করে দিলো।
ম্যাকমারার ছাত্রদলকে বিদায় দিয়ে বনহুর যখন ফিরে এলো গাড়িতে, তখন নিজের অজ্ঞাতে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এসেছিলো! বার বার মনে পড়ছিলো ম্যাকমারাকে, আজ ফিরে যেতে ম্যাকমারা তার দলবল নিয়ে, কিন্তু নিয়তি তা হতে দিলো না।
ম্যাকমারা হলো নিহত আর সেই সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো সে নিজে। আর একটা সমস্যা তাকে আরও বিভ্রাটে ফেলছে–সে হলো শ্যালন–
হটাৎ বনহুরের চিন্তা ধারায় বাধা পড়ে ড্রাইভার বলে বাবু সাব, আভি কাঁহা যাওগে?
চমক ভাঙ্গে বনহুরের, এ্যা–চলো পার্ক সার্কাস–
সবেমাত্র আর্থার বেরিয়ে গেছে। পথে গাড়ি রেখে ফোনে জেনে নিয়েছিলো বনহুর, তাই সোজা সে চলে এলো আর্থারের বাড়ির সম্মুখে।
গাড়ি-বারান্দায় গাড়ি পৌঁছতেই নেমে চলে গেলো সে শ্যালনের কক্ষে।
শ্যালন একটা বই পড়ছিলো, মুখে দারুণ চিন্তার ছাপ। এলোমেলো চেহারা, মলিন বিষণ্ণ করুণ দুটি চোখ। বনহুর কক্ষে প্রবেশ করতেই শ্যালন চোখ তুলে তাকালো, সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো ওর গলা–আলম। আলম তুমি এসেছো?
শ্যালন কেন তুমি গেলেনা? তোমার বাবার ছাত্রগণ দেশে ফিরে গেলো আর তুমি–
না, না আমি যাবো না, আলম তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।
সেকি কথা শ্যালন? এ তুমি কি বলছো?
আলম, আমি জানি তুমি একদিন না একদিন আসবে। আর আমি সেই প্রতীক্ষায় ছিলাম।
শ্যালন আমি খুনি–
না, না তুমি খুনী নও। আমি জানি তুমি খুনী নও।
শ্যালন! বনহুর যেন একটা তৃপ্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো, পুনরায় বললো–শ্যালন সত্যি তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?
হাঁ আলম, জানি, আমি জানি তুমি খুনী নও।
শ্যালন!
বলো?
আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারছিনে। বাড়ির অন্যান্য কেউ জেনে ফেললে এক্ষুণি আমাকে বিপদে পড়তে হবে।
আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। বললো শ্যালন।
বনহুর ব্যস্তকণ্ঠে বললো–তুমি জানো না শ্যালন, আমি এখন কি অবস্থায় আছি। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।
