একটা শব্দ হলো, কেউ যেন লাফিয়ে পড়লো মেঝেতে।
তবে কি প্রেত-আত্মা কক্ষে প্রবেশ করলো। চাদরের নিচে থর থর করে কাঁপছে আর্থার। মনে মনে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করছে সে।
মেঝেতে জুতোর শব্দ হলো, কেউ যেন তার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো।
আর্থারের হৃদপিণ্ড তখন ধরাস ধরাস করছে, এ বার অশরীরী আত্মা তাকে গলা টিপে হত্যা করবে। চিৎকার করে কাউকে ডাকবে তারও উপায় নেই, গলাটা ওর শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে যেন। চাদর সরিয়ে চোখ মেলে দেখবে তাও সাহস হচ্ছে না। না জানি প্রেত-আত্মার রূপটা কেমন কি ভয়ঙ্করই না হবে! আর্থার কাঁপতে শুরু করেছে, আর প্রাণপণে স্মরণ করছে ঈশ্বরকে।
হঠাৎ তার মুখের চাদর সরে গেলো।
চমকে চোখ মেলে তাকালো আর্থার, সঙ্গে সঙ্গে অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো–কে, কে তুমি!
আমি হুইসনের হত্যাকারী!
তুমি আলম?
হা। বনহুর তার মুখের কালো রুমালখানা একটানে খুলে নিয়ে পকেটে রাখলো, দক্ষিণ হস্তে তার উদ্যত রিভলভার।
আর্থার শয্যায় যেমন শুয়ে ছিলো তেমনি রইলো, ছাই-এর মত বিবর্ণ হয়ে উঠেছে তার মুখমণ্ডল। এতো রাতে এমতাবস্থায় আলম কি করে প্রবেশ করলো তার কক্ষে। ভীতভাবে তাকালো আর্থার আলমের মুখের দিকে।
আলমের চোখ দিয়ে যেন অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। কঠিন তার মুখমণ্ডল। আর্থার তাকালো দরজার দিকে।
বনহুর দাঁত পিষে বললো–খবরদার চিৎকার করলেই তোমার অবস্থা হুইসনের মত হবে।
এখানে কেন তুমি? এখানে কেন, বলো?
হুইসনকে হত্যা করেছি, এবার তোমাকে। বনহুর আর্থারের শরীরের চাদর একটানে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।
এতোক্ষণও শুয়ে ছিলো সে, উঠে বসবার সাহস তার হয়নি। বনহুরের রিভলভারখানার দিকে বার বার তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলো। কখন বুঝি ওর একটা গুলী তার জীবনের ইতি ঘটিয়ে দেয়। বনহুর চাদরখানা ছুঁড়ে ফেলে দিতেই কম্পিতভাবে উঠে বসলো আর্থার; শয্যায় হাত জুড়ে বললো আমি–আমি কি অন্যায় করেছি তোমার?
গম্ভীর কণ্ঠে বললো বনহুর–হুইসন যে অপরাধ করেছিলো!
আর্থার কোনো উত্তর দেবার পূর্বেই বনহুর রিভলভার চেপে ধরলো তার বুকে–চাবি দাও।
চাবি! কিসের চাবি?
সিন্দুকের।
তুমি শুধু খুনীই নও, তুমি চোর-ডাকু—
আমি চোর-ডাকু-খুনী যা বলো সব। দাও চাবি, দাও শীঘ্র।
কেন, কি করবে চাবি তুমি?
তোমার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণিত করে হাজতবাস থেকে মুক্ত করে আনবো, তাই আমার প্রয়োজন প্রচুর অর্থ।
অর্থ!
হাঁ, বিলম্ব-করো না, বা চালাকি করতে যেও না মরবে।
আর্থারের মুখ ছাই-এর মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে, আজই সে ব্যাঙ্ক থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা উঠিয়ে এনেছে, কালকেই তার কারবারের জন্য প্রয়োজন।
চাপা গর্জন করে উঠে বনহুর–চাবি বের করো। সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারের আগাটা ঠেকায় সে আর্থারের বুকে।
আর্থার ভয় পেয়ে গেছে–হুইসনকে যে হত্যা করেছে, তাকে হত্যা করা তার পক্ষে কিছুমাত্র অসম্ভব নয়। আর্থার চাবির গোছা বনহুরের হাতে তুলে দিলো।
বনহুর চাবি নিয়ে লৌহ-সিন্দুক খুলে ফেললো। দ্রুত হস্তে টাকার ফাইলগুলো পকেটে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চাবির গোছা ছুঁড়ে দিলো আর্থারের হস্তে, তারপর বললো–শ্যালনকে দেখাশোনা করো আর্থার। তার প্রতি যদি কোনো রকম অন্যায় আচরণ করো তাহলে তোমার মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনো। আসিবাই বাই–
বনহুর যে পথে এসেছিলো সে পথে বেরিয়ে গেলো।
আর্থার এবার কম্পিত হস্তে রিসিভারখানা তুলে নিলো হাতে–হ্যালো, হ্যালো, লালবাজার পুলিশ অফিস–
অল্পক্ষণেই পুলিশ এসে হাজির হলো। মিঃ ভৌম এবং কয়েকজন পুলিশ ফোন পেয়েই ছুটে এলেন গাড়ি নিয়ে। কিন্তু তাঁরা কোনো কিছুই করতে পারলেন না। রাতেই খবরটা জানানো হলো পুলিশ সুপার মিঃ বোসের কাছে। তিনি জানালেন কমিশনার বিনয় সেনকে।
পরদিন দৈনিক সংবাদ-পত্রিকায় এ খবর বের হলো, তার সঙ্গে বের হলো পর পর কয়েকটি হত্যা-রহস্য। ইতিপূর্বেও কলিকাতা শহরময় এ হত্যা-ব্যাপার নিয়ে একটা ভীষণ চঞ্চলতা দেখা দিয়েছে। তারপর আবার এ রহস্যজনক ডাকাতি।
শহরে নানাস্থানে পত্রিকা সংবাদ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলতে লাগলো। পথে-ঘাটে, ট্রামে বাসে, হোটেলে, ষ্টলে, দোকানে–এমনকি সিনেমা হলেও এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আজ রাতের ডাকাতির ব্যাপার নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হলো।
ক্যালকাটা গ্র্যাণ্ড হোটেল।
একটি বিশিষ্ট কামরায় সোফায় বসে সিগারেট পান করছিলো আর দৈনিক-সংবাদ পত্রিকাখানা দেখছিলো দস্যু বনহুর। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছে গত রাতে পার্ক সার্কাসের একটি বাড়িতে অদ্ভুত ডাকাতির সংবাদটা।
বনহুরের ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো। কুণ্ডলি পাকানো ধর্মরাশির দিকে তাকিয়ে আপন মনে বলে উঠলো–দস্যু বনহুরের প্রথম পদক্ষেপ এটা–পরক্ষণেই ডাকলো বনহুরবয়, বয়–
কক্ষে প্রবেশ করলো একটি বয়–স্যার, ডাকছেন?
হাঁ শোন, কয়েক দিনের মধ্যে আমার গাড়ি আসছে, একটা গ্যারেজের ব্যবস্থা করো।
আচ্ছা স্যার, কোনো অসুবিধা হবে না।
আমার খাবার নিয়ে এসো।
বয় বেরিয়ে গেলো।
অল্পক্ষণ পরে টেবিলে খাবার সাজিয়ে বললো–স্যার খাবার দিয়েছি।
বনহুর পত্রিকাখানা রেখে উঠে খাবার টেবিলে এসে বসলো।
বয় পরিবেশন করছিলো।
বনহুর বললো–তোমার নাম কি?
বয় হেসে বললো-স্যার, আমার নাম মিঠু। গরীব লোক আমরা—
