মিঃ রবিন বললেন–মিঃ ঘোষ আপনি ঠিক আবিস্কার করে ফেলেছেন।
যা হোক, লোকটা যতক্ষণ না ফিরে আসছে ততক্ষণ এভাবেই অপেক্ষা করতে হবে। ভিখারী বেশী মিঃ ঘোষ বললেন।
মিঃ ঘোষ এবং মিঃ রবিন সি, আই, ডি পুলিশ অফিসার। সকালে ব্যারিষ্টার সমরেশ বিশ্বাসের গাড়িখানা হঠাৎ এ ভাবে উধাও হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত থানায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, এবং তিনি পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। গাড়ি এবং গাড়ি হরণকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারলে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হবে।
মিঃ ঘোষ এবং মিঃ রবিন কয়েকজন পুলিশকে আশে পাশে গোপনে রেখে তারা ভিখারীর ছদ্মবেশে ওয়াসেল মোল্লার দোকানের সম্মুখের গাড়িগুলোর নাম্বার লক্ষ্য করছিলেন। শুধু ওয়াসেল মোল্লার দোকানের সম্মুখেই নয়, এমনিভাবে সি আই ডি পুলিশ শহরের বহু স্থানে নাম করা হোটেল, দোকান, ক্লাব সিনেমা হলের এবং নিউমার্কেটের সম্মুখে সজাগ পাহারা দিচ্ছিলো। যে সে কথা নয়– ব্যারিস্টার বিশ্বাসের গাড়ি। প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা মূল্যের গাড়ি-যেমন করে হোক খুঁজে বের করতেই হবে।
মিঃ ঘোষের নিপুণ দৃষ্টি এড়াতে পারেনি গাড়িখানা। মিঃ ঘোষ বাঁশিতে ফুঁ দিলেন–সঙ্গে সঙ্গে আশে পাশে থেকে বেরিয়ে এলো কয়েকজন ছদ্মবেশী পুলিশ। ভিখারীবেশী মিঃ ঘোষ তাদের কানে কানে বললেন–তোমরা নিকটেই অপেক্ষা করবে, গাড়ি এবং গাড়ি হরণকারীকে পাওয়া গেছে। লোকটা দোকানে প্রবেশ করেছে, ফিরে এলেই আমি হুইসেল বাজাবো, ততক্ষণাৎ তোমরা গাড়ি এবং গাড়ির চালককে গ্রেপ্তার করবে।
মিঃ ঘোষের নির্দেশ অনুযায়ী সি আই ডি পুলিশ এদিক-ওদিক গা ঢাকা দিয়ে রইলো।
বনহুর ভিতরে প্রবেশ করে একটা সিল্ক জমকালো বড় রুমাল খরিদ করে নিলো, তারপর পূর্বের দরজা দিয়ে না বেরিয়ে অপর এক দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। এবার মোটর গাড়ির মায়া ত্যাগ করে ট্রাম গাড়ির হ্যাণ্ডেল ধরে উঠে পড়লো। অসংখ্য প্যাসেঞ্জারের ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলো নীরবে।
কণ্ডাকটারের গলা ফাটা চিৎকারে কান ঝালাপালা করছিলো। একটানা হেঁকে চলেছে। কণ্ডাকটার–ভবানীপুর–কালিঘাট–বালিগঞ্জ–
বনহুরের গন্তব্যস্থান কোথায় কোন্ দিকে কে জানে।
*
হুইসনের মৃতদেহের মর্মান্তিক দৃশ্যটাই ভাসছিলো আর্থারের চোখের সম্মুখে। রক্তমাখা দেহ, মৃত্যুমলিন বিকৃত মুখ, আর তার বুকের সেই ক্ষতটা যে ক্ষত দিয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছিলো আলমের কক্ষের মেঝের কার্পেটে। কি ভয়ানক সাংঘাতিক দৃশ্য! কয়েক দিন পূর্বেই নিহত হয়েছেন তার বড় কাকা ম্যাকমারা। এ বাড়িতেই তিনি নিহত হয়েছেন। পর পর দুটি হত্যাকাণ্ড কম কথা নয়।
দুটি হত্যাকাণ্ডে আর্থারের বাড়ির সবাই ভীত-আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে, তারপর আলবার্ডকে মিথ্যা খুনী সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সব ব্যাপারে শুধু আর্থারই নয়, আর্থার জননী মিসেস এলিনা বার্ডও একেবারে মুষড়ে পড়েছেন।
আর্থার তার পিতার কক্ষেই শোয়।
এ কক্ষেই লোহার সিন্দুক আছে। অর্থ এবং মূল্যবান দ্রব্যাদি এ কক্ষেই থাকে, কাজেই তাকে এ ঘরে ঘুমাতে হয়।
সমস্ত বাড়িটায় একটা ভীতিকর ভাব জেগে আছে।
আর্থারের চোখে ঘুম নেই।
দারুণ গ্রীষ্মের মধ্যেও আর্থার চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছে। কিন্তু কিছুতেই তার চোখে ঘুম আসছে না। একটু সামান্য খুট খাটু শব্দতেই চমকে উঠছে সে। না জানি ম্যাকমারা কাকা বা হুইসন স্মিথ ভূত হয়ে না তার সম্মুখে এসে হাজির হয়!
ওদিকে তার কক্ষ আর মায়ের কক্ষের মাঝামাঝি কক্ষটায় শ্যালন শোয়। বেচারী বালিকা মাত্র; ভয়ে কুঁকড়ে থাকে সর্বক্ষণ। পিতার মৃত্যুর পর সে আলমকেই তার একমাত্র ভরসা ভেবে আঁকড়ে ধরেছিলো। এই বাংলা দেশে তার আপন বলে কেউ ছিলো না। যদিও আলবার্ড পরিবার তার পিতার আত্মীয় তবুও সে ওদের কাউকে নিজের করে নিতে পারছিলো না। আলমকে সে শুধু ভালই বাসতোনা, বিশ্বাস করতো আপন জনের চেয়ে বেশি– সেও খুনী! আলম খুনী–কথাটা স্মরণ হতেই শিউরে উঠে শ্যালন, সে বিশ্বাস করতে পারে না আলম খুনী। কিন্তু আর্থার তাকে এমনভাবে বলেছে বিশ্বাস না করেও যেন পারে না সে। আর্থার বলেছে–তার পিতা ম্যাকমারা এবং এথোল কাকাকেও নাকি আলম হত্যা করেছে। হুইসনকে হত্যা করতে সে নিজের চোখে দেখেছে। কি করে ছোরাখানা সমূলে বসিয়ে দিলো তার বুকে–
আর্থারের কথা শুনে আর্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলো শ্যালন–উঃ! কি ভয়ঙ্কর। সরল মনে বিশ্বাস করেছিলো সে ওর কথাগুলো।
তবু মাঝে মাঝে মনে হতো শ্যালনের –আলম হত্যাকারী নয়। আর্থার মিথ্যা বলেছে; কিছুতেই তার মনে অবিশ্বাস আসতো না। আলমকে সে ভুলতে পারতো না কোনো সময়ের জন্য। প্রতিটি মুহূর্তে প্রতীক্ষা করতো সে ওর। আলমের সঙ্গে জড়ানো স্মৃতিগুলো তার মনে এক অভিনব আলোড়ন সৃষ্টি করতো। বিছানায় শুয়ে ভাবতো ওর কথা। আলমকে সে যত নিষ্ঠুর শয়তান বলে ভাবতে চেষ্টা করতো ততই যেন আরও সুন্দর দেবমূর্তি হয়ে ধরা দিতো ও তার কাছে।
ও ঘরে শ্যালন যখন আলম সম্বন্ধে নানারূপ চিন্তা করে চলেছে, এ ঘরে তখন আর্থার ভয়ে শিউরে উঠছিলো। কিছুক্ষণ হলো তার কক্ষের পিছন জানালার শার্শীর বাইরে কিসের যেন খুট খুট আওয়াজ হচ্ছিলো। চাদরের ফাঁকে উঁকি দিয়ে একবার দেখে নিয়েছিলো,কিন্তু কিছুই সে দেখতে পায়নি। আর্থারের মনে পড়েছিলো–অশরীরী আত্মা নাকি দেখা যায় না, তবে তাদের বিচরণ অস্তিত্ব নাকি বোঝা যায়। তবে কি ম্যাকমারা কাকা– না হুইসনের আত্মা তার ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। ভয়ে আর্থারের দেহ ভিজে চুপসে উঠছে। চোখ মুছে বিছানায় পড়ে রইলো সে অসাড়ের মত।
