এখন ওটার নিতান্ত প্রয়োজন।
বনহুর ওদিকের গাড়িখানার পাশে এসে দাঁড়ালো। তাকিয়ে দেখলো, ড্রাইভার সীটের সঙ্গে হেলান দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঝিমুচ্ছে। মাঝে মাঝে মাথাটা গড়িয়ে যাচ্ছিলো সীটের এক পাশে, আবার সরিয়ে সোজা করে নিচ্ছিলো মাথাটা সে।
বনহুর গাড়িটার একেবারে কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে ড্রাইভারের কাঁধে হাত রেখে ব্যস্তভাবে বললো ড্রাইভার ড্রাইভার–
এ্যা– চোখ রগড়ে তাকালো ড্রাইভার।
বনহুর পূর্বের ন্যায় ব্যস্তকণ্ঠে বললো–আরে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছো, সাহেব যে ডাকা ডাকি শুরু করেছেন। যাও যাও, দেখো কি হলো তাঁর।
সাহেব ডাকছেন, আমাকে?
হাঁ, যাও চট করে—
ড্রাইভার তার আসন ত্যাগ করে দ্রুত নেমে দৌড় দিলো গার্ডেনের ভিতরে।
বনহুর উঠে বসলো ড্রাইভিং আসনে, তার পর সাঁ করে বেরিয়ে গেলো ইডেন গার্ডেনের দু’নম্বর গেটের সম্মুখ হতে। এবার কে নাগাল পায়।
কলকাতা নগরী এখন জনমুখর হয়ে উঠেছে।
পথঘাট জনাকীর্ণ।
অসংখ্য গাড়ির আঁকে বনহুরের গাড়ি মিশে গেলো।
কোথায় চলেছে, কোথায় যাবে–কোনই স্থিরতা নেই বনহুরের। দিক্-হারার মত একদিকে চলেছে সে। গাড়ির হ্যাণ্ডেল চেপে ধরে তাকিয়ে আছে সম্মুখের দিকে। এতোক্ষণে গাড়ির মালিক হয়তো তার গাড়ির নম্বর জানিয়ে পুলিশ অফিসে ডায়রী করে দিয়েছে কাজেই বেশিক্ষণ এ গাড়ি ব্যবহার করা। তার চলবে না। ঐ যে কথায় বলে–নিয়তি কাউকে পরিহার করে না। ঢেকি স্বর্গে গেলেও তাকে ধান ভানতে হয়। বনহুর খুন না করেও তাকে খুনী বনতে হয়েছে। এতোক্ষণে পুলিশ মহল তার সন্ধানে সমস্ত কলিকাতা চষে ফিরছে। শুধু একটি নয়– তিনটি খুন! যে ব্যক্তি ম্যাকমারা এবং এথোলকে। খুন করেছে–সেই খুন করেছে হুইসন স্মিথকে। কিন্তু পুলিশ তাকেই সন্দেহ করেছে। এর মূল হলো আর্থার। আর্থারের ভুলের জন্য তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। বনহুর চেয়েছিলো বাংলার মাটিতে বাঙালি সন্তানের মত সুশান্ত হয়ে কাটাবে। ভুলে যাবে সে তার বিগত জীবনের কথা। অন্ততঃ যতদিন বাংলাদেশে থাকবে ততদিনের জন্য। তা হলো কই?—
বনহুর নির্দোষী হয়েও এখানে দোষী। তাকে এখন অপরাধীর মত পালিয়ে বেড়াতে হবে। নিজের জন্য এতোটুকু বিচলিত নয় সে। মনে তার প্রচণ্ড আক্রোশ –কে এই হত্যাকারী, কেন সে পর পর। হত্যা করে চলেছে। যেমন করে হোক তাকে খুঁজে বের করতেই হবে, আবিস্কার করতে হবে তার খুনের উদ্দেশ্য।
কিন্তু খুনীকে খুঁজে বের করতে এবং উদ্দেশ্যকে আবিস্কার করতে চাই প্রচুর অর্থ। অর্থ ছাড়া সম্ভব নয় কিছুতেই একাজ।
দস্যু বনহুর আজ অর্থশূন্য।
সমস্ত দিন বনহুর গাড়ি নিয়ে অসংখ্য গাড়ির ভীড়ে ডুবে রইলো।
ক্ষুধায় পেটের মধ্যে তার জ্বালা করছে, পকেটে হাত দিয়ে দেখলো কয়েকটা টাকা মাত্র তার সম্বল আছে। একটা হোটেলের সম্মুখে গাড়ি রেখে কিছু খেয়ে নিলো সে।
তারপর আবার ছুটলো গাড়ি নিয়ে।
অবশ্য কারণও ছিলো, সন্ধান করে ফিরছে এ মহানগরীর কোথায় সে আস্তানা গ্রহণ করবে। কোথা থেকে সে তার কাজ ঠিকভাবে চালিয়ে যাবে। এক এক করে অনেক জায়গাই ঘুরে ঘুরে ফিরলো বনহুর–ভবানীপুর, কালিঘাট, যাদুঘর, ভিক্টোরিয়া, আলিপুর, মেছোঁয়াবাজার, বড় বাজার, রাজা বাজার, শ্যামবাজার, দমদম, ব্যারাকপুর, বালিগঞ্জ, খিদিরপুর, এমন কি গোবরা গোরস্থানেও সে গাড়ি নিয়ে ছুটলো। গেলো সে নিমতলা শ্মশানঘাটে; আরও বহু জায়গা বনহুর চষে বেড়ালো কলকাতা শহরের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। নিজের ক্ষুধা নিবারণের চেয়ে গাড়ির ক্ষুধা মিটিয়ে নিলো সে কয়েকবার।
কলিকাতা নগরীর বুকে এক সময় নেমে এলো রাতের অন্ধকার। অসংখ্য তারকামালার মত জ্বলে উঠলো ইলেকট্রিক আলোগুলো।
বিচিত্রময় মহানগরী রূপ নিলো বৈচিত্রময়ী রূপে।
দিবালোকের কর্মকোলাহলের মুখরতা আরও গাঢ় হয়ে এলো। পথচারী জনগণের মধ্যে দেখা দিলো আরও চঞ্চলতা। সারাদিনের কর্মব্যস্ত জনগণ ক্লান্তির অবসাদ মুছে ফেলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কেউ বা বাড়ি ফেরার তাগিদে ব্যস্ত, কেউ বা প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের আশায় উন্মুখ। কেউ বা ক্লাব আর ফাংশানে। কেউ ছুটেছে থিয়েটার বা সিনেমা হলের দিকে। আর কেউ বা চলেছে পরিবার পরিজন নিয়ে বন্ধু-বান্ধবীর আমন্ত্রণে যোগ দিতে। কত জনার কত কাজ, সবাই নিজ নিজ কাজ নিয়ে ব্যস্ত। পথের ধারে ভিখারীর দল সন্ধ্যা ভ্রমণকারী বাবুদের কাছে দুটো পয়সার আশায় গলার জোর আরও। বাড়িয়ে দিয়ে চেঁচাচ্ছে-বাবু দুটো পয়সা দিন, বাবু দু’টো পয়সা দিন–
ওয়াসেল মোল্লার দোকানের সম্মুখে এক গাদা গাড়ির পাশে এসে থামলো একটা গাড়ি। নেমে এলো গাড়ি থেকে বনহুর গোটাদিন ভর সে বহু জায়গায় ঘুরে ফিরেছে। ওদিকে ভিখারীটা চেঁচাচ্ছে বাবু দুটো পয়সা দিন, বাবু দুটো পয়সা দিন–
বনহুর পকেটে হাত পুরে হাতড়ে একটা সিকি বের করে ভিখারীর হাতে ছুঁড়ে দিলো, তারপর প্রবেশ করলো দোকানের মধ্যে।
বনহুর ভিতরে চলে যেতেই ভিখারী পাশে এক কম্বল মুড়ি দেয়া অন্ধকে বললো–মিঃ রবিন, এটাই হলো সেই গাড়ি, যে গাড়ির সন্ধানে আমরা এতোক্ষণ অনেক জায়গায় সন্ধান করে ফিরছি।
এ্যাঁ, সত্যি আপনি গাড়ির নাম্বার লক্ষ্য করেছেন?
হাঁ, দেখুন–ভিখারী নোটবুক বের করে মিলিয়ে দেখে নিলো।
