মিঃ রাজেন্দ্রনাথও গুলী ছুড়লেন ছুটে এসে। কিন্তু তিনিও কৃতকার্য হলেন না। এবার তিনি মিঃ ভৌমকে পুলিশদ্বয় সহ মিঃ আলমের গাড়িখানাকে ফলো করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
ইন্সপেক্টারের আদেশ পেয়ে আর এক দণ্ড বিলম্ব না করে মিঃ ভৌম পুলিশদ্বয় সহ পুলিশ ভ্যানে চেপে বসলেন।
বনহুরের গাড়িখানা তখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
মিঃ ভৌম এবং পুলিশদ্বয় অনুসরণ করলো বনহুরের গাড়িখানাকে।
ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ ফিরে এলেন হুইসনের লাশের পাশে।
আর্থারও মিঃ রাজেন্দ্রনাথের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলো, সেও ফিরে আসে কক্ষমধ্যে।
শ্যালন তখনও দাঁড়িয়ে আছে ঠিক পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে, তাকিয়ে আছে সে নিহত। হুইসনের মুখের দিকে। সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে! আলম হুইসনকে হত্যা করেছে কিন্তু কেন সে ওকে হত্যা করলো? তবে কি আলম জানতে পেরেছিলো–হুইসন তার পিতা এবং এথোলের হত্যাকারী? তাই বুঝি আলম হুইসনকে হত্যা করেছে–
শ্যালন যখন নানা রকম এলোমেলো চিন্তা করে চলেছে, তখন বললো আর্থার–শ্যালন, তোমার বাবাকেও মিঃ আলম হত্যা করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং মিঃ এথোলকেও–
না, না। এ হতে পারে না, আমার বাবাকে কিছুতেই সে হত্যা করতে পারে না। এমন কি এথোলকেও হত্যা করতে পারে না আলম।
রাজেন্দ্রনাথ বলে উঠলেন–মিস শ্যালন, আপনি মেয়েমানুষ, এসব রহস্যপূর্ণ কাজ বুঝবেন না।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ হুইসনের লাশ পরীক্ষা করতে থাকেন এবং লাশ পরীক্ষা শেষে আর্থারের নিকট হতে হুইসন হত্যার সাক্ষ্য গ্রহণ করে ডায়রী লিখলেন।
*
বনহুরের গাড়ি সোজা পার্ক সার্কাস রোড হয়ে উল্কাবেগে ছুটে চলেছে। পিছনে প্রায় দু’শো গজ দূরে তীর বেগে ছুটে আসছে পুলিশ ভ্যান। মিঃ ভৌম স্বয়ং রাইফেল হস্তে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন– সীমার মধ্যে এলেই তিনি গুলী ছুঁড়ে সামনের গাড়ির চাকার টায়ার ফাটিয়ে দিবেন। কিন্তু কিছুতেই। বনহুরের গাড়িখানাকে লক্ষ্যের মধ্যে আনতে পারছেন না।
সুদক্ষ ড্রাইভারের মত গাড়ি চালাচ্ছে বনহুর। গাড়ির হ্যাণ্ডেলে হাত রেখেই একবার বাম হস্তের কব্জির উপর রেডিয়াম হাত ঘড়িটার দিকে তাকালো সে। রাত পাঁচটা পঁয়ত্রিশ। কলকাতা শহর সম্পূর্ণ সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে। যদিও দু’একটা গাড়ি মাঝে মাঝে পথে দেখা যাচ্ছিলো, সেগুলো তেমন কোনো বাধার সৃষ্টি করছিলো না বনহুরের। ডবল স্পীডে গাড়ি ছুটছে।
বনহুরের গাড়ি এবার পার্ক সার্কাস রোড ত্যাগ করে কড়েয়া রোড ধরে অগ্রসর হলো। সামনের আয়নায় দৃষ্টিকোণে দেখে নিচ্ছিলো, পিছনের গাড়িখানার সার্চলাইট দুটো তীর বেগে ছুটে আসছে। বনহুর এতোক্ষণ পুলিশ ভ্যানটাকে এড়িয়ে অন্য পথে উধাও হতে পারতো, কিন্তু গভীর রাত্রির জনহীন ফাঁকা পথ– কাজেই সহজে এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
দক্ষ পুলিশ ড্রাইভার মরিয়া হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু তার চেয়েও দক্ষ ড্রাইভার দস্যু বনহুর। কিছুতেই তাকে আয়ত্বের মধ্যে আনতে পারছে না পুলিশ ভ্যানখানা। কড়েয়া রোড অতিক্রম করে ওয়েলেসলী স্ট্রীটে প্রবেশ করলো বনহুর। ওয়েলেসলী স্ট্রীটের মাঝপথে গিয়ে একটা গলি ধরে ছুটলো এবার বনহুরের গাড়িখানা। কিছুক্ষণ অবিরাম গাড়ি চালিয়ে এ পথ সে-পথ করে এক সময় পুলিশ ভ্যানটাকে ছাড়িয়ে নিলো সে। তারপর আরও কিছুক্ষণ এলোপাথাড়ি নানা জায়গায় ঘুরে ফিরে ইডেন গার্ডেনের সম্মুখে এসে গাড়ি রাখলো বনহুর।
ততক্ষণে ভোরের হাওয়া দোলা জাগিয়েছে ইডেন গার্ডেনের মনোরম পুষ্পবৃক্ষের শাখায় শাখায়। অজানিত ফুলের সুরভি প্রাতঃভ্রমণকারীদের মনে এনেছে এক অপরিসীম আনন্দস্রোত। কতগুলো গাড়ি গার্ডেনের গেটের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
রাত পাঁচটা থেকে সম্পূর্ণ দেড় ঘন্টা ধরে অবিরাম গাড়ি চালিয়ে তবেই না পুলিশ ভ্যানটার নিপুণ দৃষ্টি থেকে নিজের গাড়িখানাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে বনহুর। এখন ভোর ছ’টা বেজে চল্লিশ মিনিট হয়েছে। বনহুর হাত ঘড়িটা দেখে নিয়ে ইডেন গার্ডেনে প্রবেশ করলো।
বেশ কিছু সংখ্যক প্রাতঃভ্রমণকারী গার্ডেনে ভোরের হাওয়া উপভোগ করছেন।
বনহুর বেশ ক্লান্ত বোধ করছিলো। একটা নির্জন স্থান দেখে সেখানে বসে পড়লো। হাত দু’খানা দিয়ে ঘামে ভেজা জামার কলার দু’টো উঁচু করে নিয়ে বুকে ফুঁদিয়ে ক্লান্তি দূর করবার চেষ্টা করছিলো।
এমন সময় কিছুদূরে নজর চলে গেলো তার, স্পষ্ট দেখলো– মিঃ ভৌম আর পুলিশদ্বয় ইডেন গার্ডেনের মধ্যে এগিয়ে আসছে। চারদিকে সর্তক দৃষ্টি মেলে এগুচ্ছে তারা। বনহুর বুঝতে পারলো তার সন্ধানেই পুলিশ কর্মচারীত্রয় এ গার্ডেনে আগমন করেছেন, কিন্তু আশ্চর্য। কি করে এখানে তারা ঠিক ঠিক এসে হাজির হয়েছে।
বনহুরের বিশ্রাম আর হলো না, কয়েকজন প্রাতঃভ্রমণকারী ভদ্রলোক তার পাশ দিয়ে গল্প করতে করতে গার্ডেন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। বনহুরও তাদের সঙ্গে মিশে অগ্রসর হলো। কিন্তু বনহুরের গাড়ি রয়েছে এক নম্বর গেটে। এটা দু’নম্বর গেট। বনহুর তাকালো এদিক-ওদিক, ওপাশে কয়েকটা প্রাইভেট কার দাঁড় করানো রয়েছে। একটা কারে ড্রাইভার বসে ঝিমুচ্ছিলো, ভোরের হাওয়ায় তার। দু’চোখে ঘুমের পরশ লেগেছে।
বনহুর পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিলো রিভলভারখানা তার পকেটে ঠিক জায়গায় আছে কিনা। বনহুর বুদ্ধি করে রিভলভারখানা পকেটে রেখেছিলো, না হলে ওটাকে সঙ্গে নেবার সময় তার হতো না। অবশ্য রিভলভারখানা পকেটে রাখার উদ্দেশ্যও ছিলো। বনহুর বাইরে বের হবে কিনা এ নিয়েই ভাবছিলো, ঠিক সে মুহূর্তে তার কক্ষে প্রবেশ করেছিলো হুইসন। কাজেই রিভলভার তার পকেটেই রয়ে গিয়েছিলো।
