বনহুর ফিরে তাকাতেই বিস্মিত হলো–তার কক্ষের দরজা খুলে গেছে, দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাকমারার ছাত্র হুইসন স্মিথ। যার সন্ধানে বনহুর আজ সকাল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত প্রায় সমস্ত কলকাতা শহর চষে ফিরেছে।
বনহুর দ্রুত শয্যা ত্যাগ করে এগিয়ে গেলো, হুইসন! হুইসন তুমি–কিন্তু ওকে ধরতে গিয়ে চমকে উঠলো বনহুর হুইসনের পিঠের বাম পাশে একখানা সূতীক্ষধার ছোরা বিধে রয়েছে। রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে তার জামা-প্যান্ট। ঢলে পড়ে যাচ্ছিলো হুইসন বনহুর ওকে তাড়াতাড়ি সম্মুখের সোফাটায় বসিয়ে দিয়ে দ্রুত হস্তে লাইট জ্বাললো। এতোক্ষণ ডিমলাইটের আলোতে হুইসনকে চিনলেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না।
লাইটের উজ্জ্বল আলোতে বনহুর স্তম্ভিত হতবাক হয়ে গেলেও বুদ্ধি হারালো না, ক্ষিপ্ততার সঙ্গে ছোরাখানা খুলে ফেললো একটানে। সঙ্গে সঙ্গে তাজা রক্ত ফির্কী দিয়ে বেরিয়ে এলো।
বনহুর বুঝতে পারলো হুইসনের মৃত্যুর আর বিলম্ব নেই। ঝুঁকে পড়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বললো– হুইসন বলো? বলো কি বলতে এসেছে আমার কাছে? কি বলতে চাও তুমি–
কিন্তু হুইসন অনেক চেষ্টা করেও একটি কথা উচ্চারণ করতে পারলো না, কিছু বলতে গেলো অমনি ঘাড়টা ঢলে পড়লো এক পাশে। বনহুর বার বার ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকলো–হুইসন–হুইসন হুইসন–
হুইসনের প্রাণবায়ু তখন অসীমে বিলীন হয়ে গেছে।
বনহুর হুইসনের মাথাটা সোফায় ঠেশ দিয়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো চোখমুখ তার কঠিন হয়ে উঠেছে। না জানি হুইসন তাকে কি সংবাদ জানানোর জন্য এমন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলো। গতরাতে সে হোটেলে সঙ্গীদের বলে এসেছিলো, আমি মিঃ আলমের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। কিন্তু সে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়নি। ফিরেও যায়নি সে আর। কোথায় আটকা পড়েছিলো হুইসন? কে তাকে বন্দী করে রেখেছিলো? আর কেনই বা তাকে এভাবে ছোরাবিদ্ধ করে হত্যা করলো? কি বলার জন্য শেষ পর্যন্ত হুইসন রাতের অন্ধকারে তার কাছে ছুটে এসেছিলো? বনহুর ক্ষিপ্তের মত চঞ্চল হয়ে উঠলো, একটি কথাও যদি হুইসন বলে যেতে পারতো তবু বনহুর স্বস্তি পেতো। বনহুরের ইচ্ছা হলো নিজের দেহে নিজে দংশন করে। চঞ্চলভাবে কিছুক্ষণ পায়চারী করে সে। ভাবে কে এই নৃশংস হত্যাকারী যে পরপর হত্যা করে চলেছে। ম্যাকমারা ও এথোলকে হত্যা করেও নিশ্চিন্ত হয়নি–আবার সে হত্যা করলো হুইসনকে–বনহুর উন্মাদের মত টেবিলে মুষ্টিঘাত করলো, হুইসনের মৃতদেহ তার কক্ষের সোফায় শায়িত ভুলে গেলো সে কথা। দাঁতে-দাঁতে পিষে তাকালো মুক্ত জানালা দিয়ে ঘুমন্ত মহানগরীর দিকে। কতক্ষণ যে একভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো বনহুর খেয়াল নেই, হঠাৎ মনে পড়লো কক্ষে লাশ রেখে এভাবে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে বিভ্রাট ঘটবে– তাড়াতাড়ি বনহুর ফিরে এলো লাশের পাশে। দ্রুত হস্তে হাতড়ে চললো হুইসনের জামার পকেটগুলো। যদি কোনো কিছুর সন্ধান পাওয়া যায়।
বনহুর হুইসনের জামার পকেটে হাত পুরে খুঁজে চলেছে, রক্তে তার হাত দু’খানা চুপসে উঠেছে। একটা কিছু পাওয়া গেলো না হুইসনের পকেটে। বনহুর ছোরাখানা হাতে তুলে নিয়ে দেখছে ঠিক সেই দণ্ডে কক্ষে প্রবেশ করলো আর্থার। তার পিছনে পুলিশ ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ, ও, সি, জয়দেব ভৌম আর দুজন পুলিশ।
বনহুর ছোরা হস্তে ফিরে তাকাতেই মুহূর্তের জন্য আড়ষ্ট হলো। উঠে দাঁড়ালো সে–দু’চোখে তার বিস্ময়।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ রিভলভার উদ্যত করে ধরলেন–খবরদার নড়বেন না।
আর্থার দাঁত পিষে বললো–আলম, তুমি সবার চোখে ধূলো দিতে পারো কিন্তু আমার চোখে নয়।
বনহুর স্থির দৃষ্টি মেলে তাকালো আর্থারের মুখে, কিন্তু একটি কথাও সে উচ্চারণ করলোনা।
ততক্ষণে শ্যালন এসে দাঁড়িয়েছে, তার নিদ্রাজড়িত দু’চোখে রাজ্যের ভয়-ভীতি আর বিস্ময়।
আর্থার বললো– ঘন্টাখানেক পূর্বে কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। এ ঘর থেকেই কথার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। আমি দরজার ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখি–ইসনের দেহ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, আর ছোরা হস্তে দাঁড়িয়ে আছে আলম। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার কক্ষে ফিরে যাই। এবং ফোন করি পুলিশ অফিসে–
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ এবং মিঃ ভৌম অল্পক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বনহুর মিঃ রাজেন্দ্রনাথের রিভলভারে হাত দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করে।
ছিটকে পড়ে রিভলভারখানা কয়েক হাত দূরে।
বনহুর মুহূর্ত মধ্যে ওদিকের মুক্ত জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। জানালায় কোনো সিকের ফর্মা বা কাঁচের শার্শী আটকানো ছিলো না। চুড়ান্ত গরম বোধ করায় বনহুরই খুলে দিয়েছিলো কাঁচের শার্শীগুলো কিছুক্ষণ পূর্বে। এক্ষণে তারই কাজে এলো, শার্শী খুলে রাখার জন্য পালাতে সক্ষম হলো সে।
গাড়ি বারান্দায় আর্থারের দেয়া তার গাড়িখানা পার্ক করা ছিলো বনহুর ক্ষিপ্তভাবে ছুটে গিয়ে চেপে বসলো ড্রাইভিং আসনে। তারপর আর কে পায় তাকে।
সাঁ করে বেরিয়ে গেলো বনহুরের মডেল কুইন গাড়িখানা। গেট পার হতেই শুনতে পেলো পিছনে পরপর কয়েকবার রাইফেলের গুলীর শব্দ।
হঠাৎ এভাবে ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ অপদস্থ হয়ে যাবেন ভাবতেও পারেননি। তিনি প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারখানা হাতে উঠিয়ে নিয়ে পুলিশদ্বয় এবং ওসি, মিঃ ভৌমকে আদেশ দিলেন, ওর গাড়ির চাকা লক্ষ্য করে গুলী ছুঁড়তে। কিন্তু যখন মিঃ ভৌম আর পুলিশদ্বয় গাড়ি বারান্দায় এসে গুলী ছুড়লেন তখন বনহুরের গাড়ি আলবার্ডের লৌহগেট পার হয়ে বড় রাস্তায় পড়েছে।
