স্যার, রাত তখন কত হবে আমার ঠিক মনে নেই কারণ মিঃ এথোলের মৃত্যু-সংবাদ আমাকে অত্যন্ত ভাবিয়ে তুলেছিলো।
পরপর পুলিশ সুপার মিঃ বোস ইন্সপেক্টার মিঃ রাজেন্দ্রনাথকে মিঃ এথোল হত্যা সম্বন্ধে নানারূপ প্রশ্ন করে চললেন।
বিনয় সেন অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনে যেতে লাগলেন। মিঃ ম্যাকমারা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু ছিলেন। মিঃ এখোলের সঙ্গেও তার গভীর একটা বন্ধু ভাব ছিলো। বিনয় সেন পর পর এদের দু’জনার হত্যাকাণ্ডে একেবারে মুষড়ে পড়েছেন।
মিঃ এথোল হত্যা ব্যাপার নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলার পর মিঃ বিনয় সেন বনহুরকে লক্ষ্য করে বললেন–মিঃ আলম, আপনি আমার বন্ধু ম্যাকমারার ভাবী জামাতা। আমার পুত্র স্থানীয় আপনি। একটি কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করবো বলে আজ আপনাকে আমি ডেকেছি।
করুন স্যার?
আচ্ছা মিঃ আলম, আপনি নিশ্চয়ই জানেন–ম্যাকমারা আর এগোলের মধ্যে গভীর ভাব ছিলো?
শুধু আমি নই, আপনি নিজেও জানেন তাদের সম্বন্ধ কেমন ছিলো।
আমি জানি, তবু আপনাকে কথাটা জিজ্ঞাসা করলাম। আচ্ছা মিঃ আলম আপনি আজ বেশ কয়েকদিন হলো মিঃ আলবার্ডের বাড়িতে আছেন। ও বাড়ির অনেক ব্যাপারই আপনি লক্ষ্য করেছেন। নিশ্চয়ই। বলুন তো আলবার্ড পুত্র আর্থার কেমন ধরণের ছেলে? অবশ্য একজন সম্বন্ধে এ রকম প্রশ্ন করা যদিও ঠিক নয় তবু করতে বাধ্য হচ্ছি।
স্যার, আলবার্ড সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ হলেও আর্থার সম্বন্ধে আমি অত্যন্ত সচেতন। আর্থার এ যুগের ছেলে হয়েও সে অতি সহজ-সরল-স্বাভাবিক থাকে বলে সৎ চরিত্র।
বিনয় সেন পুলিশ সুপার মিঃ বোসের দিকে তাকিয়ে বললেন—
দেখুন আমি যা বলেছিলাম সত্যি কিনা। আমারও ঐরূপ ধারণা আর্থার সম্পূর্ণ এ ব্যাপারে নির্দোষ।
মিঃ বোস বললেন–কিন্তু পুলিশ রিপোটে তাকেও সন্দেহ করা হয়েছে।
ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ বললেন–মিঃ ম্যাকমারা হত্যা ব্যাপারে মিঃ এথোল মিঃ আলবার্ডকে হত্যাকারী বলে প্রমাণ করেছিলেন। এটাও এথোলের নিহত হবার কারণ হতে পারে। পিতাকে হত্যাকারী প্রমাণিত করার অপরাধে সৎচরিত্র আর্থারও নৃশংস হয়ে উঠতে পারে।
আপনারা কি বলতে চান আর্থার মিঃ এথোলের হত্যাকারী? বললো বনহুর।
বিনয় সেন বললেন আবার–হাঁ, তাকে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। এবং সে কারণেই আপনাকে আমি আমার এখানে আসার অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা জানতে চাই–মিঃ এথোল যখন খুন হলেন। তখন আর্থার কোথায় ছিলো তার বাসভবনে না বাইরে?
স্যার, যদিও আমি সত্যি কথা বলছি, তবুও শপথ করে বলছি– আর্থার তখন বাড়িতে ছিলো।
বিনয় সেন গম্ভীর মুখে বললেন–হু!
মিঃ বোস বললেন–কি করা যাবে স্যার? আর্থার কি—
হাঁ, সে মুক্তই থাক কিন্তু তার গতিবিধি লক্ষ্য রেখে চলতে হবে। মিঃ আলম?
বলুন স্যার?
আপনি এ হত্যা ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীকে সাহায্য করলে আমি অত্যন্ত খুশি হবো। এবং আপনাকে–
থাক আপনি খুশি হলেই আমি কতার্থ হবো মিঃ সেন।
কথা ক’টি বলে উঠে দাঁড়ালো বনহুর–আমি এবার যেতে পারি?
ইয়েস। কিন্তু আপনি আমার কথা মনে রাখবেন মিঃ আলম। এ হত্যা ব্যাপারে আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করতে পারেন এবং পারবেন।
আমি কথা দিয়েছি স্যার করবো।
বনহুর বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে। যাবার সময় প্রথমে বিনয় সেন, পরে মিঃ বোস এবং মিঃ রাজেন্দ্রনাথের হ্যাণ্ডসেক করে বিদায় গ্রহণ করলো।
পুলিশ সুপার বললেন এবার–স্যার, আমার মনে হয় মিঃ আলবার্ডের পুত্র মিঃ আর্থার এই হত্যা ব্যাপারে জড়িত আছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টার সুপারের কথায় যোগ দিয়ে বললেন–আমারও সেই রকম সন্দেহ হয়। আর্থার সম্বন্ধে মিঃ আলম যতই প্রশংসা করুন, আর্থার পিতার ব্যাপারে ক্রোধান্ধ হয়ে মিঃ এথোলকে হত্যা করা অসম্ভব নয়।
মিঃ বিনয় সেন স্থির কণ্ঠে বললেন–গভীরভাবে সন্ধান না নেয়া পর্যন্ত কাউকে দোষারূপ করা যায় না। আপনারা মিঃ এথোল হত্যা-রহস্য উদ্ঘাটনে যথার্থভাবে মনোযোগী হন। শুধু তাই নয়, মিঃ। ম্যাকমারার হত্যারহস্যও উদ্ঘাটন করার জন্য আমাদের পুলিশ বিভাগকে আমি নির্দেশ দিচ্ছি। অচিরেই এ দুটি হত্যাকাণ্ডের গুপ্ত রহস্য ভেদ করা চাই। কে এদের হত্যাকারী? কি তার উদ্দেশ্য?
মিঃ বোস বললেন–ম্যাকমারা হত্যা-ব্যাপার নিয়ে পুলিশ মহল অত্যন্ত গভীর মনোযোগ সহকারে সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে স্যার। কিন্তু এখনও হত্যাকারী সম্বন্ধে কোনো রকম ক্লু আবিষ্কার হলো । আবার আর একটি খুন।
হাঁ আবার খুন! কিন্তু কেন এ খুন হচ্ছে বা কে করছে–তাকে খুঁজে বের করতে হবে। মিঃ বোস, আপনি সি, আই, ডি, বিভাগকে জানিয়েছেন, যে এ হত্যাকারীর সন্ধান দিতে পারবে তাকে চূড়ান্তভাবে পুরস্কৃত করা হবে।
তখনকার মত সবাই উঠে পড়লেন। কথাবার্তা এখন এ পর্যন্ত রইলো। বিদায় গ্রহণ করলেন পুলিশ সুপার মিঃ বোস এবং ইন্সপেক্টার মিঃ রাজেন্দ্র নাথ।
*
বনহুর বিছানায় শুয়ে সিগারেট থেকে ধূম্ররাশি নির্গত করে চলেছিলো, গভীর চিন্তায় তার মন আজ আচ্ছন্ন। বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতে এক হত্যা-রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো সে। এ হত্যা-রহস্য তাকে শুধু উন্মত্তই করে তোলে নি তার মনে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ম্যাকমারার জামার মধ্যে কি লুকানো ছিলো? যার জন্য ম্যাকমারা প্রাণ হারালো, নিহত হলেন এথোল। পরপর দুটো হত্যার পিছনে যে ম্যাকমারার জামা তাতে কোন সন্দেহ নেই। বনহুর সিগারেট থেকে শেষ বারের মত ধূম্ররাশি নির্গত করে সিগারেটটা ফেলে দিলো পাশের ছাইদানীতে। হঠাৎ একটা শব্দ হলো ঘটাং করে। বনহুর চমকে উঠলোনা, মনে করলো শ্যালন বুঝি দরজা খুলে তার কক্ষে প্রবেশ করলো।
