বনহুর হঠাৎ বলে উঠলো–অদ্ভুত হত্যাকাণ্ড ইন্সপেক্টার।
অদ্ভুতই বটে। দুটো মহৎ প্রাণ কোনো হিংস্র শয়তানের কঠিন হস্তে নিঃশেষ হয়ে গেলো।
আরও কটা হবে কে জানে। বললো বনহুর।
রাজেন্দ্রনাথ দাঁতে দাঁত পিষে বললো–তৃতীয় হত্যা হবার পূর্বেই হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। মিঃ আলম, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে আমাদের কিছু সাহায্য করতে পারেন।
বলুন আমি আপনাদের কি কাজে আসতে পারি?
আমার বিশ্বাস, আপনি নিজেও এব্যাপারে আগ্রহশীল। অবশ্য কারণ আছে–আপনার ভাবী শ্বশুর নৃশংস ভাবে প্রাণ হারালেন–থামলেন রাজেন্দ্রনাথ।
বনহুর বললো–আপনি ঠিক বলেছেন ইন্সপেক্টার। এ হত্যা রহস্য আমাকেও বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।
রাজেন্দ্রনাথ হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডসেক করলেন বনহুরের সঙ্গে–আপনি আমাদের সহায়তা করবেন নিশ্চয়ই?
করবো। গম্ভীর কণ্ঠে বললো বনহুর।
এবার বনহুর মিঃ এথোলের হত্যা-রহস্য নিয়ে গভীরভাবে কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা করলো মিঃ রাজেন্দ্রনাথের সঙ্গে।
কথাবার্তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এমন সময় হঠাৎ ফোনটা সশব্দে বেজে উঠলো ওসি ফোন। ধরলেন–পরক্ষণেই রিসিভারের মুখে হাত রেখে বললেন–স্যার, আপনার ফোন।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ ফোন ধরলেন এবার–হ্যালো, আজ্ঞে হাঁ এই মাত্র-ফিরে এসেছি–হাঁ লাশ মর্গে পাঠিয়ে দিয়েই এসেছি–আজ্ঞে না তার ঘরে কেনো রকম ধস্তাধস্তির চিহ্ন পর্যন্ত ছিলো না। আচ্ছা স্যার, আসছি–সাক্ষাতে সব বলবো, হা–এখানে মিঃ আলম আছেন। তাকেও আনবো? আচ্ছা স্যার, মিঃ আলমকে জিজ্ঞেস করে নিই তিনি এখন আমার সঙ্গে আসতে পারবেন কিনা। রিসিভারের মুখে হাত চাপা দিয়ে বললেন ইন্সপেক্টার মিঃ রাজেন্দ্রনাথ-কমিশনার স্বয়ং ফোন করেছেন। আপনাকে আমার সঙ্গে তার ওখানে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।
বনহুর বললো–বেশ, যাবো চলুন।
রাজেন্দ্রনাথ পুনরায় ফোনে মুখ রেখে বললেন–স্যার, মিঃ আলম আমার সঙ্গে আসছেন। রিসিভার রেখে চেয়ারে ঠেশ দিয়ে বসলেন রাজেন্দ্রনাথ রাত থেকে এতটুকু বিশ্রাম নেই।
থানা অফিসার দেবনারায়ণ বললেন-”স্যার, চা লাগবে?
হাঁ, আনতে বলুন। দেখি শরীরটা একটু চাঙ্গা করে নিই।
অল্পক্ষণে চা এলো।
চা পান শেষ করে ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ এবং বনহুর গাড়িতে চেপে বসলো। বনহুর অবশ্য নিজের গাড়িতেই চললো।
ডালহৌসী স্কোয়ার সেক্রেটারী-এটের অদূরে কমিশনার বিনয় সেন গুপ্তের বিরাট হোয়াইট ওয়াশ করা বাড়ি। লোহার ফটকে রাইফেলধারী পুলিশ দণ্ডায়মান। লাল কাকড় বিছানো পথ চলে গেছে গাড়ি বারান্দায়। গাড়ি-বারান্দার দুপাশে দু’জন রাইফেল ধারী পাহারাদার সদাসর্বদা দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ রাজেন্দ্রনাথের গাড়ি এবং মিঃ আলমের গাড়ি–পর পর দুখানা গাড়ি লৌহ ফটক পার হয়ে প্রবেশ করলো ভিতরে। রাইফেলধারী পাহারাদারগণ সেলুট করে সরে দাঁড়ালো।
কমিশনারের বাসা-সংলগ্ন অফিসঘর।
বিনয় সেন অফিস ঘরেই ছিলেন। তিনি কক্ষমধ্যে উত্তেজিত ভাবে পায়চারী করছিলেন, চোখে মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। অদূরে একখানা চেয়ারে পুলিশ সুপার বসে কাগজপত্র দেখছেন।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ এবং মিঃ আলমবেশী দস্যু বনহুর প্রবেশ করলো সেই কক্ষে।
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেই মিলিটারী কায়দায় সেলুট করলেন মিঃ সেন এবং মিঃ বোসকে।
বনহুর বললো–গুড মর্নিং।
বিনয় সেন অস্ফুট একটু শব্দ করলেন–গুড মর্নিং। বসুন আপনারা। কথাটা বলে নিজেও আসন গ্রহণ করলেন কমিশনার।
পুলিশ সুপার শ্রী সমর বোস একবার মাত্র চোখ তুলে দেখে নিয়ে পুনরায় নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন।
বিনয় সেন বললেন–আমি আশ্চর্য হয়েছি–পর পর একইভাবে দুটি খুন সংঘটিত হলো।
স্যার, মিঃ এথোলের খুন আর ম্যাকমারার হত্যা ঠিক একই ভাবে ঘটেছে। ম্যাকমারাও যেমন ফোন করছিলেন তাঁর বন্ধুর কাছে, তেমনি মিঃ এথোলও মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে কারো নিকটে ফোন করছিলেন, কারণ মিঃ এথোলের হাতের পাশেই পড়ে ছিলো রিসিভারখানা।
হা, আপনি ফোনে আমাকে সেরূপ বলেছেন।
বনহুর শান্ত কণ্ঠে বললো–স্যার, আপনি আমাকে যখন ফোন করে মিঃ এথোলের মৃত্যু-সংবাদ জানালেন, তখন আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আপনি না হয়ে যদি অন্যকেহ আমাকে এ সংবাদ জানাতেন তাহলে আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারতাম না।
বিনয় সেন গম্ভীর গলায় বললেন–আমি ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথের ফোন পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। বন্ধু ম্যাকমারা হত্যার পর মিঃ এথোলের নিহত সংবাদ আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করে ফেলেছে। আমি রাজেন্দ্রনাথের ফোন পেয়েই আপনার কাছে ফোন করেছিলাম।
পুলিশ সুপার এবার কাগজপত্র সরিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসলেন। তিনি বললেন–ইন্সপেক্টার মিঃ এখোলের নিহত সংবাদ আপনি কখন কোন সময় পেয়েছিলেন?
মিঃ রাজেন্দ্রনাথ বললেন–কাল একটা ডাকাতি কেস নিয়ে আমাকে পুলিশ অফিসে রাত চারটা অবধি কাজ করতে হয়েছিলো। কাজ শেষ করে যখন বাসায় ফিরবো–ঐ মুহূর্তে বৌবাজার মিঃ এথোলের বাড়ি থেকে তার বৃদ্ধ বয় ফোন করেছে–তার মনিব নিহত হয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে এখানে। ফোন করে ব্যাপারটা জানিয়ে তবে বৌবাজার রওয়ানা দিই।
পুলিশ সুপার মিঃ বোস পুনরায় প্রশ্ন করলেন–আপনি যখন থানা অফিসার এবং পুলিশসহ মিঃ এথোলের বাড়িতে পৌঁছলেন তখন রাত কয়টা আন্দাজ ছিলো?
