শ্যালন ঝুঁকে পড়ে বললো–সেটা কি?
এক ধরনের টাইম বোম্। কিন্তু কি আশ্চর্য, এতোক্ষণ বলো নি?
ওটা কেন রেখে গেলো? গাড়িখানাকে ধ্বংস করার জন্য বুঝি?
শুধু গাড়িখানাকেই ধ্বংস করা উদ্দেশ্য নয় গাড়ির চালককেও।
উঃ কি সাংঘাতিক!
শ্যালন, আর মুহূর্ত বিলম্ব করা ঠিক নয়, চলো আগে এটার সৎগতি করে আসি।
কোথায় যাবে?
বনহুর ড্রাইভিং আসনে চেপে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
শ্যালন বসেছে তার পাশের আসনে।
ডিটোনেটারটা তখন পিছনের আসনের তলায় পড়ে রয়েছে।
বনহুরের গাড়ি স্পীডে ছুটে চলেছে।
পথঘাটে সবেমাত্র যানবাহন চলাচলের ব্যস্ততা বেড়ে উঠেছে। বনহুর ষাট মাইল বেগে গাড়ি চালাচ্ছিলো, সম্মুখে দৃষ্টি রেখে বললো–শ্যালন, এ মুহূর্তে আমাদের মৃত্যু ঘটতে পারে। জানিনা বোমটার টাইম শেষ হয়ে এসেছে কি না।
কি সর্বনাশ, আমি যদি ওটাকে আগেই দূরে ফেলে দিতাম…
না দিয়ে খুব ভালই করেছো শ্যালন। ওটা ফেলতে গিয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনতে।
তবে তুমি ওটাকে ফেলে দাও না গাড়ির বাইরে?
কি ভয়ঙ্কর কথা বলছো শ্যালন। জানোনা বোটা কত বড় সাংঘাতিক। পথের ধারে ফেলবো পাথের লোকের মৃত্যু ঘটবে যে!
তাহলে কি করবে?
যদি বোমটাকে শেষ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারি, তবে একেবারে গঙ্গার জলে।
*
অদৃষ্ট ভাল বলতে হবে বোন্টা নিয়ে বনহুরের গাড়ি গঙ্গা-তীরে এসে পৌঁছলো। এর মধ্যে বোম শান্ত হয়েই রইলো। বনহুর বললো–শ্যালন, তুমি দূরে সরে যাও। যদি মরতে হয় একাই মরবো।
আর আমি বেঁচে থাকবো? তা হবে না। আঃ বিরক্ত করো না শ্যালন, বলছি সরে যাও। সরে যাও।
শ্যালন সরে যেতে বাধ্য হলো।
বনহুর এবার দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে ডিটোনেটার বোটা আস্তে করে হাতে তুলে নিলো, তারপর গঙ্গার অথৈ পানিতে ঝপ করে ফেলে দিলো।
শ্যালন তখনও আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দূরে।
বনহুর লক্ষ্য করলো বোটি গঙ্গার অথৈ পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে একটা ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি হলো। বনহুর বুঝতে পারলো–বোটির টাইম শেষ হয়ে গিয়েছিলো। কি সর্বনাশ! আর এক সেকেণ্ড হলেই তার মৃত্যু ঘটতো তাতে কোনো ভুল নেই।
ভাগ্যিস, আশেপাশে কোনো জনমানব ছিলোনা! গঙ্গার তীর নীরব নিস্তব্ধ, দূরে কয়েকখানা বড় নৌকা বাঁধা রয়েছে। নৌকার যাত্রিগণ এখন হয়তো ঘুমে অচেতন। পূর্ব আকাশ রাঙা করে উঁকি দিয়েছে ভোরের সূর্য।
ফিরে দাঁড়ালো বনহুর।
শ্যালন কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
বনহুর শ্যালনের দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরলো–শ্যালন, আজ তুমিই আমাকে সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করলে। আমি বুঝতেও পারতাম না, আমার গাড়ির পিছন আসনের তলায় কেউ ডিটোনেটার বোম রেখে গেছে। উঃ কি সাংঘাতিকভাবে বেঁচে গেলাম আজ!
দেখলে তো আমাকে তুমি সঙ্গেই আনতে চাইছিলে না।
সত্যি আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ শ্যালন।
আর আমাকে তুমি আফ্রিকার জঙ্গলে কত বার গরিলার কবল থেকে বাঁচিয়েছো। সব আমার মনে আছে, থাকবে চিরকাল।
শ্যালন, দেখ ভোরের সূর্য আমাদের দু’জনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
শ্যালন হেসে বললো–এবার হতে আমাকে সঙ্গে নেবে তো?
নেবো।
চলো।
কিন্তু জানো আমার এক মুহূর্ত এখন বিশ্রামের অবকাশ নেই শুধু তোমার পিতার হত্যা-রহস্যই নয়, আরও অনেক রহস্য এখন জট পাকিয়ে উঠেছে সব রহস্য উদঘাটন করতে হবে।
তুমি কি গোয়েন্দা?
যদি বলো তাই।
তোমার দুঃসাহস দেখলে আমার আর একটি কথা মনে হয়।
বলো?
তুমি ডাকাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
তার চেয়েও!
তুমি দস্যু।
মনে করো তাই।
হেসে উঠে শ্যালন-রাগ করলে?
মোটেই না। চলো! গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো বনহুর, তখনও শ্যালনের হাতখানা তার হাতের মুঠায়।
গাড়িতে বসে বললো বনহুর–আমার কাজ আছে, তোমাকে রেখে আসি কেমন?
সঙ্গে নিতে যখন এতো আপত্তি তখন বেশ তাই চলো।
শ্যালনকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে সোজা বনহুর হাজির হলো লালবাজার পুলিস অফিসে। পৌঁছতেই থানার ওসি সসম্মানে অফিসের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বসালেন বনহুরকে।
ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ অফিসে ছিলেন না। একটু পরে ফিরে এলেন। তিনি মিঃ এথোলের হত্যা ব্যাপার নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এইমাত্র বৌবাজার থেকে তিনি ফিরছেন!
রাজেন্দ্রনাথ অফিসে প্রবেশ করে বনহুরকে হ্যাণ্ডসেক করলেন–হ্যালো মিঃ আলম, ভাল তো?
বললো বনহুর-কই আর ভাল বলুন। পর পর একি হত্যাকাণ্ড শুরু হলো বলুনতো! আজ আবার একটা খুন।
রাজেন্দ্রনাথ আসন গ্রহণ করে মাথার সরকারি ক্যাপটা খুলে টেবিলে রেখে বললেন–এথোলের লাশ মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তবে এলাম। সত্যি, এসব কি রকম হত্যাকাণ্ড শুরু হলো! আমাদের পুলিশ মহল বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
কোন রকম ক্লু পেলেন?
তেমন কিছু পাইনি। তবে হত্যাটা ঠিক মিঃ ম্যাকমারা হত্যার অনুকরণেই হয়েছে। তাঁর মতই এর বুকেও ছোরা বসানো। মিঃ ম্যাকমারার দক্ষিণ হস্তখানা যেমন টেলিফোনে সংলগ্ন ছিলো তেমনি মিঃ এথোলও কারো কাছে ফোনের আলাপ করছিলেন সেই মুহূর্তে তিনি নিহত হয়েছেন।
বনহুর বুঝতে পারলো মিঃ এথোল হত্যা হবার পূর্ব মুহূর্তে তার কাছেই ফোন করেছিলেন, কিন্তু বনহুর সম্পূর্ণভাবে সে কথা চেপে গেলো। অবাক হবার ভান করে বললো–আশ্চর্য!
বললেন রাজেন্দ্রনাথ–শুধু আশ্চর্যই নয় মিঃ আলম, একেবারে যেন বিস্ময়কর ব্যাপার। লাশগুলো পরীক্ষা করে এমন মনে হয়েছে, যেন কোনো বন্ধুর সঙ্গে আলাপরত অবস্থায় তারা খুন হয়েছেন। এতটুকু ধস্তাধস্তি বা নড়াচড়া করবার সুযোগ তারা পাননি।
