পার্ক সার্কাস রোড ত্যাগ করে কড়েয়া রোড় হয়ে ভবানীপুর অভিমুখে চললো।
ভোরের হাওয়া তখন বইতে শুরু করেছে!
ধ্রুবতারা অন্তর্ধান হয়েছে অনেকক্ষণ।
বনহুরের গাড়ি এসে থামলো ভবানীপুর একটা হোটেলের সম্মুখে।
এ হোটেলেই ম্যাকমারার বিশ্বস্ত ছাত্রগণ বাস করছে। ম্যাকমারা নিহত হবার পর তারা দেশে ফিরে যাবার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ম্যাকমারার জাহাজ এখনও খিদিরপুর ডকে অপেক্ষা করছে।
বনহুর গাড়ি রেখে হোটলে প্রবেশ করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় একটি কামরার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। কক্ষের দরজায় টোকা দিয়ে শব্দ করলো সে।
এখনও হোটেলের অভ্যন্তর লোকজনের কলকণ্ঠে সরগরম হয়ে ওঠেনি। দু’চার জন হোটেলবাসী বিদেশী ভদ্রলোক কেবলমাত্র শয্যা ত্যাগ করে প্রাতঃক্রিয়া সমাধা করতে বাথরুমে প্রবেশ করেছেন। কেউ বা এসে দাঁড়িয়েছেন রেলিং এর পাশে। ভোরের হাওয়া উপভোগ করছেন হয়তো।
ম্যাকমারার ছাত্রগণ প্রফেসারের আকস্মিক মৃত্যুতে একেবারে ভয়-বিহ্বল হয়ে পড়েছে। যে রাতে ম্যাকমারা নিহত হন সে রাতে তারাও ছিলো আলবার্ডের বাড়িতে। আলম সাহেবের সঙ্গেই হলঘরের পাশের কামরায় ঘুমিয়ে ছিলো। ম্যাকমারা নিহত হবার পর তারা আর সে বাড়িতে থাকতে রাজি হয়নি। ভীষণভাবে ভীত হয়ে পড়েছিলো ছাত্রদল।
বনহুর অনেক বলে-কয়েও যখন তাদের আর সে বাড়িতে রাখতে পারলোনা তখন আর্থারের সাহায্যে ভবানীপুর এ হোটেলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। এখানে ওদের যেন কোনো কষ্ট না হয় সেজন্য মাঝে মাঝে বনহুর নিজে এসে তাদের দেখাশোনা করতো।
ছাত্রদের মধ্যে ম্যাকমারার প্রধান ছাত্র হুইসন স্মিথ ছিলো সকলের চেয়ে বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী। বনহুরের খুব ভাল লাগতো এই যুবকটিকে। আফ্রিকার জঙ্গলে বনহুর ওকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতো। তারপর জাহাজে যখন শ্যালন থাকতো না তার পাশে, তখন হুইসন ছিলো তার সাথী। হুইসন স্মিথের সঙ্গে বনহুরের অনেক কথা চলতো, আজও তার সঙ্গে দেখা করে গোপন কোনো কথা আলোচনা আশায় সে এই রাত ভোরে এসে উপস্থিত হয়েছে।
বনহুর বার কয়েক দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একজন ছাত্র, সম্মুখে আলমকে দেখে বললো সে কি ব্যাপার? আপনি?
হাঁ, হুইসনের সঙ্গে জরুরি কথা আছে, সে কি উঠেনি?
ছাত্রটি যেন অবাক হলো, সে বললো–হুইসন তো রাতে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পার্ক সার্কাস গিয়েছিলো।
পার্ক সার্কাস! আমার সঙ্গে দেখা করতে?
হাঁ, কিন্তু সে ফিরে আসেনি।
বনহুর চমকে উঠলো যেন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো হুইসন রাতে ফিরে আসেনি!
না!
বনহুর কিছুক্ষণ মৌন থেকে কি যেন গভীরভাবে চিন্তা করলো। তারপর বললো–আচ্ছা চলি।
ছাত্রটি বললো–সে ফিরে এলে তাকে কিছু বলবো কি?
বলতে হবে না, আমি সময় হলে আবার আসবো। কথা শেষ করে বনহুর দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়।
কিন্তু হোটেলের সম্মুখে এসে দাঁড়াতেই বিস্মিত হলো। তার গাড়িখানা কোথায় উধাও হয়েছে। এদিক-সেদিন ব্যস্তভাবে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। আশেপাশে কয়েকখানা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে–শুধু তার গাড়িখানাই নেই। বনহুর নিজের ভুল বুঝতে পারলো, গাড়ির চাবি সে সঙ্গে না নিয়েই গাড়ি থেকে নেমে চলে গিয়েছিলো হোটেলের মধ্যে। বনহুর যখন ভাবছে ঠিক সেই মুহূর্তে তার পাশে গাড়ি এসে থামলো।
ফিরে তাকিয়ে চমকে উঠলো বনহুর-এযে তারই গাড়ি! আরও অবাক হলো গাড়ির ড্রাইভিং সিটে লক্ষ্য করে–শ্যালন বসে আছে! বনহুর গম্ভীর রাগত কণ্ঠে বললো–একি!
দেখো রাগ করোনা লক্ষীটি! তুমি আমাকে নিয়ে না এলেও আমি তোমার সঙ্গে ছায়ার মত রয়েছি।
তা দেখতেই পাচ্ছি। বললো বনহুর।
গাড়িতে উঠে এসো কথা আছে। শ্যালন একটু ব্যস্তভাবেই কথাটা বলে ড্রাইভিং আসন ত্যাগ করে সরে বসলো।
বনহুর বললো–কি করে এলে? আর গিয়েছিলেই বা কোথায়?
শ্যালন পিছন দিকে তাকিয়ে বললো–এসেছি ছামার বক্সে।
নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মরোনি?
না, ফাঁক ছিলো।
এতো ব্যস্ততার মধ্যেও বনহুরের হাসি পেলো। ড্রাইভিং আসনে চেপে বসে বললো–গাড়ি নিয়ে কোথায় উধাও হয়েছিলে?
শ্যালন বাড়ির আশেপাশে সর্তক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখে নিয়ে বললো–জানো, তুমি যখন চলে গেলে তখন একটা লোক তোমার গাড়ির পাশে এসে উঁকিঝুঁকি মেরে কি একটা জিনিস পিছনের আসনের নিচে রেখে গেছে।
বনহুর অবাক হয়ে বললো–দেখোনি কি জিনিস?
না, দেখবো কি করে–লোকটা গাড়িতে জিনিসটা রেখে দ্রুত অন্য একটা গাড়িতে চেপে পালাতে গেলো।
তারপর?
আমি আমাদের গাড়ির ছামার বক্সে বসে উঁকি দিয়ে সব দেখছিলাম। লোকটা যেমন ওর গাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছিলো, অমনি আমি ছামার বক্স থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ি নিয়ে লোকটার গাড়িকে ফলো করলাম। সে গাড়িতে কি রেখে গেলো দেখবো কখন? তাছাড়া লোকটা এমন চোরের মত চুপি চুপি কাজ করলো–তাতে মনে হলো, সে নিশ্চয়ই কোনো ভাল জিনিস রাখেনি…
এ সন্দেহ মনে হওয়ার পরও তুমি জিনিসটা না দেখে গাড়িখানাকে ফলো করলে?
হ।
শেষ পর্যন্ত সফলকাম হয়েছে?
হয়েছি, চলো আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু তার পূর্বে সে কি জিনিস আমার গাড়ির পিছন আসনের তলায় লুকিয়ে রেখেছে দেখতে হয়। বনহুর গাড়ি থেকে নেমে পিছন আসনের দরজা খুলে ফেললো। সীটের তলায় লক্ষ্য করে অস্ফুট ধ্বনি। করে উঠলো–এযে ডিটোনেটার!
