বনহুর ভাবলো এখন তার কি কর্তব্য। এখানে থাকা তার ঠিক হবে না। হঠাৎ বনহুরের নজর পড়লো–টেবিলে ওয়েটচাপা একটা ভাঁজ করা কাগজে। তাড়াতাড়ি ওয়েট সরিয়ে ভাঁজ করা কাগজখানা হাতে তুলে নিয়ে লাইটের সামনে মেলে ধরলো। একটা ছোট্ট চিঠি, এবং চিঠিখানা এথোলকে লেখা হয়েছে। ওতে লিখা আছে পড়লো বনহুর রাতে আমি আসবো। তুমি তোমার ঘরে প্রতিক্ষা করো। বিশেষ কথা আছে তোমার সঙ্গে! –হিতৈষী বন্ধু
বনহুর চিঠিখানা ভাঁজ করে পকেটে রাখলো, ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়িতে শোনা গেলো ভারী বুটের শব্দ। বনহুর বিলম্ব না করে যে পথে সেই হিতৈষী বন্ধু অন্তর্ধান হয়েছিলো, ঐ পথে সেও অদৃশ্য হয়।
পিছন পাইপ বেয়ে অতি অল্প সময়ে বনহুর নেমে আসে নিচে। তারপর নিজের গাড়িখানার পাশে। গিয়ে হাজির হয়। বনহুর যখন গাড়িতে ষ্টার্ট দিলো তখন এথোলের কক্ষের জানালা দিয়ে নিচের দিকে রাইফেলের গুলীর শব্দ শোনা যেতে লাগলো। হয়তো পুলিশ এসে গেছে এবং এথোলের হত্যাকারীর সন্ধানে পর পর গুলী ছুঁড়ে খোঁজ করছে। কিন্তু আশ্চর্য, পুলিশ এতো দ্রুত কি করে এ খুনের সন্ধান পেলো!
বনহুরের গাড়ি তখন সোজা পার্ক সার্কাস অভিমুখে ছুটতে শুরু করেছে।
জন-বিহীন পথ বেয়ে বাড়িখানা কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্ক সার্কাসে মিঃ আলবার্ডের বাড়ির বাড়ি বারান্দায় এসে পৌঁছলো। গাড়ি থেকে নেমে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর, কিন্তু শয্যা গ্রহণ করতে পারলো না। কক্ষমধ্যে পায়চারী করে ফিরতে লাগলো মনে তার নানা চিন্তা উদয় হচ্ছে। যে ব্যক্তি ম্যাকমারাকে হত্যা করেছে, সে-ই হত্যা করেছে মিঃ এথোলকে। কিন্তু এথোলকে হত্যা কেন করা হলো! ম্যাকমারার নিকটে এমন কোনো জিনিস ছিলো, যার লোভে তাকে হত্যা করা হয়েছে! এথোলের কাছে তো সে জিনিস ছিলো না, তবু তাকে হত্যা করা হলো। এখোলের নিহত হবার একমাত্র কারণ, ম্যাকমারা হত্যা-রহস্য তিনি জানতেন। এ হত্যা-রহস্য যাতে উদঘাটন না হতে পারে, সে কারণেই। ম্যাকমারার হত্যাকারী হত্যা করলো মিঃ এথোলকে। আজ দ্বিপ্রহরে যে ব্যক্তি এগোলের সঙ্গে ঘুরে ফিরেছে সেই খুনী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কে সে? বনহুর তাকে দেখেছে বটে কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পায়নি। দ্বিপ্রহরে যে ব্যক্তিকে এগোলের সঙ্গে দেখেছিলো, কিছু পূর্বে তাকেই বনহুর দেখেছে এথোলের কক্ষ হতে পিছন শার্শী দিয়ে পালাতে। লোকটার দেহে দ্বিপ্রহরের সেই ড্রেসটাই পরিহিত রয়েছে। স্যুট-প্যান্ট-টাই এবং মাথায় একটি ক্যাপ, ক্যাপটি দিয়ে তার মুখের প্রায় অর্ধেকটা ঢাকা পড়ে গেছে। বনহুর গভীরভাবে চিন্তা করে কে এই ব্যক্তি এবং কেন সে পর পর হত্যা করে চলেছে। ম্যাকমারার সেই ছোট্ট ময়লা জামাটার মধ্যে কি ছিলো, যা জানতে পেরেছিলো তার হত্যাকারী…
বনহুর নিজে দস্যু, অথচ এভাকে তাকে গোয়েন্দার কাজে নিয়োজিত হতে হবে ভাবতে পারেনি! অবশ্য তাকে এর পূর্বেও কয়েকবার কয়েকটি হত্যা-রহস্য উদঘাটন করতে হয়েছিলো।
হঠাৎ বনহুরের চিন্তা-স্রোতে বাধা পড়ে। টেবিলে ফোনটা বেজে উঠে সশব্দে। বনহুর চট করে রিসিভার হাতে উঠিয়ে নেয় না, ফোনটা অবিরত ক্রিং ক্রিং শব্দ করে চলেছে।
বনহুর পাশের চেয়ারে বসে ধীরে-সুস্থে রিসিভার হাতে উঠিয়ে নিয়ে নিদ্রা-জড়িত কণ্ঠের অনুকরণে বললো–হ্যালো, আমি আলম বলছি…কি বললেন, খুন…কোথায়? মিঃ এথোল খুন হয়েছেন বলেন কি!
বনহুরের ঠোঁটে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
ব্যস্ত হয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো শ্যালন-আলম, কে খুন হয়েছে? কে খুন হয়েছে?
রিসিভারের মুখে হাত চাপা দিয়ে শ্যালনকে লক্ষ্য করে বললো বনহুর–মিঃ এথোল খুন। হয়েছেন…
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো শ্যালন–এথোল কাকা খুন হয়েছেন!
হ! রিসিভার রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায় বনহুর–শুধু এথোল কাকাই নয়, এমনি আরও কতজন যে নিহত হবেন তার সঠিক হিসাব বলা কঠিন।
শ্যালনের মুখ ছাই-এর মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে, বনহুরের পাশে ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে কম্পিত গলায় বলে-কে তাকে খুন করেছে?
কেমন করে বলবো, বলো?
আলম, এই মুহূর্তে কে তোমাকে ফোন করেছিলো? কে তোমাকে জানালো এথোল কাকা খুন হয়েছে?
পুলিশ সুপার মিঃ বিনয় সেন। গম্ভীর গলায় বললো বনহুর। এবার সে বাইরে বের হবার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ালো শ্যালন, আমি যাচ্ছি।
কোথায় যাবে?
পরে বলবো।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে দ্রুত বেরিয়ে গেলো। কিন্তু গাড়িতে উঠতে যাবে, পিছনে শ্যালন এসে দাঁড়ালো। অবাক কণ্ঠে বললো বনহুর শ্যালন, তুমি কেন এলে?
আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।
অসম্ভব।
আমি যাবো।
দেখো, ছেলেমির একটা সীমা আছে।
বেশ, আমাকে না নিলে। যাও, কিন্তু তোমার আসল জিনিস কই?
পকেটে হাত দিয়ে মনে পড়লো রিভলভারের কথা। শ্যালন বললো– যাও, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?
বনহুর দ্রুত চলে গেলো রিভলভারখানা আনতে।
শ্যালন ঠিক সেই মুহূর্তে গাড়ির পিছনে খোলসের মধ্যে প্রবেশ করে চুপটি মেরে বসে রইলো।
বনহুর মনে করলো শ্যালন ফিরে গেছে তার কক্ষে। তবু গাড়ির ভিতরটা একবার ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখে নিলো।
গাড়িতে ষ্টার্ট দিয়েই হাতঘড়িটা দেখে নিলো বনহুর। ভোর ছয়টা বাজতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকী!
বনহুরের গাড়ি ছুটে চলেছে।
