বনহুর গম্ভীর মুখে সিগারেট ধরালো, তারপর সিগারেট কেসটা এথোলের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো–গ্রহণ করুন।
মিঃ এথোল সিগারেট-কেস থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে বললেন…আলম, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে। চলো নির্জনে যাই।
বনহুর এ রকম কোনো উক্তির অপেক্ষা করছিলো, বললো–চলুন। উঠে দাঁড়ালো বনহুর, শ্যালনের দিকে তাকিয়ে তাকে বারণ করলো তার সঙ্গে যেতে।
আর্থার বুঝতে পেরে সে যেমন বসে ছিলো তেমনি রইলো।
মিঃ এথোল আর বনহুর চলে গেলো বনহুরের শয়নকক্ষে। পাশা-পাশি দুটো সোফা অধিকার করে নিয়ে বসলো তারা। কক্ষ নির্জন। দরজা জানালায় মোটা ভেলভেটের নীল পর্দা ঝুলছে।
কক্ষমধ্যে বিরাজ করছে একটা স্নিগ্ধ-শীতল মিষ্টি পরিবেশ। একপাশে মূল্যবান একটি আধুনিক খাট, সে খাটে বনহুর শয়ন করে। পাশেই সেল্ফ, কয়েকখানা বই রয়েছে সেলফে। তাছাড়া মেঝেতে কয়েকটা সুন্দর আধুনিক সোফা, সোফার মাঝখানে একটি ছোট্ট টেবিল।
টেবিলে পা তুলে বসলেন মিঃ এথোল, তারপর একমুখ ধুয়া উপরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন তিনি–আলম, অযথা আমার পিছনে ঘোরার কি মানে হলো বলো? এই দুপুরে কাঠফাটা রোদটা শুধু কষ্ট করে কাটালে।
মিঃ এথোলের কথায় বনহুর অবাক হলো, তাহলে কি এথোল তাকে…
বনহুরকে ভাববার সময় না দিয়ে বললেন এথোল–আমি তোমার হাত এড়াবার জন্যই ভিক্টোরিয়া হলে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছিলাম!
বনহুরের মুখমণ্ডল মুহূর্তের জন্য বিবর্ণ হলো, পরক্ষণেই বললো সে–আপনার সঙ্গীটি কে ছিলেন। তা জানবার জন্যই আমি আপনার গাড়িখানা ফলো করেছিলাম।
ওঃ এই কথা, তা তুমি পরে এক সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করলেও পারতে? আমার একজন বিশিষ্ট বন্ধু আমার সঙ্গে ছিলো।
দেখুন, আপনি লুকোবার চেষ্টা করলেও আপনি আমার কাছে নিজের কার্যকলাপ গোপন রাখতে পারবেন না। মিঃ এথোল, আপনি যতই সচ্ছ হওয়ার চেষ্টা করুন না কেনো–কিন্তু আমি জানি আপনার সব কথা।
মুহূর্তে মিঃ এথোলের মুখ ফ্যাকাশে হলো। নিজেকে পোপন করার জন্য মুখটা অন্যদিকে ফেরালেন একবার।
বনহুর তীব্রকণ্ঠে বললো–আপনার সঙ্গীটি কে আপনি না বললেও আমি তাকে ঠিক চিনতে পেরেছি।
সত্যি বলছো আলম? এবার মিঃ এথোল খুশিতে যেন উচ্ছল হয়ে উঠলো।
বনহুর বিস্মিত হলো, অদ্ভুত মানুষ এই এথোল।
*
ঐদিন রাতের কথা।
বনহুর শয্যায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। রাত তখন ঠিক চারটে বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। হঠাৎ টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো সশব্দে। বনহুর আশ্চর্য হলো, এতো রাতে কোথা হতে ফোন এলো–বিশেষ করে রাত চারটায়।
রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে কানে ধরতেই ওদিক থেকে শোনা গেলো মিঃ এথোলের উত্তেজিত ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর–হ্যালো, হ্যালো–আলম…তুমি শীঘ্র…চলে…থেমে গেলো কণ্ঠ।
বনহুর বলে উঠলো–হ্যালো, আমি আলম বলছি…বলুন…হ্যালো বলুন…
ওদিক থেকে শোনা গেলো এথোলের আর্তকণ্ঠ–উঃ, আঃ…হ্যা…লো..বি…রিসিভার পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।
বনহুর বার বার রিং করতে লাগলো–হ্যালো, হ্যালো…কিন্তু আর কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না ওদিক থেকে। বনহুর এবার রিসিভার রেখে, দ্রুত হস্তে নাইট ড্রেস পাল্টে নিলো, তারপর ড্রয়ার খুলে বের করে নিলো রিভলভারখানা। হাত-ঘড়িটা এক নজর দেখে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো।
বনহুরের হাতে গাড়িটা উল্কা ছুটে চলেছে। পথ প্রায় জনশূন্য। গাড়ি চালাতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তার। গাড়িখানা যে মিঃ এথোলের বাড়ি-মুখো চলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিছু সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলো গাড়িখানা।
বনহুরের বাড়ি মিঃ এথোলের বাড়ির সম্মুখ গেটে না লাগিয়ে পিছন বাড়িটার পাশে রেখে নেমে পড়লো সে। অতি দ্রুত পিছন বাড়ির প্রাচীর টপকে প্রবেশ করলো ভিতর বাড়িতে, তারপর কৌশলে পার হয়ে গেলো বনহুর এথোলের বাড়ির পিছন দিক দিয়ে বাগানের মধ্যে। বনহুর এবার এথোলের শোবার কক্ষের পিছন পাইপ বেয়ে দ্রুত উঠতে লাগলো উপরের দিকে। মাত্র কয়েক মিনিট, বনহুর একেবারে উঠে এলো উপর তলার পিছন রেলিং এর পাশে। এ সব তার অভ্যাস আছে, কোনো কষ্ট হলো না। রেলিং বেয়ে সোজা বনহুর চলে এলো দ্বিতলের সম্মুখ দরজায়। যেমন কক্ষে প্রবেশ করেছে, ঐ মুহূর্তে একটি লোক সাঁ করে চলে গেলো পিছনের শার্শী দিয়ে ওদিকে।
এক নজর দেখলেও বনহুর চিনতে পারলো, এ সেই লোক–যে আজ দ্বিপ্রহরে এখোলের গাড়িতে তার সঙ্গে ভ্রমণ করে ফিরেছে। বনহুর বিলম্ব না করে ঝুঁকে পড়লো শার্শী দিয়ে নিচের দিকে। কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখা গেলো না, পরক্ষণেই মোটর স্কার্টের শব্দ শোনা গেলো। বনহুর গাড়িখানাকে ফলো করবে, না এথোলের খোঁজ নেবে ভেবে নিলো। কিন্তু তার পূর্বেই দৃষ্টি চলে গেলো টেবিলের পাশে। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালো, পরক্ষণেই ছুটে এলো চেয়ারে কাৎ হয়ে পড়ে রয়েছেন মিঃ এথোল। বাম পাশের বুকে একখানা ছোরা সমুলে বিধে আছে। তাজা টকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ছোরার পাশ দিয়ে। দক্ষিণ হাতখানা ঝুলছে, রিসিভারখানাও তার হাতের পাশে পড়ে রয়েছে। বনহুর বুঝতে পারলো–মিঃ এথোল মৃত্যুর পূর্বে তাকেই ফোন করেছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। হত্যাকারী তার সব শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু কে এই হত্যাকারী, যে শুধু ম্যাকমারাকেই হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি–মিঃ এথেলকেও হত্যা করলো।
