বনহুর বাথরুমে প্রবেশ করলে শ্যালন ওর জন্য নিজ হস্তে নানা রকম নাস্তা তৈরি করে এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখতো, যতক্ষণ বনহুর বাথরুম থেকে ফিরে না আসে ততক্ষণ সে টেবিলের পাশে। বসে সোয়েটার বুনতো বা বই পড়তো।
বনহুর বাথরুম থেকে ফিরে এলে তাকে চা-নাস্তা পরিবেশন করে নিজেও খেতো। ওর সঙ্গে যতক্ষণ বনহুর কক্ষে থাকতো ততক্ষণ শ্যালন নানা গল্প-সল্প আর নানা আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে উঠতো।
মাঝে মাঝে আলবার্ডের পুত্র আর্থার এসে যোগ দিতে বনহুর আর শ্যালনের সঙ্গে। আর্থার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বনহুর আর শ্যালনের সঙ্গে গভীরভাবে ভাব জমিয়ে নিয়েছিলো।
আর্থার বলেছিলো বনহুর আর শ্যালনকে আমাদের বাড়ি মনে করবে তোমাদের বাড়ি। এখানে তোমাদের মত হাজার জন থাকলেও আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তা ছাড়া মিঃ আলম, আপনি আমার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণিত করার জন্য এতো চেষ্টা করছেন। আমার বাবা যে ম্যাকমারা কাকার হত্যাকারী নন এটা আমি জানি। অযথা আমার বাবাকে ম্যাকমারা কাকার হত্যাকারী বলে সন্দেহ করা হয়েছে। মিঃ আলম, আমার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণিত করার জন্য এবং কাকার আসল হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন হয় আমি দেবো। আপনি ইচ্ছামত আমার বাড়ির যাবতীয় জিনিস ব্যবহার করতে পারেন। আপনাকে আমি দুটো শব্দবিহীন কার দিলাম, আপনি এগাড়ি দু’খানা ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারেন।
বলেছিলো বনহুর অশেষ ধন্যবাদ।
বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী আর্থার ঠিক পিতার মতই সদা হাস্যময় এবং আলাপী মানুষ। তেমনি সরল স্বাভাবিক স্বচ্ছপ্রাণ ছেলে। বনহুরের বড় ভাল লাগে আর্থারকে;
আর্থার শুধু বিশাল ঐশ্বর্যের উত্তরাধিকারীই নয় তার চেহারা সুন্দর সুদর্শন, শিক্ষিত যুবক। বনহুর মনে মনে একটা আশা পোষণ করতো। আর্থার আর শ্যালনকে সে মনের আসনে একত্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলো। শ্যালনের স্বজাতি এবং আত্মীয় আর্থার, তাছাড়া শ্যালনকে সে কামনা যে না করে তা নয়। কিন্তু আর্থার লাজুক ধরনের ছেলে, শ্যালনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশবার মত তার সাহসই হতো না।
বনহুর অবশ্য শ্যালনকে আর্থারের সাথে মিশবার সুযোগ দিয়ে অনেক সময় সরে থাকতো। একদিন প্রকাশ্য বলেছিলো বনহুর– আচ্ছা শ্যালন, আর্থারকে তোমার কেমন লাগে?
শ্যালন বনহুরের নাকটা আংগুল দিয়ে টেনে দিয়ে বলেছিলো– হঠাৎ এ প্রশ্ন কেনো আলম?
বলেছিলো বনহুর– আর্থারের সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ হলে কেমন হয় বলো তো?
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলো শ্যালন– অসম্ভব। আমি ওকে গ্রাহ্যই করিনি। কথাটা বলে চলে গিয়েছিলো শ্যালন সেখান থেকে।
বনহুর এরপর আর কোনো কথা বলা অবকাশ পায়নি।
বনহুর আজ যখন পার্ক সার্কাস বাসায় ফিরে এলো তখন পাঁচটা বেজে গেছে।
শ্যালন ঘর-বার করছিলো। মাঝে মাঝে দোতলায় বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে তাকাচ্ছিলো জনমুখর। রাজপথের দিকে। কত গাড়িই না এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে, কিন্তু তার আকাঙ্খিত গাড়িখানা কই। হঠাৎ শ্যালনের দৃষ্টি চলে যায়, অগণিত গাড়ির ভীড়ের ভিতর হতে বেরিয়ে আসে তার পরিচিত গাড়িখানা। যে গাড়ির জন্য সে ব্যাকুল হয়ে প্রতীক্ষা করছে।
বনহুরের গাড়ি এসে পৌঁছতেই শ্যালন ছুটে এসে দাঁড়ালো গাড়িখানার পাশে।
বনহুর নেমে দাঁড়াতেই ওর কণ্ঠ বেষ্ঠন করে অভিযোগের সুরে বললো শ্যালন– এতো বিলম্ব করলে কেন, বলো তো?
আর্থারও তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিলো।
বনহুর শ্যালনের এই স্বচ্ছ আচরণে একটু সঙ্কোচিত হলো। হেসে বললো– ভিতরে চলো সব বলছি।
বনহুর অগ্রসর হলো। আর্থারকে লক্ষ্য করে বললো– আসুন, কথা আছে।
আর্থার আর শ্যালন বনহুরকে অনুসরণ করলো।
খাবার টেবিলে এসে বসলো ওরা তিন জন।
শ্যালন খাবার পরিবেশন করছিলো।
আর্থার বললো– আমি খেয়েছি। কিন্তু শ্যালন এখনও অভুক্ত রয়েছে।
বনহুর নিজের খাবার মুখে দিতে গিয়ে হাতখানা আবার নামিয়ে নিলো, বিস্ময় ভরা দৃষ্টি তুলে ধরলো শ্যালনের মুখে, তারপর গম্ভীর গলায় বললো– এ কেমন কথা শ্যালন?
শ্যালন হেসে খাবার নিজের মুখে তুলে দিতে দিতে বললো– তুমিও তো অভুক্ত ছিলে—
তাই এভাবে নিজেকে কষ্ট দেবে শ্যালন?
আর্থার বললো– মিঃ আলম, সত্যি ওর কথা আপনি ভাবতে পারবেন না। আপনি চলে যাবার পর সে ঘরে খিল এটে বসে থাকবে, একদম বাইরে বের হবে না, বা কারো সঙ্গে কথা বলবে না।
কত করে অনুরোধ করলাম দরজা খুলে চারটি মুখে দিতে, কিন্তু কিছুতেই সে খাবে না…
এ তোমার ভারী অন্যায় শ্যালন। বনহুর কঠিন গলায় বললো।
তুমি অমন ভাবে না খেয়ে চলে যাবে আর আমি বাড়ি বসে খাবো, না?
তাহলে কাল থেকে আমি রোজ না খেয়ে যাবো আর তুমিও উপোস করে মরো। থাক, আমি এখনও খাবো না। দেখি কতক্ষণ তুমি অভুক্ত থাকতে পারো।
আর্থার বললো–কাজ কি হবে আর এতোক্ষণে মান অভিমান করে। খান আপনি–শ্যালন, তুমিও খাও।
বনহুর খেতে লাগলো বটে কিন্তু শ্যালনের সঙ্গে কোনো কথাবার্তা বললো না!
বনহুর যেমন খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াতে যাবে ঠিক সেই সময় কক্ষে প্রবেশ করলো এথোল। বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–আলম, তুমি নাকি আমার বাসায় গিয়েছিলে আমার সন্ধানে?
হাঁ। বললো বনহুর।
আর্থার এবং শ্যালনও উঠে দাঁড়িয়েছিলো।
বনহুর মিঃ এথোলকে আসন গ্রহণ করতে বলে নিজেও আসন গ্রহণ করলো।
