বনহুর এবং মিঃ রাজেন্দ্রনাথ আসন গ্রহণ করার পর বললো বনহুর– ইন্সপেক্টার সাহেব, ম্যাকমারা হত্যা ব্যাপারে আপনারা কত দূর অগ্রসর হয়েছেন জানার জন্য এসেছি।
ভাল কথা, বসুন আমি আপনাকে দেখাচ্ছি। এ পর্যন্ত আমরা ডায়রীতে যা জানতে পেরেছি, সমস্ত আপনাকে দেখাবো। আপনি ম্যাকমারার প্রধান সঙ্গী–মানে ভাবী জামাতা, কাজেই ম্যাকমারা হত্যা রহস্য উদঘাটনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত প্রয়োজন।
কথাগুলো বলে ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ ওসি মিঃ জয়দেব ভৌমিককে ম্যাকমারা হত্যা রহস্যের পুলিশ রিপোর্টে যতটুকু সংগ্রহ করা হয়েছে দেখাতে বললেন। আরও বললেন–ইনি ম্যাকমারার ভাবী জামাতা, এর কাছে কিছু গোপন করার নেই।
বনহুর লালবাজার পুলিশ অফিস থেকে যখন বের হলো তখন বেলা ঠিক দ্বিপ্রহর। সোজা গাড়ি নিয়ে সে মিঃ এখোলের বাড়িমুখো রওয়ানা দিল। ইচ্ছা করেই বনহুর বৌবাজার রোড না হয়ে বেন্টিক স্ত্রীট হয়ে ধর্মতলা দিয়ে বৌবাজার আসতে মনস্থির করে নিলো। প্রায় ঘন্টাখানেক আঁকাবাঁকাভাবে গাড়ি চালিয়ে বৌবাজার রাস্তায় আসতেই বনহুরের গাড়ির পাশ কেটে চলে গেলো ঠিক মিঃ এখোলের গাড়ির মত একটি কুইন কার। বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক পলকে দেখে নিয়ে ছিলো গাড়ির মধ্যে শুধু এথোলই নন, দ্বিতীয় কোনো একজন ছিলো বা আছে তার পাশে। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তিকে তো বনহুর চিনতে পারেনি!
বনহুর নিজের গাড়িখানা এথোলের বাড়িমুখো আর না নিয়ে সামনের রাস্তার বাঁকে ব্যাক করে এথোলের গাড়িকে ফলে করলো।
সম্মুখের গাড়িখানা তখন দ্রুত এগুচ্ছে। বনহুর কিন্তু সোজা এগোলের গাড়িখানাকে ফলো করলো না, সে একটু এদিক-ওদিক করে গাড়ি চালাতে লাগলো!
সম্মুখের গাড়িখানা তখন দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
বনহুর এথোলের গাড়িখানাকে লক্ষ্য করে এ গাড়ি সে গাড়ির পাশ কেটে নিজের গাড়ি চালাতে লাগলো।
এপথ-সেপথ দিয়ে গাড়িখানা এবার হ্যারিসন রোড ধরে ছুটছে। বনহুর ঠিকভাবে ফলো করে আসছে সামনের গাড়িখানাকে। কিন্তু বেশ দূরত্ব রেখে গাড়ি চালাচ্ছিলো বনহুর। কলিকাতা শহর যানবাহনের ভীড়ের চাপে অতি সাবধানে তাকে গাড়ি চালাতে হচ্ছিলো।
বেশ কিছুক্ষণ গাড়ি একভাবে চালানোর পর হঠাৎ সামনের গাড়িখানা ষ্ট্ৰাণ্ড রোড ধরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের সম্মুখে এসে থেমে পড়লো।
বনহুরও প্রথম গাড়িখানা হতে বেশ কিছু দূরত্ব রেখে কতগুলো গাড়ির পাশে নিজের গাড়িখানা ব্রেক করে থামিয়ে ফেললো। গাড়িতে বসেই লক্ষ্য করলো– মিঃ এথোল এবং আর এক ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে ভিক্টোরিয়া হলের সিঁড়ি বেয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত অগ্রসর হলো ভিক্টোরিয়া হলের দিকে। সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই বনহুর দেখতে পেলো– লিফটে উঠে দাঁড়িয়েছেন এথোল এবং সঙ্গের লোকটি।
বনহুর এগোলের সঙ্গীকে ঠিক চিনতে পারলো না, কারণ তার চোখে কালো চশমা, মুখে ফ্রেঞ্চকাটা দাড়ি। মাথায় ক্যাপ আছে। ক্যাপটা বেশ কিছুটা কাৎ হয়ে আছে সামনের দিকে! ভদ্রলোকের ঠোঁটের ফাঁকে বিলেতী পাইপ!
চকিতে একনজর দেখে নিতেই লিস্টখানা অদৃশ্য হলো।
বনহুর দু’নম্বর লিফটে চেপে দাঁড়ালো।
কিন্তু আশ্চর্য দ্বিতলে কোথাও দেখতে পেলোনা বনহুর মিঃ এথোল আর তার সঙ্গী ভদ্রলোককে। পুনরায় লিফটে তিন তালায় গমন করলো। দর্শকগণের ভীড়ে সকলের অলক্ষ্যে বনহুর খুঁজে চললো তার শিকারদ্বয়কে।
বিরাট হলের ভিতরে নানা রকম শিল্পসৃষ্টির মধ্যে মিঃ এথোল আর তার সঙ্গী কোথায় যে তলিয়ে গেছে খুঁজে পেলো না বনহুর।
প্রায় ঘণ্টা দুই বনহুর সমস্ত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চষে ফিরলো কিন্তু তাদের সন্ধান পেলো না। এবার সে আর বিলম্ব না করে ফিরে এলো নিজের গাড়িখানার পাশে। তাকিয়ে দেখলো এথোলের গাড়িখানা অদৃশ্য হয়েছে। বুঝতে পারলো, তাকে এড়ানোর জন্যই এই প্রচেষ্টা। নিশ্চয়ই এথোল এবং তার সঙ্গী বুঝতে পেরেছিলেন তারা সে কারণেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের সম্মুখে এসে তারা গাড়ি রেখে ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন। তার চোখে ধুলো দেয়া হলো ওদের মূল উদ্দেশ্য।
বনহুর গাড়িতে স্টার্ট দেবার পূর্বে তার রিভলভারখানার অস্তিত্ব একবার অনুভব করে নিলো। গাড়িখানা আবার ছুটতে আরম্ভ করলো।
এবার বনহুরের গাড়ি এথোলের বাড়ি অভিমুখে চলেছে। কিন্তু বনহুর এখোলের বাড়িতে এসে দেখলো- আজ দরজায় তালা বন্ধ নেই। দরজা মুক্ত। বনহুর ভিতরে প্রবেশ করে সন্ধান নিয়ে জানতে পারলো, এথোল এখনও ফেরেন নি। আর একটা ব্যাপার আজ লক্ষ্য করলো সে বাড়িতে একটি বৃদ্ধ চাকর ঘর-দোর পরিস্কার করছে। তার কাছেই বনহুর জানতে পারলো, মিঃ এথোল এখনও আসেন নি।
আজকের মত বনহুর বাসায় ফিরে যাওয়াই সাব্যস্ত করে নিলো। গাড়িতে চেপে বসলো যখন তখন বেলা চারটা বাজতে পঁচিশ মিনিট বাকি। ক্ষুধায় পেটের মধ্যে জ্বালা করছে। সেই সাত সকালে আজ বেরিয়েছিলো বনহুর। শ্যালন অবশ্য তার জন্য নাস্তা তৈরি করে নিয়ে এসেছিলো, এতো চাকর বাকর থাকা সত্ত্বেও শ্যালনের এতো অনুরাগ ভালই লাগে ওর। বেচারী শ্যালন! এ দুনিয়ায় ওর আপন জন বলতে কেউ নেই– একমাত্র পিতা ম্যাকমারাই ছিলেন শ্যালনের সম্বল। মেয়েটা পিতাকে হারিয়ে কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে। কাউকে সে আর বিশ্বাস করতে চায় না। যতক্ষণ বনহুর বাসায় থাকে। ততক্ষণ শ্যালন ওর পাশেই থাকে ছায়ার মত। বনহুর হয়তো ভোরে ঘুম থেকেই উঠেনি শ্যালন এসে বসে থাকবে তার শিয়রে। হয়তো একটা বই নিয়ে পড়বে, নয় কাটা দিয়ে সোয়েটার বুনবে। বনহুরের জন্য সে একটা সুন্দর প্যাটানের সোয়েটার তৈরি করেছে। বনহুর জেগে উঠলে শ্যালন উঠে পড়তো, হেসে এগিয়ে গিয়ে বনহুরের কণ্ঠ বেষ্টন করে তার গণ্ডে একে দিতো চুম্বন রেখা। এতে সে কোনো রকম সংকোচ বা দ্বিধা বোধ করতো না বনহুরও ওকে বাধা দিতো না এ ব্যাপারে, যদিও সে নিজে কিছুটা সঙ্কোচিত হতো।
