গাড়ি ছুটতে শুরু করলো, ইতিমধ্যে বনহুর আয়নাটাক আরও নিচু করে নিয়েছে। বনহুর সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, কে একজন নিশ্চুপ বসে আছে গুটিসুটি মেরে।
বনহুর পকেটে হাত দিয়ে রিভলভারের অস্তিত্ব অনুভব করে নিলো। তার রিভলভারে দু’টি গুলী মজুত রয়েছে। কে এ লোক– কি এর অভিসন্ধি? বনহুর পার্ক সার্কাস রোডের দিকে না গিয়ে সোজা গাড়ির মোড় ঘুরিয়ে নিলো ধর্মতলা রোডের দিকে। তারপর মেছো বাজার বড় বাজার হয়ে এলোপাথাড়ি হয়ে এগিয়ে চললো গঙ্গার দিকে।
গঙ্গার ধারে এসে গাড়ি রাখলো বনহুর, তারপর পকেট থেকে রিভলভার বের করে পিছন আসনে উদ্যত করে ধরলো–বেরিয়ে এসো!
ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো লোকটা।
বনহুর বামহস্তে পকেট থেকে টর্চ বের করে মুখে ফেললো, সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো– শ্যালন, তুমি!
হাঁ, আমাকে মাফ করো।
বনহুর টর্চের আলো ফেলে শ্যালনের পা থেকে মাথা অবধি লক্ষ্য করলো। সম্পূর্ণ একটি পুরুষের ড্রেস। বনহুর শ্যালনকে চিনতে বিলম্ব করেনি, অন্য কেউ হলে এতো সহজে তাকে নারী বলে চিনতে পারতো না।
বনহুর রিভলভার প্যান্টের পকেটে রেখে গম্ভীর গলায় বললো– শ্যালন, তুমি এ গাড়ির মধ্যে কি করতে এসেছো?
শ্যালন ভড়কে গিয়েছিলো, বনহুরের গম্ভীর কণ্ঠস্বরে ঢোক গিলে বললো– তুমি একা চলে এলে তাই আমি–
কখন তুমি গাড়িতে উঠেছিলে?
যখন তুমি গাড়িতে চেপে, আবার কি যেন মনে করে ভিতরে গিয়েছিলে—
হাঁ, আমি টর্চ আনতে আমার ঘরে গিয়েছিলাম।
আমি ঠিক তখন গাড়ির পিছনে চেপে বসেছি।
একাজ করে তুমি ভাল করোনি শ্যালন।
তুমি একা চলে এলে, আর আমি একা–
শ্যালন তোমার বাবার মৃত্যু হয়েছে; এখন তোমাকে সাবধানে চলাফেরা করতে হবে, তোমার যে শত্রু নেই তা নয়।
সেজন্যই তো আমি একা ও বাড়িতে থাকতে পারলাম না।
শ্যালন, আমাকে এখন সব সময় এখানে-সেখানে ছুটোছুটি করে বেড়াতে হচ্ছে। তোমার পিতার হত্যাকারীকে যেমন করে হোক খুঁজে বের করবোই করবো। বনহুর দাঁতে দাঁত পিষে বললো।
শ্যালন বলে কিন্তু আমি ও বাড়িতে একা থাকতে পারবো না।
তাহলে আমি কি সব সময় তোমাকে পাহারা দিয়ে রাখবো?
শ্যালন কোনো কথা বলে না।
বনহুর আবার বললো তোমার পিতার হত্যাকারীর সন্ধানে আমাকে সমস্ত কলিকাতা শহর চষে ফিরতে হবে।
আমিও তোমার সঙ্গে থাকবো।
শ্যালনের কথায় বনহুরের হাসি পেলো, রাগও হলো, বললো সে– তুমি আমার সঙ্গে থাকলে আমি কাজ করতে পারবো?
কেন পারবে না, আমি তোমাকে সহায়তা করবো।
তা হয় না শ্যালন, এটা তোমার বাবার মত জীবজন্তুর ফটো তোলার ব্যাপার নয়। তোমাকে বাড়িতে থাকতেই হবে।
না, আমি পারবো না।
কি মুস্কিল হলো তোমাকে নিয়ে।
তাহলে বাবা নেই– আমার বেঁচে কি হবে।
কি করতে চাও?
গঙ্গায় ডুব মারবো।
বেশ, তাই করো।
শ্যালন আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে গঙ্গার দিকে ছুটলো।
বনহুর বলিষ্ঠ হাতের মুঠায় খপ করে ধরে ফেললো শ্যালনের সরু কোমল হাতখানা।
শ্যালন এবার দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললো।
বনহুর শান্ত কণ্ঠে বললো– এতো ছেলেমানুষ তুমি। শ্যালন, বেশ কথা দিলাম, তোমাকে আগলে নিয়েই ঘরে বসে থাকবো। তোমার বাবার হত্যাকারীর সন্ধান না-ই-বা হলো, কেমন?
শ্যালন কোনো কথা বললো না।
বনহুর বললো– চলো, উঠো এবার গাড়িতে।
বনহুর নিজের আসনের পাশে শ্যালনকে বসিয়ে নিলো।
গাড়ি এবার গঙ্গার তীর বেয়ে হাওড়া ব্রীজের দিকে এগুতে লাগলো।
শ্যালন বললো– কোথায় যাচ্ছো?
হাওড়া ব্রীজের উপরে যাবো।
সেখানে কেন?
তুমি দেখোনি– তাই!
ব্রীজের উপর এসে গাড়ি রেখে নেমে দাঁড়ালো বনহুর, শ্যালনকে লক্ষ্য করে বললো–এসো।
ব্রীজের একপাশে এসে দাঁড়ালো বনহুর আর শ্যালন। রাত তখন শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। জনশূন্য হাওড়া ব্রীজ। মাঝে মাঝে দু’একটা প্রাইভেট, কার এদিক থেকে ওদিকে দ্রুত চলে যাচ্ছে। হয়তো বিশেষ কোনো প্রয়োজনেই গাড়িগুলো গ্যারেজ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।
গঙ্গার বুক সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। যদিও কোনো স্টিমার বা জাহাজ তখন চলাচল করছিলো না, কিন্তু গঙ্গার ভাসমান ল্যাম্পগুলো আলো বিতরণ করছিলো। তা ছাড়া গঙ্গাতীরে থেমে থাকা নৌকাগুলো থেকে। লণ্ঠনের বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মি গঙ্গার জলে এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে।
বনহুর বললো–শ্যালন, কলিকাতা শহরে এই আমার প্রথম পদক্ষেপ। জানতাম না এখানে এসে আমাকে এভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে। তোমার বাবার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে না পারলে আমার স্বস্তি নেই।
জানি আমার বাবার হত্যাকারী আমারও শত্রু, তাইতো আমার এতো ভয়।
শ্যালন, তুমি যদি এমনভাবে আমাকে সব সময় আঁকড়ে ধরে রাখতে চাও তাহলে আমার পক্ষে কিছুই সম্ভব নয়। বনহুর গঙ্গার জলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে স্থির হয়ে দাঁড়ালো।
শ্যালন বুঝতে পেরেছে, বনহুর অভিমান করেছে তাই সে বনহুরের হাতখানা চেপে ধরে বললো আর আমি তোমাকে ধরে রাখবো না, কথা বলো? কথা বলো আলম?
শ্যালন! ফিরে তাকায় বনহুর শ্যালনের মুখের দিকে।
শ্যালনের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
বনহুর পকেট থেকে রুমাল বের করে শ্যালনের চোখের পানি মুছিয়ে দিলো।
শ্যালন বনহুরের বুকে মাথা রেখে ডাকলো– আলম!
বনহুর বললো– চলো শ্যালন, ভোর হয়ে এসেছে।
*
কয়েক দিন পরের কথা।
বনহুরের গাড়ি এসে থামলো লালবাজার পুলিশ অফিসের সামনে। বনহুর নেমে সোজা পুলিশ অফিসে প্রবেশ করতেই ইন্সপেক্টার মিঃ রাজেন্দ্রনাথ উঠে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন।
