ধন্যবাদ! তোমার বুদ্ধিমত্তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। হাঁ, তোমার সহায়তা পেলে আমি ম্যাকমারার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবো।
বনহুর ভ্রূকুঞ্চিত করে তাকালো মিঃ এথোলের মুখে।
মিঃ এথোল আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর কিছুক্ষণ পায়চারী করে কি যেন ভাবলেন।
বনহুর সিগারেটের ধূম্ররাশির ফাঁকে সব লক্ষ্য করছিলো। এখোলের কথাবার্তা এবং আচরণ তাকে আরও ভাবিয়ে তুলেছিলো।
মিঃ এথোল হঠাৎ পায়চারী বন্ধ করে বললেন– তুমি আমার বন্ধুবর ম্যাকমারার ভাবী জামাতা, কাজেই তোমার কাছে না বলার বা লুকোবার কিছু নেই।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেললো বনহুর এগোলের মুখে।
মিঃ এথোল বলতে শুরু করলেন সেদিন রাতে আলবার্ডের বাড়ি থেকে আমন্ত্রণ খেয়ে আমরা যখন বিদায় নিচ্ছিলাম তখন আমাকে আড়ালে ডেকে বলেছিলো ম্যাকমারা– এথোল, তুমি আমার পরম আত্মীয়– তোমাকে আমার মনের কথা বলবো। আমি বলেছিলাম, বলো? ম্যাকমারার মুখ তখন বেশ করুণ এবং ভয়ার্ত দেখাচ্ছিলো। আমার কথায় সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলেছিলো– এথোল, বাংলাদেশে এলাম কিন্তু বাংলার মাটি আমাকে সহ্য করতে পারছেনা। আমি বুঝতে পারছি মৃত্যু আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আজ রাতটা যদি আমি জীবিত থাকতে পারি তাহলে হয়তো আমি বাঁচলেও বাঁচতে পারি। আমি হেসে বলেছিলাম– বাজে কথা ভেবে মন খারাপ করছো। কি এমন কাজ করেছে যার জন্য তোমার মৃত্যু ঘটতে পারে! সে কথার কোনো জবাব দেয়নি ম্যাকমারা, তার চোখে-মুখে একটা আশঙ্কাপূর্ণ ভাব ফুটে উঠতে দেখেছিলাম তখন।
বনহুর সোজা হয়ে বসলো তার আসনে– তারপর?
আমি বলেছিলাম তোমার যদি এতো ভয় তবে আমার ওখানে চলো। কিন্তু ম্যাকমারা আমার কথার কোনো জবাব দিলোনা। হাঁ, তারপর আমরা চলে এসেছিলাম।
কিন্তু আবার ঠিক সময় আপনি হাজির হয়েছিলেন।
শুধু আমি নই, পুলিশ কমিশনার স্বয়ং আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন, আরও ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টার এবং কয়েকজন পুলিশ।
আপনি কি করে অনুমান করলেন আপনার বন্ধুবর ম্যাকমারা সত্যিই নিহত হবেন বা হয়েছেন?
আলবার্ডের বাড়ি থেকে বাসায় ফিরে আমি কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিলাম না। যতই ভাবছিলাম ম্যাকমারার কথাগুলো, ততই যেন কেমন অস্থির হয়ে পড়ছিলাম; কিছুতেই ঘুমাতে পারছিলাম না। রাত তখন তিনটে কিংবা সাড়ে তিনটে– আমি বাথরুমে প্রবেশ করলাম। বাথরুম থেকে হঠাৎ শুনতে পেলাম আমার টেবিলে ফোনটা ক্রিং ক্রিং শব্দ করে বেজে উঠলো। বাথরুম থেকে বেরিয়ে যখন ফোন ধরলাম তখন আমার হাতঘড়িতে চারটে বাজতে দশ মিনিট বাকী। রিসিভার হাতে তুলে নিতেই শুনতে পেলাম বন্ধু ম্যাকমারার ব্যাকুল ভয়ার্ত কণ্ঠ– হ্যালো, হ্যালো এথোল– এথোল– আমিও জবাব দিলাম –হ্যলো স্পিকিং এথোল– কিন্তু কি হলো– আর কোনো শব্দ শুনতে পেলামনা। বার বার ম্যাকমারার নাম ধরে ডাকলাম কিন্তু কোনো সাড়া নেই, ভালভাবে শোনার চেষ্টা করলাম রিসিভার কানে লাগিয়ে –মনে হলো একটা ধস্তাধ্বস্তির ক্ষীণ শব্দ ফোনের মধ্যে ভেসে আসছে। পরক্ষণেই আর একটি শব্দ শুনলাম– নারীকণ্ঠের আর্তনাদের ক্ষীণ শব্দ–
বনহুর অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শুনছিলো মিঃ এখোলের কথাগুলো। এবার বললো বনহুর– হাঁ, আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে ম্যাকমারার কক্ষে টেবিলে রিসিভারখানা এক ধারে ঝুলছিল এবং আপনি তা সকলের অলক্ষ্যে স্বস্থানে তুলে রেখেছিলেন।
আমি–হাঁ হাঁ রেখেছিলাম– কি জানি কেন যে আমি ও কাজ করতে গিয়েছিলাম। একটু থতমত খেয়ে গেলেন এথোল।
বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে পকেট থেকে রিভলভার বের করে ধরলো মিঃ এথোলের বুকে– সঠিক করে বলুন, কেন তাকে হত্যা করেছেন?
এবার এথোল এতোটুকু বিচলিত হলেন না, অট্টহাসি হেসে বললেন– বৎস, তুমি দেখছি আমাকেই খুনী বানিয়ে বসেছে। যদি বলি, তুমি তাকে হত্যা করেছে।
আমি!
হাঁ, তুমি রাতে ঐ বাড়িতেই ছিলে কিনা। দেখ আলম, একটি কথা মনে রেখো– খুনীকে এখনও আমরা কেউ জানিনা। তবে তোমার চেয়ে আমি একটু বেশি জানি, কারণ ম্যাকমারা কেন খুন হয়েছে। একথা আমার জানা নেই। তুমি যা এখনও জানোনা।
ঠিক বলেছেন, আমি জানিনে কেন সে খুন হয়েছে এবং কে তাকে খুন করেছে।
তাহলে মিছেমিছি আমাকে এভাবে অপদস্ত করার মানে কি হয় বলো? মিঃ এথোল বনহুরের রিভলভারের মাথাটা ধরে সরিয়ে দেয়।
বনহুর বলে উঠলো এবার বলুন, কেন ম্যাকমারা খুন হয়েছে?
কিন্তু আমার আপত্তি আছে কথাটা বলতে।
তাহলে আমার হাতে আপনাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
তুমি ছেলেমানুষ, একটুতেই উতলা হচ্ছে, সবুর করো– সব জানতে পারবে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমার সহায়তা ছাড়া কেউ ম্যাকমারার হত্যাকারীকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে না।
সেদিন মিঃ এথোলের কাছে এর বেশি জানা সম্ভব হলোনা। বনহুর বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে বসলো।
গাড়িতে উঠে বনহুর সুইচ টিপে গাড়ির ভিতরে আলো জ্বেলে ফেললো এবং সম্মুখের ছোট্ট আয়নাখানা বাঁকিয়ে নিচু করে নিলো, যাতে পিছন আসনের সব স্পষ্ট দেখা যায়।
আয়নাটা নিচু করে নিয়ে তাতে দৃষ্টি ফেলতেই বনহুর দেখতে পেলো– তার গাড়ির পিছন আসনের তলায় উবু হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কেউ বসে আছে। আশ্চর্য হলো না বনহুর, কারণ সে জানে এমন থাকা স্বাভাবিক।
