কেন, সন্দেহ ছিলো নাকি?
হাঁ, আপনি নামকরা একজন ধনবান লোক অথচ আপনার এ রকম বাড়ি– আমি ভাবতে পারিনি।
বসুন, বলছি।
বনহুর আসন গ্রহণ করলো।
এথোল সিগারেট-কেসটা বের করে বনহুরের সম্মুখে এগিয়ে ধরলেন–নিন।
বনহুর আলগোছে একটা সিগারেট তুলে নিলো এথোলের সিগারেট-কেস থেকে। কিন্তু সে এখোলের অলক্ষ্যে সিগারেটটা নিজের পকেটে রেখে, নিজস্ব একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরে তাতে অগ্নিসংযোগ করলো।
এথোলও তার নিজের সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে একরাশ ধূয়া নির্গত করলেন।
বনহুর তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন– এতো রাতে আপনাকে বিরক্ত করলাম বলে মনে কিছু করবে না।
নিশ্চয়ই আমি খুশি হয়েছি, এবং আমি আপনার নিকটেই গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে না পেয়ে বাসায় ফিরে এলাম। অবশ্য জানতাম, আপনি এখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
বনহুর আরও অবাক হলো, বললো– কি করে আপনি জানলেন, আমি আপনার জন্য আপনার বাড়িতে অপেক্ষা করছি!
এ সহজ কথাটা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে– আশ্চর্য ছেলে তুমি! দেখ আলম, তোমাকে তুমি বললাম বলে মনে কিছু করোনা।
নিশ্চয়ই না। কিন্তু আপনি জানেন আমি আপনার কাছে কেন এসেছি?
বৎস, আমি জানবো না! দেখো আলম– তুমি আমাকে সন্দেহ করেছে– আমিই হয়তো বন্ধু ম্যাকমারা হত্যা-রহস্যের সঙ্গে জড়িত আছি।
সন্দেহ নয়, আপনি নিশ্চয়ই জানেন কে আপনার বন্ধু ম্যাকমারাকে হত্যা করেছে?
হেসে উঠলেন এথোল– ছেলেমানুষ তোমরা, গভীর রহস্য বুঝতে এখনও তোমাদের অনেক বিলম্ব আছে।
আপনি কি বলতে চান, ম্যাকমারা হত্যা-রহস্য ব্যাপার আপনি জানেন না?
না। তবে জানি– কেন সে নিহত হয়েছে।
কেন সে নিহত হয়েছে আপনি না বললেও আমি জানি।
হেসে উঠলেন আবার এথোল মিথ্যা কথা, কেন ম্যাকমারা নিহত হয়েছে একমাত্র আমি। আর হত্যাকারী ছাড়া কেউ জানে না।
আপনি শুনতে চান কেন ম্যাকমারা হত্যা হয়েছে?
আমি জানি তুমি জানো না। শুধু তুমি কেন, তার কন্যাও জানেনা। আলম, তুমি স্থির হয়ে বসো কয়েকটা কথা আমি তোমাকে বলবো। হয়তো কথাগুলো বলার পর আমারও মৃত্যু ঘটতে পারে।
বনহুরের কাছে ঘটনাগুলো ক্রমেই আরও রহস্যময় বলে মনে হতে লাগলো।
এথোল তার হস্তের অর্ধদগ্ধ সিগারেটে শেষবারের মত টান দিয়ে সিগারেটটা মেঝেতে ফেললেন, তারপর পায়ের তলায় ফেলে বুট দিয়ে পিষে নিবিয়ে দিলেন।
বনহুর অবাক হলো আরও। টেবিলে এ্যাসট্রে অথচ মিঃ এথোল তার উচ্ছিষ্ট সিগারেট এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ না করে মেঝেতে ফেললেন কেন, এবং বুট দিয়ে এমনভাবে পিষে ফেললেন– যেন এতোটুকু চিহ্ন না থাকে! টেবিলে এ্যাসট্রে সম্পূর্ণ ফাঁকা।
বনহুর এ্যাসট্রে লক্ষ্য করছে দেখে মিঃ এথোল বললেন– আমার এ্যাসট্রে পরিষ্কার করবার লোক নেই এখানে, তাই আমি–কথা শেষ না করে গম্ভীর হলেন।
বনহুর কিছু চিন্তা করছিলো।
মিঃ এথোল বললেন আবার– আলম, আমি এইমাত্র পার্ক সার্কাসে গিয়েছিলাম তোমার সন্ধানে।
কিন্তু তোমাকে না পেয়ে আমি উৎকণ্ঠিত হইনি, কারণ আমি জানি তুমি আমার এখানে এসেছো। তারপর ফিরে যখন দরজায় আলবার্ডের গাড়ি দেখলাম তখন আমার ধারণা স্থির হলো। হাঁ, তুমি হয়তো ভাবছো এতোবড় বাড়ি অথচ লোকজন নেই কেন? আসলে শুধু এটাই আমার বাড়ি নয়, ডালহৌসী স্কয়ারে আমার মস্ত বড় বাড়ি আছে সেখানে আমার আত্মীয়-স্বজন-পরিবার সব আছে। তুমি হয়তো জানোনা– আমি একজন বৈজ্ঞানিক।
বনহুর বলে উঠলো– আপনি বৈজ্ঞানিক?
হাঁ, এই পাশের কামরায় আমার ল্যাবরেটরী। সারাদিন আমি আমার সাধনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, বাড়িতে নানা অসুবিধার জন্য এখানে এ বাড়িটা আমি বেছে নিয়েছি। আমাকে মাঝে মাঝে বাইরে যেতে হয়, তাই আমি বাড়ির দরজায় তালা বন্ধ করে যাই। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে তুমি আরও অবাক হয়েছে।
হাঁ, আপনি বেশ বুদ্ধি করেছেন, বাসায় আপনি নেই অথচ কথাবার্তা চলছে আপনার ঘরে।
ঠিক বলেছো। আমি টেপরেকর্ডে এমন এক ভাষার সৃষ্টি করেছি যা আমাদের বাংলাদেশের লোক বুঝতে পারবে না। কলকাতা শহর– চোর-জোচ্চোরের তো অভাব নেই, কাজেই আমি এ ব্যবস্থা করেছি।
হেসে বললো বনহুর– সত্যি, আপনার বুদ্ধির তারিফ না করে পারছিনে।
যাক, এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, কেন আমি আমার বাড়িতে এ রকম ব্যবস্থা করেছি।
হাঁ, পেরেছি। কিন্তু আপনি এতো রাতে আমার সন্ধানে পার্ক সার্কাসে কেন গিয়েছিলেন তা জানতে পারি কি?
যে কারণে তুমি এসেছো আমার সন্ধানে?
বনহুর অবাক হলো এথোলের কথায়। মনোভাব গোপন করে বললো সে– ম্যাকমারার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করাই হলো আমার উদ্দেশ্য।
ঠিক আমারও তাই।
আপনি কি আমাকে প্রফেসার ম্যাকমারার হত্যাকারী বলে সন্দেহ করেন?
তুমি যেমন আমাকে সন্দেহ করছো, ঠিক ঐ রকম একটা সন্দেহের ছোঁয়া আমার মনেও দোলা জাগাচ্ছে। কিন্তু যাক সে সব কথা– এখন কাজের কথায় আসা যাক।
বনহুর কোনো জবাব না দিয়ে নিশ্চুপ আর একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো।
এথোল হেসে বললেন– আমি যে সিগারেটটা তোমাকে দিয়েছিলাম নিঃসন্দেহে পান করতে পারো।
বনহুর চমকে উঠলো, তবে এথোল তার কার্যকলাপ টের পেয়েছেন। সে যে সিগারেটটা পান না করে পকেটে রেখেছে তা তিনি বুঝতে পারলেন কি করে? বনহুর বললো– আমি নিজের সিগারেট ছাড়া অন্য কোনো সিগারেট পান করিনে।
