বনহুরের গাড়ি ধর্মতলা রোড ত্যাগ করে বেনিয়া পুকুর রোডে প্রবেশ করলো। এটা খুব বড় রাস্তা নয়, তবু দোকানপাট যথেষ্ট রয়েছে; মাঝে মাঝে ব্যবসায়ী লোকদের বাড়িও দেখা যায়। বেনিয়া পুকুর হয়ে লোয়ার চিৎপুর রোড দিয়ে বৌবাজারের মোড়ে এসে বনহুর গাড়ি রাখলো। আবার হাতঘড়ির দিকে। তাকিয়ে দেখে নিলো বনহুর। এতোটা পথ আসতে তার সম্পূর্ণ এক ঘন্টা সময় লেগেছে। অনেক ঘুরেফিরে এপথে-সে পথে তাকে আসতে হয়েছে।
বৌবাজারের অদূরে চৌমাথায় একটা মাঝারী রকমের বাড়ি। বনহুর দূর থেকে লক্ষ্য করলো বাড়িটার সবগুলো কামরার জানালা– কপাট বন্ধ।
বনহুরের গাড়ি থেকে প্রায় একশত হাত দূরে সেই বাড়িখানা। এ বাড়িই মিঃ এথোলের। বনহুর আশ্চর্য হলো– এতোবড় ধনবান লোক হয়ে ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকেন, ব্যাপার কি!
অবশ্য বনহুর এথোলের বাড়ির সন্ধান লাভ করেছিলো আলবার্ডের এক বয়ের কাছে। কয়েকদিন ধরে বনহুর সকাল-সন্ধ্যা দ্বিপ্রহর আলবার্ডের একটি শিক্ষিত বয়কে সঙ্গে করে কলকাতার প্রায় বহু জায়গা চষে ফিরেছে।
আলবার্ড এখন হাজতে।
বাড়িতে তার বৃদ্ধা স্ত্রী এবং দুই সন্তান ছাড়া আর কেউ আপন জন নেই। তবে আলবার্ডের কারবার অনেক, ইণ্ডাষ্ট্রি আছে যথেষ্ট। কর্মচারী, দাস-দাসী চাকার-বাকরের অভাব নেই। প্রত্যেকটা ইণ্ডাষ্ট্রির জন্য ম্যানেজার এবং বিভিন্ন কর্মচারী রয়েছে। আলবার্ডের জ্যেষ্ঠপুত্র আর্থার শিক্ষিত এবং জ্ঞানবান যুবক প্রায় বনহুরের সমবয়সী। বনহুরের বেশ ভাব জমে গেছে আর্থারের সঙ্গে। সে নিজে বনহুরকে সহায়তা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে তার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণিত করার জন্য। আর্থারের বিশ্বাস, তার বাবা কাকা ম্যাকমারার হত্যাকারী নয়।
আজ সকালে বনহুর আলবার্ডের বয় পিলুকে সঙ্গে করে দেখে গেছে মিঃ এথোলের বাড়িটা। কিন্তু এখন আশ্চর্য হলো বনহুর পিলু তাকে ধোকা দিয়েছে, এ বাড়িতে কেউ বাস করে বলে মনে হলো না। চোখে দূরবীণ লাগিয়ে বনহুর ভালোভাবে লক্ষ্য করলো, সত্যিই এ বাড়ি তালাবন্ধ। বনহুর তার গাড়ি নিয়ে বাড়িটার দরজায় এসে দাঁড়ালো। বহুদিন বাড়িখানা মেরামত না করার দরুণ বাড়িটা জিরজিরে মনে হচ্ছিলো।
বনহুর এবার গাড়ি থেকে নেমে পড়লো, পকেট থেকে এক গোছা চাবি বের করে বাড়ির দরজায় যে তালা লাগানো ছিলো তাতে একটির পর একটি লাগিয়ে চললো। বাড়িখানা এমন স্থানে যেখানে তেমন কোনো লোকজনের ভীড় নেই।
অল্পক্ষণেই তালা খুলে গেলো; বনহুর সন্তর্পণে ভিতরে প্রবেশ করলো। জমাট অন্ধকার, বাড়ির কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই। এগুতে লাগলো বনহু। বাড়িটা তো তার জানাশোনা নেই, কাজেই বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে গিয়ে বেঁচে যাচ্ছিলো। আর খানিকটা এগুতেই হঠাৎ একটা ফিসফিস চাপা পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেলো।
থমকে দাঁড়ালো বনহুর। দ্বি
তলের কোনো কক্ষ থেকে আওয়াজটা ভেসে আসছে।
বনহুর জানেনা, এ বাড়ির দ্বিতলে উঠার সিঁড়িটা কোন ধারে। তবু ভালভাবে সন্ধান করে চললো, অল্পসময়েই পেয়ে গেলো সিঁড়িটা। বনহুর পকেটে হাত দিয়ে রিভলভারখানা বের করে দক্ষিণ হস্তে চেপে ধরলো। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো সে এবার।
সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই বনহুর বুঝতে পারলো–প্রশস্ত একটা টানা বারান্দা সোজা চলে গেছে উত্তর দিকে। ওদিকের কোণের একটা কক্ষ থেকেই আওয়াজটা আসছিলো। বনহুর অগ্রসর হলো। কথার আওয়াজ লক্ষ্য করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলো সে। সাবধানে দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো, কক্ষমধ্যে দু’জন ফিস ফিস করে আলাপ করছে স্পষ্ট বোঝা গেলো।
বনহুর দরজায় কান লাগিয়ে কথাবার্তা বুঝবার চেষ্টা করলো, কিন্তু যে ভাষায় কথাবার্তা চলছে তা বাংলা বা ইংরেজি ভাষা নয়। চীনা, জাপানী ভাষাও নয়– কি ভাষা তা বনহুর বুঝতে পারলোনা।
বনহুর বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ওদিকের শার্শীতে চাপ দিয়ে খুলে ফেললো, এবং লাফিয়ে। পড়লো কক্ষমধ্যে। দক্ষিণ হস্তে তার গুলী ভরা রিভলভার।
কক্ষ অন্ধকার!
বনহুর এবার পকেট থেকে টর্চ বের করে আলো জ্বালালো। আশ্চর্য হয়ে গেলো সে–কক্ষ শূন্য! কিন্তু তখনও কথাবার্তার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
বনহুর বিস্মিত হয়ে দেখলো– কক্ষের এক কোণে একটা টেবিলের উপর টেপ রেকর্ড চালু করা রয়েছে। সেই টেপ রেকর্ডের কথাবার্তাই এতোক্ষণ বনহুর শুনতে পাচ্ছিলো। বনহুর এবার সুইচ টিপে আলো জ্বালালো। কক্ষটি খুব বড় নয়। মূল্যবান আসবাব বলতে একটি খাট, একটি টেবিল আর কয়েকখানা চেয়ার। এক পাশে একটা আলমারী, আলমারীর মধ্যে কিছুসংখ্যক বই।
বনহুর আলমারীটা খুলে ফেললো। এক একখানা বই হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে আবার স্ব-স্থানে রেখে দিলো। প্রায় অনেকগুলো বই সে মেলে মেলে দেখলো। নানা ভাষার বই সে দেখলো আলমারীটাতে।
আলমারী বন্ধ করতেই দরজা খুলে কক্ষে প্রবেশ করলেন মিঃ এথোল। বনহুরকে দেখে কিছুমাত্র আশ্চর্য না হয়ে বললেন– বাইরে আলবার্ডের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই বুঝেছিলাম আপনি এসেছেন।
বনহুর অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এখোলের মুখের দিকে।
এথোল ঠিক পূর্বের মতই স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন– বসুন।
বনহুর আসন গ্রহণ না করে গম্ভীর গলায় বললো– এটাই বুঝি আপনার বাড়ি?
