আলবার্ড অপূর্ণ নয়নে উঠে দাঁড়ালেন, মিঃ বিনয় সেন ও মিঃ রাজেন্দ্রনাথকে দেখতে পেয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলেন।
এথোল গম্ভীর কঠিন কণ্ঠে বললেন- মিঃ আলবার্ড তার ভাইকে হত্যা করেছে।
কক্ষমধ্যে যেন বাজ পড়লো।
বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো মিঃ এথোল এবং পুলিশ কমিশনার মিঃ বিনয় সেন ও ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথের মুখে।
এথোলের কথায় ইন্সপেক্টার রাজেন্দ্রনাথ আলবার্ডের হস্তে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।
বিনয় সেন বললেন– আহা, মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেছে, তোমরা ওকে দেখ।
কয়েকজন পুলিশ শ্যালনের দিকে এগুতেই বনহুর বললো– ওর জন্য ঘাবড়াবার কিছু নেই, অজ্ঞান হয়ে গেছে একটু পরেই জ্ঞান ফিরে আসবে। বনহুর নিজে শ্যালনের চোখে মুখে ফুঁ দিতে লাগলো। একটা চাকরকে পানি আনার জন্য ইংগিত করলো বনহুর।
সামান্য কয়েকটা ঘন্টার মাত্র ব্যবধান– তারই মধ্যে কি সর্বনেশে কাণ্ডটাই না ঘটে গেলো!
আজ সন্ধ্যার পর তারা সবাই মিলে যখন আলবার্ডের বাড়িতে আগমন করেছিলেন তখন কত আনন্দই না প্রকাশ করেছিলেন আলবার্ড, এবং সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ডিনার খাইয়েছিলেন। সবাই মিলে যখন বিদায় গ্রহণ করেছিলেন তখন রাত বারোটা প্রায় বেজে গিয়েছিলো।
মিঃ বিনয় সেন যখন বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে এগুচ্ছিলেন তখন ম্যাকমারা ফিস ফিস করে তার কানে কিছু বলেছিলেন– এটা আর কেউ লক্ষ্য না করলেও বনহুর করেছিলো। বিনয় সেনকে ম্যাকমারা শেষ বারের মত কি বলেছিলো তা একমাত্র নিহত ম্যাকমারা আর পুলিশ কমিশনার বিনয় সেন ছাড়া আর কেউ জানে না। কি এমন গোপন কথা তিনি বন্ধুর কাছে বলেছিলেন তিনিই জানেন। তারপর বনহুর শয্যা গ্রহণের পর অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, আর্তনাদের শব্দে যখন তার ঘুম ভাঙলো তখন রাত চারটে।
একটা বয় পানি এনে বনহুরের হাতে দিলো, সে তখন শ্যালনের চোখে ঝাপটা দিতে লাগলো। অল্পক্ষণে শ্যালনের জ্ঞান ফিরবে বলে মনে হলো না বনহুরের।
মিঃ বিনয় সেন এবং মিঃ রাজেন্দ্রনাথ ম্যাকমারার লাশ পরীক্ষা করে দেখছিলেন।
আলবার্ডের হাতে তখন হাতকড়া লাগানো হয়ে গেছে। তিনি নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছেন, এবং মাঝে মাঝে উচ্চারণ করছেন–ঈশ্বরের শপথ, আমি আমার ভাইকে হত্যা করিনি– আমার ভাইকে আমি হত্যা করিনি–
মিঃ এথোল ক্রুদ্ধভাবে বলছেন–তুমি মিছেমিছি নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছো। তুমি যদি ম্যাকমারাকে হত্যা না করবে তাহলে কেন তাকে জেদ করে তোমার বাড়িতে নিয়ে এলে? আমার বাড়িতে তাকে যেতে দিলে না কেন তবে বলো? নিশ্চয়ই এ তোমার কাজ।
পুলিশ অফিসারদ্বয়ের লাশ পরীক্ষা এবং ডায়রী লেখা শেষ হলে, বনহুর তাদের পাশে এসে দাঁড়ালো। বললো সে এথোলকে লক্ষ্য করে– মিঃ এথোল, আপনাকে আমি একটি প্রশ্ন না করে পারছিনে। বলুন আমার প্রশ্নের সঠিক জবাব দেবেন?
বলুন, যদি দেবার মত প্রশ্ন হয় নিশ্চয়ই দেবো!
দেখুন, ম্যাকমারা খুন হয়েছে রাত্রি চারি ঘাটকায়, আর আপনি পুলিশ কমিশনার এবং ইন্সপেক্টার সাহেবকে নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছেন ঠিক রাত্রি সাড়ে চারটায়। মাত্র অধঘণ্টা সময়ে আপনি এখানে এসে পৌঁছেছেন। তাতে মনে হয় ম্যাকমারা রাত্রি চারি ঘটিকায় খুন হবেন, এ কথা আপনি জানতেন?
হা জানতাম, জানতাম বলেই আমি ম্যাকমারার বিশিষ্ট বন্ধু মিঃ সেন এবং ইন্সপেক্টারকে নিয়ে পার্ক সার্কাস রওয়ানা দিই কিন্তু তার পূর্বেই খুনী তার কাজ শেষ করে ফেলেছে।
কি করে আপনি জানলেন–ম্যাকমারা আজ রাতে নিহত হবেন?
সব প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায় না। আপনি বুঝি আমাকে সন্দেহ করছেন?
মোটেই না।
তবে আমাকে এভাবে প্রশ্ন করার কি মানে হয়?
আমাকে ক্ষমা করবেন। তবে হাঁ, পুলিশ আপনাকেও রেহাই দেবে না।
বিনয় সেন হাসলেন–ধন্যবাদ মিঃ আলম। আপনি ঠিকই বলেছেন, মিঃ এথোলকেও আমরা। এতো সহজে ছেড়ে দেবো না।
পুলিশ অফিসে তাকেও কৈফিয়ৎ দিতে হবে।
সেদিন এর বেশি আর কিছু জানা সম্ভব হলো না বনহুরের পক্ষে। ম্যাকমারার লাশ পোষ্টমর্টেমের জন্য মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ ইন্সপেক্টার দলবল নিয়ে বিদায় গ্রহণ করলেন।
ততক্ষণে শ্যালনের জ্ঞান ফিরে এসেছে।
সে বনহুরকে বারবার প্রশ্ন করছে–তার বাবা কেমন আছেন।
তিনি বেঁচে আছেন তো?
বনহুর সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে-হাঁ, তোমার বাবা জীবিত আছেন।
তাকে হসপিটালে রাখা হয়েছে।
*
বনহুর কক্ষমধ্যে পায়চারী করছে আর সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে। কক্ষমধ্যে ধুম্ররাশি ঘুরপাক খেয়ে খেয়ে এক যজ্ঞকুণ্ডের আকার ধারণ করেছে। বনহুরের ললাটে গভীর চিন্তা-রেখা ফুটে উঠেছে। সে ভাবছে প্রফেসার ম্যাকমারার হত্যা-রহস্যের কথা ভাবছে তার গায়ের ছোট্ট জামাটার কথা। নিশ্চয়ই ম্যাকমারার জামাটাই তাঁর হত্যার কারণ। কিন্ত কেন, কি ছিলো তার। জামার মধ্যে…
বনহুর থমকে দাঁড়ায়, অর্ধদগ্ধ সিগারেটটা এ্যাসট্রেতে নিক্ষেপ করে পুনঃ আর একটি সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে, তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে বাইরে। গাড়ি-বারান্দায় গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো, বনহুর গাড়ির ড্রাইভ-আসনে চেপে বসলো।
কলকাতা নগরী তার কাছে নতুন হলেও একদিনে সে শহরের বহু স্থানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছে। ডায়মণ্ড হারবার থেকে দমদম পর্যন্ত সে ঘুরেফিরে দেখেছে। আলিপুর, বালিগঞ্জ, ঢাকুরিয়া, ভবানীপুর, ধর্মতলা, বৌবাজার, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, এমনকি সে মনুমেন্টের সঙ্গেও পরিচিত হয়ে গিয়েছে। বনহুর আজ পার্ক-সার্কাস রোড হয়ে ধর্মতলার দিকে অগ্রসর হলো। হাতঘড়ির দিকে একবার দেখে নিলো বনহুর, রাত একটা বিশ মিনিট। শীতের রাত নয়; গ্রীষ্মকাল– কাজেই রাত একটায় কলকাতা নগরী সন্ধ্যা রাতের মতই গমগম করছে। তবে ছোট-খাটো সঙ্কীর্ণ গলিপথগুলো নীরব নিঝুম হয়ে পড়েছে।
