কয়েকজন মিলে নানারকম আমোদ-আহ্লাদ আর গল্পে-সল্পে অনেক সময় কাটিয়ে দিলেন। যখন রওয়ানা দেবেন ঠিক সে মুহূর্তে এসে হাজির হলেন ম্যাকমারার এক আত্মীয় মিঃ এথোল। মিঃ এথোলকে দেখে ম্যাকমারা অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি যেমন খুশি হলেন তেমনি অবাকও হলেন, কারণ ম্যাকমারা বাংলাদেশে আগমন করেছেন, তা এথোল জানলেন কি করে!
ম্যাকমারা প্রশ্ন করে বসলেন– এথোল, আমার আগমনবার্তা তোমায় কে জানলো?
একটু গম্ভীর হাসি হেসে বললেন মিঃ এথোল–তুমি বাংলাদেশে আসবে আর আমি জানবো না? ম্যাকমারা, এথোল তোমার সব সংবাদই জানে, বুঝলে? কখন তুমি কোথায় কি করছো আমার অজানা নেই।
মিঃ এখোলের কথাগুলো বেশ হেয়ালীপূর্ণ বলে মনে হলো বনহুরের কাছে। কুঞ্চিত করে তাকালো এথোলের মুখে।
এথোল জেদ ধরে বসলো– প্রথম তার ওখানেই যেতে হবে তাদের। কিন্তু মিঃ আলবার্ড নাছোড় বান্দা; তিনি ধরে বসেছেন বহুদিন পর ভাই-এর সাক্ষালাভ ঘটেছে কিছুতেই তিনি ছেড়ে দেবেন না, বিশেষ করে প্রথমে তার ওখানেই আতিথ্য গ্রহণ করতে হবে।
কমিশনার বিনয় সেন অবশ্য তেমন জেদ ধরে না বসলেও ওখানে যেতে হবে এ সুনিশ্চয়।
ম্যাকমারা রাজি হলেন প্রথম তিনি তাঁর দাদা আলবার্ডের ওখানেই যাবেন।
পার্ক সার্কাস আলবার্ডের তিন তলা বাড়ি।
বড় হলঘরটার পাশের কামরায় বনহুর আর অন্যান্য ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। আলবার্ড। আর ম্যাকমারা ও শ্যালনের জন্য আলবার্ড তিন তলায় নিজের শয়নকক্ষের পাশে কামরায় জায়গা করে দিলেন। বহুদিন পর ভাইকে তিনি পেয়েছেন, খুশিতে উপছে পড়লেন যেন আলবার্ড।
বনহুর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে আসছে প্রায় আফ্রিকার জঙ্গল থেকে। ব্যাপারটা হলো এই ম্যাকমারা কোনো সময় তার দেহের বসন উন্মোচন করতেন না। তিনি সর্বক্ষণের জন্য একটা জামা পরে থাকতেন। জামাটা তিনি কোনোদিন পরিষ্কার করতেন বলেও মনে হয় না।
জামাটা তার সর্ব নীচে পরা থাকতো, এমনকি গেঞ্জিটাও তিনি ঐ জামার উপরে পরতেন। এ ব্যাপার নিয়ে প্রফেসার ম্যাকমারার ছাত্রদের মধ্যে বেশ একটা উৎসুক ভাব ছিলো কিন্তু কেউ সে ব্যাপারের সমাধান খুঁজে পায়নি।
বনহুর পর্যন্ত এ ব্যাপারে শ্যালনকে প্রশ্ন করেছিলো –আচ্ছা শ্যালন, তোমার আব্বার দেহটা তুমি দেখেছো কোনোদিন?
শ্যালন হেসে বলেছিলো– কেন বলো তো?
বনহুর বলেছিলো তোমার আব্বা সর্বক্ষণ একটা জামা গায়ে রাখেন, তিনি কি ঐ জামাটা কোনোদিন পরিষ্কার করেন না?
না। এ ব্যাপারে আমিও বাবাকে অনেক বলেছি। কিন্তু বাবা কোনোদিন ঐ জামা পাল্টান না বা পরিষ্কার করেন না।
বনহুর অস্কুটকণ্ঠে বলেছিলো– আশ্চর্য!
তারপর আর কোনোদিন এ ব্যাপারে সে আগ্রহশীল ছিলোনা। কারণ নানা মানুষের নানা ধরণের স্বভাব! ম্যাকমারার হয়তো ওটা অভ্যাস ছাড়া কিছু নয়।
বনহুর অনেকদিন এমন নরম বিছানায় শয়ন করেনি। মিঃ আলবার্ডের আতিথ্যে খুশি হলো। বনহুর। খাওয়া-দাওয়ার পর পরম নিশ্চিন্তে শয্যা গ্রহণ করলো সে।
অল্পক্ষণেই ঘুমিয়ে পড়লো বনহুর।
রাত বেড়ে আসছে।
কলকাতা নগরী এক সময় ঝিমিয়ে এলো। রাজপথ প্রায় জনশূন্য হয়ে এসেছে।
কোনো এক গির্জা থেকে রাত চারটা বাজার ঘন্টাধ্বনি হলো।
ঠিক সে মুহূর্তে তীব্র একটা আর্তনাদ শোনা গেলো আলবার্ডের বাড়ির তিন তলা থেকে।
ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের, বিদ্যুৎ গতিতে বিছানায় উঠে বসলো, সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেলো নারীকণ্ঠের আর্ত-চীৎকার। বনহুর মুহূর্ত বিলম্ব না করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে উপরে ছুটলো, কিন্তু যেদিক থেকে আর্তনাদ এবং নারীকণ্ঠে, চিৎকার শোনা গিয়েছিলো সেদিকে না গিয়ে ছুটে গেলো বনহুর মিঃ আলবার্ডের শয়নকক্ষের দিকে এবং দরজায় এসে দাঁড়াতেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন আলবার্ড, নিদ্রাজড়িত ভয়ার্ত কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন– মিঃ আলম আপনি!
হাঁ, এ দিকে কোথাও তীব্র আর্তনাদ শোনা গেলো–
ব্যস্তকণ্ঠে বললেন আলবার্ড– আমিও সে রকম শুনলাম। চলুন দেখি আমার বাড়ির কোথায় কার কি দুর্ঘটনা ঘটেছে–
তখনও একটা গোঙ্গানীর মত শব্দ ওদিকের কামরা থেকে ভেসে আসছে। বনহুর আর মিঃ আলবার্ড ছুটে গেলো পাশের কামরার দরজায়। আলবার্ড বলে উঠলেন– এ কক্ষেই তো ম্যাকমারা আর শ্যালন আছে।
দরজায় চাপ দিতেই খুলে গেলো।
কক্ষে প্রবেশ করলেন আলবার্ড আর বনহুর।
বিষ্ময়ে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলেন আলবার্ড- খুন!
বনহুর তাকিয়ে দেখলো ওদিকের বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে শ্যালন আর এদিকের খাটের নিচে মেঝেতে রক্তাপুত অবস্থায় উবু হয়ে পড়ে আছেন ম্যাকমারা। একখানা ছোরা সমূলে বিদ্ধ। হয়ে আছে তার পিঠে। বনহুর আরও অবাক হয়ে দেখলো– ম্যাকমারার দেহে তার এতো সাধের সেই তেলচিটে জামাটা নেই।
মিঃ আলবার্ড ম্যাকমারার রক্তাক্ত দেহের উপর মাথা রেখে রোদন করে চলেছেন।
ততক্ষণে বাড়ির অন্যান্য লোকজন এবং চাকর-বাকর সবাই ছুটে এসে জড়ো হয়েছে। হঠাৎ একটা খুনের দৃশ্য লক্ষ্য করে সকলের মুখ ভয়ার্ত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
এমন সময় অতর্কিতে কক্ষে প্রবেশ করলেন মিঃ এথোল। তার পেছনে কমিশনার বিনয় সেন আর পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ রাজেন্দ্রনাথ এবং কয়েকজন পুলিশ।
বললেন এথোল স্যার, দেখুন আমার কথা সত্য কিনা। আমি জানতাম, আজ রাতেই ম্যাকমারা খুন হবে এবং সে সন্দেহেই আমি ম্যাকমারা ও তার কন্যাকে আমার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্য কাউকে রেহাই দেয় না–
