‘পুলিশ কমিশনার কথাটা বনহুরের কানে যদিও সুমধুর লাগলো না তবু বললো– একথা আমাকে জিজ্ঞাসা করার কারণ কি স্যার?
এই সাধারণ কথাটা তুমি বুঝতে পারলেনা আলম? তোমার যদি এতে অমত থাকে তবে তুমি যেখানে যেতে চাও তাই হবে।
না না, আমার এতে অমত থাকবে কেন। আমারও সখ এক বার কলকাতা নগরীটা দর্শন করি।
বেশ, তোমার কথা শুনে খুশি হলাম অনেক। কলকাতায় আমার আত্মীয়-স্বজন অনেকে আছেন। বিনয় সেন আমার বিশিষ্ট বন্ধু। আমরা একই সঙ্গে লণ্ডনে পড়াশোনাও করেছি। পড়াশোনা শেষ করে আমি চলে এলাম নিজের দেশ ছেড়ে জমরুদে; বৈজ্ঞানিক হিসাবে এক ল্যাবরেটরীতে কাজ নিলাম। আর বিনয় যেন পুলিশ বিভাগে বিশিষ্ট আসন গ্রহণ করে কমিশনার পদে নিযুক্ত হলো। যদিও আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ বহুদিন যাবৎ নেই, তবু আমাদের বন্ধুত্ব এখনও পূর্বের ন্যায় অটুট আছে। আমরা এখনও উভয়ে উভয়কে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করে থাকি। জানো আলম, বিনয় সেন পুলিশ বিভাগে যথেষ্ট নাম করেছে। বহু ডাকাত আর দস্যুকে সে গ্রেপ্তার করে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। দস্যু বনহুরের নাম হয়তো শুনেছো, তাকেও গ্রেপ্তারের জন্য বিনয় একবার কান্দাই গমন করেছিলো–
বনহুর অস্ফুট কণ্ঠে বললো– কান্দাই!
হাঁ, বিনয় সেন দস্যু বনহুর গ্রেপ্তারে কান্দাই শহরেও গিয়েছিলো, কিন্তু সফলকাম হয় নি।
কেন তিনি সফলকাম হলেন না স্যার?
শ্যালন এবার বলে উঠলো– দস্যু বনহুরের নাম তো তুমি শোননি আলম কি সাংঘাতিক দস্যু সে! মিঃ সেন কেন, অমন কত পুলিশ অফিসার তাকে গ্রেপ্তারে হিমসিম খেয়ে গেছে।
হাঁ, শ্যালন যা যা বলছে সব সত্য, খাঁটি সত্য কথা। যদিও কান্দাই আমি কোনোদিন যাইনি, কিন্তু দস্যু বনহুর সম্বন্ধে আমি অনেক কথা অবগত হয়েছি। শুধু কান্দাই শহরেই নয়, সমস্ত আরাকান হতে জমরুদ এবং প্রায় পৃথিবীর বহু স্থানে দস্যু বনহুর তার প্রভাব বিস্তার করেছে। আমি লিবিয়াতে বসে সব অবগত হয়েছি।
দস্যু বনহুর তাহলে ভয়ানক লোক? বললো বনহুর।
শুধু ভয়ানক নয়, সাংঘাতিক দস্যু; হ কি যেন বলছিলাম– বিনয় সেন সেই দুর্দান্ত দস্যুকে গ্রেপ্তার করতে কান্দাই গিয়েছিলো। অবশ্য তখন বিনয় হামবাদ শহরের পুলিশ কমিশনার ছিলো।
বনহুর বললো এবার আপনার পুলিশ কমিশনার বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হয়ে অত্যন্ত সুখী হবো স্যার।
হাঁ, বিনয় আমাদের দেখলে অনেক আনন্দ পাবে। তাছাড়া আমার সম্পর্কে এক দাদা রয়েছেন। মস্তবড় ব্যবসায়ী কলকাতায় তার বড় বড় কারবার আছে– নাম আলবার্ড, প্রথমে আমি তার ওখানেই উঠবো। দেখো আলম, তুমি তাকে দেখলে বিশ্বাস করবে না, যদিও সে আমার বয়সে বড় তবু তাকে আমার চেয়ে বয়সে অনেক কম বলে মনে হয়। আলবার্ড বড় ভালবাসেন, স্নেহ করে আমাকে। বহুদিন পর আলবার্ড দাদাকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করবো বলে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। পার্ক সার্কাসে তার বাড়ি। আমাদের জাহাজ ডায়মণ্ড হারবার থেকে খিদিরপুর ডকে পৌঁছলে আমরা মোটর যোগে তার ওখানে যাবো।
*
ম্যাকমারার কথা অনুযায়ী তাদের জাহাজ ডায়মণ্ড হারবার বন্দরে নোঙ্গর করলো। দুই দিন সেখানে অপেক্ষা করবার পর ম্যাকমারার জাহাজ খিদিরপুর ডকের দিকে অগ্রসর হলো।
বৃদ্ধ ম্যাকমারার আনন্দ আর ধরে না। তিনি বালকের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। বহুদিন পর বাংলা দেশের মাটির আস্বাদ গ্রহণের আশায় তিনি যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছেন।
শ্যালন হেসে বললো– বাবা, তোমাকে খুব আনন্দমুখর লাগছে, ব্যাপার কি বলো তো?
বনহুরও বসেছিলো তাদের পাশে, বই পড়ছিলো সে শ্যালনের কথায় বলে উঠে বনহুর– মাতৃভূমির ডাক স্যারকে আকর্ষণ করছে, তাই তিনি আনন্দমুখর হয়ে উঠেছেন।
ম্যাকমারা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলেন– হা আলম, তুমি ঠিকই বলেছো। মাতৃভূমির আকর্ষণ আমকে সত্যিই চঞ্চল করে তুলেছে।
নানা কথাবার্তা আর গল্প-সল্পের মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়ে চলে।
খিদিরপুর ডকে পৌঁছে দেখেন ম্যাকমারা, পুলিশ কমিশনার বিনয় সেন স্বয়ং এসেছেন বন্ধুবর ও তার কন্যাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যেতে। বহুদিন পর বন্ধুদ্বয় মিলিত হয়ে আনন্দিত হয়ে উঠলেন। উভয়ে উভয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তাঁরা। তারপর পরিচয়ের পালা।
ম্যাকমারা তাঁর কন্যা শ্যালনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমার মেয়ে শ্যালন। আর এ হচ্ছে আমার ভাবী জামাতা মিঃ আলম। অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গেও বিনয় সেনের পরিচয় করিয়ে দিলেন ম্যাকমারা এবং বিনয় সেনের পরিচয় দিলেন তার দলবলের কাছে।
বিনয় সেনের সঙ্গে বনহুরের হ্যাণ্ডসেক হলো।
বিনয় সেন বললেন– ম্যাকমারা, তোমার ভাবী জামাতাকে দেখে সত্যি আমি আনন্দ বোধ করছি।
বিনয় সেনের কথা শুনে হাসলো বনহুর।
এরপর সবাই রওয়ানা দিলো।
বিনয় সেন নিজের গাড়িতে ম্যাকমারা, শ্যালন আর বনহুরকে উঠিয়ে নিলেন। আর অন্যান্য দুটি গাড়িতে চললো ম্যাকমারার সঙ্গী ছাত্রদল।
প্রথমে খিদিরপুর ডাকবাংলোয় এসে উঠলো তারা।
খবর পেয়ে ম্যাকমারার সম্পর্কীয় দাদা আলবার্ড এসে হাজির হলেন খিদিরপুর ডাকবাংলোয়। অত্যন্ত অমায়িক ভদ্রলোক আলবার্ড। অল্পক্ষণেই তার ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ হয়ে পড়লো।
ডাকবাংলোয় বসে সবাই মিলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো, চা-নাস্তার অবসরে চললো নানা রকম আলাপ-আলোচনা। আফ্রিকার জঙ্গলের কাহিনী শোনাতে লাগলেন ম্যাকমারা।
