বনহুর একটা নিশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শোয়। মনে করে, নিশ্চয়ই কোমল হস্তের অধিকারিণী তার ক্যাবিন ত্যাগ করে চলে যাবে। কিন্তু সে আশা সফল হয় না বনহুরের। হস্ত-সঞ্চালন বন্ধ হয় না বরং আরও গম্ভীর হয়ে উঠে। তার গায়ের চাদরখানা টেনে দেয় হস্ত-সঞ্চারণকারিণী।
বনহুর খপ করে ওর হাত ধরে ফেলে– কে তুমি?
ক্যাবিনের অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা না গেলেও বুঝতে পারে বনহুর হস্ত-সঞ্চারণকারিণী অন্য কেহ নয় ম্যাকমারার কন্যা শ্যালন!
শ্যালন জবাব দেয় না কোনো।
বনহুর তার হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়– কে তুমি?
তবু নিরুত্তর শ্যালন।
বনহুর ঝুঁকে টেবিল ল্যাম্পটার সলতে বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে শ্যালন উঠে দাঁড়ায়, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় সে বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর শয্যায় উঠে বসেছিলো, আবার সে শয্যায় শুয়ে পড়ে শান্ত কণ্ঠে বলে– শ্যালন, এতো রাতে আমার ক্যাবিনে তোমার আগমন অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। আমি চাইনে, তোমার আচরণ অন্যের মনে। সন্দেহ আনে। ধরো তোমার আব্বা যদি এতো রাতে তোমাকে আমার ক্যাবিনে দেখেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি খুশি হবেন না।
আলম, বাবা এখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন।
অন্যান্য কেউ তো দেখে ফেলতে পারে।
আমি জানি, ওরা সবাই ভীতু, এতো রাতে জাহাজে কেউ জেগে নেই।
শুধু ক্যাপ্টেন আর সারেংগণ ছাড়া, তাই না?
হ আলম, কিন্তু তারা নিশ্চয়ই এদিকে আসবে না।
কি চাও তুমি আমার কাছে?
শ্যালন মাথা নীচু করে।
একটু হাসির শব্দ হয় বনহুরের মুখ থেকে, বলে এবার বনহুর –শ্যালন, এ জাহাজে তোমাকে। সঙ্গীরূপে পেয়ে সত্যি আমি নতুন জীবন লাভ করেছি। তোমাকে না পেলে আমি হয়তো আজ এ জাহাজে টিকে থাকতে পারতাম না। কিন্তু আমি হয়তো তোমাকে কোনোদিন সন্তুষ্ট করতে পারবো না শ্যালন।
শ্যালন আলমের মুখে দৃষ্টি তুলে ধরলো।
বনহুর বললো–তুমি যা চাও আমি জানি, কিন্তু তা সম্ভব নয়। শ্যালন, পূর্বেই বলেছি– আমি তোমাকে ভালবাসি সত্য, কিন্তু গ্রহণ করতে পারিনে। বনহুর শ্যালনের হাতখানা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে অস্ফুট কণ্ঠে বলে– শ্যালন, তুমি আমাকে ক্ষমা করো।
আলম!
শ্যালন, আমি তো পাথর নই– আমি মানুষ। তোমার কাছে আমার অনুরোধ– তুমি নির্জনে আমার পাশে এসো না।
কেন?
সে প্রশ্নের জবাব তুমি নিজের মনকে করো।
আলম, আমাকে ভাল লাগেনা, এই তো?
ভুল বুঝছো শ্যালন, তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে। তোমার মধ্যে আমি খুঁজে পাই আমার হারানো প্রিয়াকে, তাই তাই আমার ভয় হয় হঠাৎ যদি নিজেকে আমি হারিয়ে ফেলি–
আলম!
শ্যালন, তুমি এভাবে আর এসোনা আমার পাশে। আমাকে উত্তেজিত করোনা।
বেশ, আমি আর আসবোনা। শ্যালন বনহুরের হাতের মুঠা থেকে নিজের হাতখানা ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়।
বনহুর মৃদু হাসে।
*
পর পর কয়েকদিন আর শ্যালন এলোনা বনহুরের ক্যাবিনে।
বনহুর যখন ম্যাকমারার ক্যাবিনে যায় তখন শ্যালন সরে পড়ে সেখান থেকে। একটা দুর্দমনীয় অভিমান তার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বনহুরের সঙ্গে দেখা হলেও সে কথা বলেনা, মুখ ভার করে থাকে।
এসব লক্ষ্য করে হানে বনহুর। সেও আর গায়ে পড়ে কথা বলতে যায় না শ্যালনের সঙ্গে।
বনহুর এদিন ম্যাকমারার কক্ষে প্রবেশ করে দেখে শ্যালন একা বসে বই পড়ছে। ম্যাকমারা ক্যাবিনের বাইরে কোথাও কোনো কাজে আটকা পড়ে আছেন।
আকাশ সেদিন মেঘাচ্ছন্ন, সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে ঝুপ ঝাঁপ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মাঝে মাঝে সাগরবক্ষে বাজ পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
বনহুর ক্যাবিনে প্রবেশ করে ডাকলো– শ্যালন।
শ্যালন যেমনভাবে বই পড়ছিলো তেমনি পড়তে থাকে, কোনো রকম সাড়া দেয় না।
বনহুর হাসলো, শ্যালনের মুখভাব লক্ষ্য করে বললো– শ্যালন, রাগ করেছো?
তবু কোনো জবাব দিলোনা শ্যালন, যেমন বসে ছিলো, তেমনি রইলো।
বনহুর আরও কয়েক পা সরে এসে একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে বললো– বেশ, চলে যাচ্ছি।
ঠিক সে মুহূর্তে বাজ পড়ার শব্দ জাহাজটাকে কাঁপিয়ে তুললো। জাহাজখানার নিকটে সাগরবক্ষে কোথায় বাজ পড়লো।
শ্যালন বই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে এসে জাপটে ধরলো বনহুরকে।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিলো।
পরক্ষণেই শ্যালন সরে যাচ্ছিলো কিন্তু বনহুরের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারলো না।
বনহুর হেসে বললো– অভিমান ঘুচে গেছে তো?
শ্যালন কোনো কথা বললোনা।
এমন সময় ক্যাবিনের বাইরে পদশব্দ শুনে শ্যালনকে মুক্ত করে দিয়ে বললো–তোমার বাবা আসছেন।
অল্পক্ষণ পর ক্যাবিনে প্রবেশ করলেন ম্যাকমারা। শরীরে তার ওয়াটারপ্রুফ ভিজে জুতোটা খুলে রেখে ক্যাবিনে এসে দাঁড়ালেন। বনহুরকে দেখে বললেন– আলম তুমি এখানে, আর আমি তোমাকে খুঁজে ফিরছি তোমার ক্যাবিনে।
বনহুর একটা সোফায় বসে পড়ে বললো– এই বৃষ্টির মধ্যে আপনি কেন কষ্ট করে আমার ক্যাবিনে গিয়েছিলেন, আমাকে ডেকে পাঠালেই আমি আসতাম।
শোন আলম, কাল আমাদের জাহাজ ডায়মণ্ড হারবারে পৌঁছবে বলে আশা করছি। জাহাজে আমাদের পুরো তিন সপ্তাহ কেটে গেলো, তবে আকাশের অবস্থা যদি আরও খারাপ হয় তাহলে আমরা বাধ্য হবো আরও কিছু সময় বঙ্গোপসাগরে থাকতে। হাঁ, যে কথা তোমাকে বলবো বলে খুঁজছি সেকথা হলো, প্রথমে আমরা কলকাতা শহরে কয়েকদিন কাটাবো। এতে তোমার মত আছে কিনা জানতে চাই? কারণ আমি ওয়্যারলেসে কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনয় সেনকে আমাদের আগমনবার্তা জানিয়ে দেবো। বিনয় সেন আমার বাল্যবন্ধু, এখন সে কলকাতায় আছে।
