ফুল, কেঁদোনা, তুমি যাতে বেদনা পাও তা আমি চাইনে। তোমাকে সুখী করাই আমার ইচ্ছা। ফুল, তুমি যদি আমাকে ভালবাসতে না পারো তা হলে আমি কোনো দিন জোর করে তোমার কাছে ভালোবাসা দাবি করবো না।
কেশব উঠে দাঁড়ালো, একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে ধীর-মন্থর গতিতে সেখান থেকে চলে গেলো।
ফুলের মুখ বিষণ্ণ-মলিন হয়ে উঠেছে, একটা গভীর বেদনার ছাপ ফুটে উঠে তার চোখে। উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে ফুল কেশবের চলে যাওয়া পথের দিকে। আজ থেকে কয়েক মাস পূর্বে সে দেখেছে। কেশবকে সর্বপ্রথম, তার পাশে ব্যাকুল দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে বসেছিলো সে! ফুল চোখ মেলে চাইতেই আনন্দে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠেছিলো, খুশির উচ্ছ্বাসে তার মুখটা তুলে ধরে ডেকে উঠেছিলো– ফুল!
অপূর্ব একটা অনুভূতি জেগেছিলো কেশবের মনে, ফুলের মতই সুন্দর লেগেছিলো ওকে, তাই সে ফুল বলে ডেকেছিলো প্রথম ওকে।
ফুল চোখ মেলে তাকিয়েছিলো, প্রথম সে দেখেছিলো কেশবকে সুন্দর দেবকুমারের মতই একটি যুবক। মাথায় কোঁকড়ানো এক রাশ চুল। গলায় জড়ানো যজ্ঞ উপবীত। পরনে গেরুয়া বসন। টানা টানা ডাগর দুটি চোখে মায়াময় চাহনী। ফুল স্মরণ করে কে এই যুবক, কোথায় তাকে দেখেছে। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ে না; যুবকটিকে সে স্মরণ করতে পারে না।
একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে এসেছিলো তার। ফুল ফিরে তাকিয়ে দেখেছিলো অপূর্ব জ্যোতির্ময় এক বৃদ্ধকে।
বৃদ্ধ গম্ভীর গলায় বলেছিলেন– আর ভয় নেই কেশব, এ যাত্রাও বেঁচে গেলো।
ফুল উঠে বসতে গিয়েছিলো তখন।
বৃদ্ধ বাধা দিয়ে বলেছিলো–উঠো না মা, তোমার বিশ্রামের প্রয়োজন।
ফুল নিষ্পলক নয়নে দেখেছিলো বৃদ্ধের মুখে মায়া-মমতার গভীর এক সমাবেশ।
তারপর কেটে গেছে কতদিন, ফুল বৃদ্ধের সান্নিধ্য এড়াতে পারেনি। এক মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছে সে।
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আর কেশবের দয়ায় সে পুনর্জীবন লাভ করেছে, তাই সে আজও তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। কেশব ভালবাসে তাকে। ফুল জানে, কেশবের ভালবাসা কত গভীর, কত নিবিড়। কিন্তু। ফুল পারে না তা গ্রহণ করতে। কেশব নিষ্পাপ, নির্মল, পবিত্র এক যুবক। ফুল জানে, কোনো নারীকে সে আজও স্পর্শ করেনি, তার চরিত্রে নেই কোনো কলুষিত ছাপ। তবু ফুল পারে না তাকে গ্রহণ করতে–
হঠাৎ ফুলের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে যায়, সন্ন্যাসী বাবাজী এসে দাঁড়ান তার সম্মুখে মা!
চমকে ফিরে তাকায় ফুল, বলে- বাবা, বলো?
ফুল, কেশবের কি হয়েছে?
কেন?
কেশব কুঠিরের মধ্যে অন্ধকারে বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। মা, ওকে ব্যথা দিনে মা। আমি তোর কাছে করজোরে বলছি– ও বড় অভিমানী, বড় অসহায়! জীবনে ও কারো কাছে এতোটুকু স্নেহ মায়া মমতা পায়নি। যা একটু পেয়েছে তা আমার কাছে। কিন্তু আমি তো ওর তপ্ত হৃদয়ে সুধা বর্ষণ করতে পারিনে। তুই নারী, তোর বুকে লুকিয়ে আছে মায়ের প্রাণ, বধূর দরদ, ভগ্নির স্নেহ– মা, মা, কেশবকে তুই ভালবাসতে না পারিস একটু স্নেহ, একটু মায়া-মমতা দিয়ে ওকে সজীব করে তোল–
বাবা, আমি তাই করবো, তাই করবো।
যাও মা, কেশব কুঠিরে একা শুয়ে আছে, যাও।
কুঠির মধ্যে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ায় ফুল।
কেশব বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে উবু হয়ে, হয়তো নীরবে রোদন করছে সে।
ফুলের হৃদয়ে একটা ব্যথা টন টন করে উঠলো, বড় মায়া হলো ওর মনে। সত্যি, কেশব কোনোদিন কারো কাছে এতোটুকু ভালবাসা পায়নি, পায়নি কারো স্নেহ-আদর। ফুল ওর বিছানার পাশে। গিয়ে বসলো, হাতখানা রাখলো কেশবের পিঠে।
কেশব চমকে তাকালো– কে!
আমি! ফুলের গলাটা কেঁপে উঠলো নিজের অজ্ঞাতে।
কেশব শয্যায় উঠে বসলো– ফুল, কেন তুমি এলে? কেন তুমি আমার মনে জ্বালা ধরিয়ে দাও!
না না, আমি– আমি তোমাকে– উঠে দাঁড়ায় ফুল।
ফুল, আমার কাছ থেকে তুমি পালাতে পারবে না। যেতে দেবো না তোমায় ফুল। কেশব ফুলের হাত ধরে ফেলে।
ফুল আঁতকে উঠে ছেড়ে দাও কেশব ভাই।
তা হয়না ফুল।
তুমি না বলেছিলে, আমার কাছে শপথ করেছিলে তুমি আমাকে কোনদিন স্পর্শ করবেনা?
ফুল।– সঙ্কুচিত ভাবে ছেড়ে দেয় কেশব ফুলের হাতখানা। বলে সে ফুল, আমাকে তুমি মাফ করে দাও। আমাকে তুমি মাফ করে দাও–
কেশব ভাই!
ফুল। ফুল– বোন আমার!
এমন সময় সন্ন্যাসী বাবাজী এসে দাঁড়ান কুঠিরের দরজায়, হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন সাধু– সাধু– ধন্য কেশব, ধন্য তুমি! কেশব তোমার সংযমশক্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে। আজ থেকে তোমরা দুইজন ভাই-বোন হলে।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো ফুল– বাবাজী!
কেশব তখন খুশিভরা চোখে তাকিয়ে আছে সন্ন্যাসী বাবাজীর মুখে।
সন্ন্যাসী বাবাজী যেমন এসেছিলেন তেমনি বেরিয়ে গেলেন কুঠিরের মধ্য হতে।
কেশব ফুলের হাত ধরে বললো- ফুল, বোন চলো।
চলো কেশব ভাই।
এখন থেকে ফুলের আর কোন সংকোচ বা দ্বিধা নেই। নেই কোন দ্বন্দ্ব। কেশব আর ফুল ঠিক ভাই আর বোনের মত। এক সঙ্গে ওরা বনে ফুল চয়ন করে মালা গাঁথে। কখনও বা কেশব ফল পেড়ে এনে ফুলকে দেয়, ফুল প্রাণভরে ভক্ষণ করে। কোনো কোনো সময় কেশব ভজন গান করে, ফুল। শোনে। ফুল গান গায়– কেশব তন্ময় হয়ে যায় ফুলের গানের সুরে।
এমনি করে দিনগুলো গড়িয়ে চলে ফুল আর কেশবের।
*
কারো কোমল হস্তের স্পর্শে বনহুরের সুখনিদ্রা ভঙ্গ হয়ে যায়। চোখ না মেলেই সে ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকে বিছানায়। কোনো একটা কোমল হস্ত তার ললাটে এবং চুলে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হতে থাকে।
