*
সেদিন ছিলো পূর্ণিমা, জ্যোছনা ভরা রাত।
ফুল একা বসেছিলো ঝরণার পাশে একটি পাথরখণ্ডে। জ্যোছনার আলো ঝরণার পানিতে এক অপূর্ব ছন্দের সৃষ্টি করে চলেছে। ফুরফুর হাওয়ায় অজানা ফুলের সুরভি বয়ে চলেছে। ফুল আপন মনে। একটা গান গাইছিলো।
ফুলের কণ্ঠের করুণ একটা সুর সমস্ত বনভূমির স্তরে স্তরে ছড়িয়ে পড়ছিলো।
ফুলের কণ্ঠে সুর শুনে বৃক্ষ-লতা-গুল্ম যেন তন্ময় হয়ে পড়েছিলো, বনের পশুপাখিও যেন হারিয়ে ফেলেছিলো তাদের আপন সত্ত্বা, মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলো সবাই।
সন্ন্যাসী বাবাজীর ধ্যান ভঙ্গ হয়ে গেলো সে গানের সুরে। তিনি তার আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালেন, মোহগ্রস্তের মত অগ্রসর হলেন।
গান শেষ হয়ে গেলো।
সন্ন্যাসী বাবাজী ফুলের কাঁধে হাত রেখে ডাকলেন– মা!
ফুল হঠাৎ সন্ন্যাসী বাবাজীর মধুর আহ্বানে তার বুকে মুখ লুকিয়ে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠলো।
সন্ন্যাসী বাবাজীর চোখ দুটো আদ্র হয়ে উঠলো, তিনি সস্নেহে ফুলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। এক সময় বলে উঠলেন সন্ন্যাসী বাবাজী– ফুল, আমি জানি তোমার বুকে অনেক ব্যথা লুকিয়ে আছে। মা, আমি তোমায় যোগ সাধনা শেখাবো; যে সাধনা তোমাকে ভুলিয়ে দেবে তোমার সষ ব্যথা বেদনা– সব কিছু। বাস্তব জগৎ হতে তুমি সরে আসবে অনেক দূরে।
তাই করো বাবাজী, তাই আমাকে শিখিয়ে দাও। আমি যেন আমার সমস্ত কথা, সমস্ত স্মৃতি ভুলে যাই, ভুলে যাই আমার অস্তিত্ব।
তাই হবে মা, তাই হবে। কিন্তু কেশবকে তুমি এতোটুকু করুণা করবে না মা?
আমার কোনো উপায় নেই বাবা।
মা, আমি তোমার মনের উপর কোনো জোর করবোনা। তা ছাড়া কেশব আমার হাতে গড়া ছেলে, সে নিশ্চয়ই তোমার অমতে তোমাকে কোনো রকম বিরক্ত করবে না।
হাঁ, কেশব ভাই আমাকে কোনোদিন অন্যায়ভাবে কিছু বলেনি।
মা, চলো ঘরে চলো।
চলো বাবাজী।
ফুল আর সন্ন্যাসী বাবাজী আশ্রমে ফিরে এলো।
সেদিন হতে ফুল সন্ন্যাসী বাবাজীর নিকটে যোগ সাধনা শিখতে লাগলো।
সন্ন্যাসীর সম্মুখ আসনে বসে যোগ সাধনা করতো ফুল। তার দেহে শুভ্রবসন, চুলগুলো মাথার উপর ঝুটি করে বাঁধা, ললাটে চন্দনের আল্পনা।
আসনে মুদিত নয়নে বসে থাকতো ফুল। সন্ন্যাসী বাবাজী অদূরে আর একটি আসনে উপবিষ্ট থাকতেন।
ফুল বললো– বাবাজী, কি বলব? কি বলে সাধনা করতে হয় আমি তো জানিনে?
মা, তুমি হিন্দু নারী নও, তুমি মুসলমান; আমাদের আর তোমাদের সৃষ্টিকর্তা একজন, জাতি যদিও দু’রকম। তোমাদের দেহ-মন সব আছে- তেমনি আছে আমাদের। তোমাদের দেহ ও প্রাণ আছে– আমাদেরও তেমনি। তোমাদের দেহে যেমন রক্ত-মাংসের সমাবেশ– তেমনি আমাদেরও। আমরা ডাকি ভগবান আর তোমরা ডাকো খোদা। কিন্তু নামের উচ্চারণে ভিন্নরূপ শোনা গেলেও আসলে ভগবান বা খোদা সেই একজন– যিনি সমস্ত পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা। মা, আমাদের সাধনা আর তোমাদের সাধনার রূপ ভিন্ন আকার হলেও সাধনা– সাধনাই। একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকে তুমি যেভাবে ডাকবে তাতেই। তিনি সাড়া দেবেন মা, প্রকাশ্যে তিনি কোনো দিন সাড়া দেন না, তিনি সাড়া দেন কাজের মাধ্যমে। তোমার যা মনে চায় সে ভাবে তুমি ডাকবে তোমার সেই অন্তর্যামী মহান সৃষ্টিকর্তাকে। দেখবে, ভুলে যাবে তোমার সব ব্যথা বেদনা– সমস্ত কিছু!
তাই হবে বাবাজী– তাই হবে।
সেদিনের পর থেকে ফুল সন্ন্যাসী বাবাজীর সঙ্গে বসে যোগ সাধনা করে চললো।
সন্ন্যাসী বাবাজী হিন্দু ব্রাহ্মণ আর ফুল মুসলমান কন্যা। সন্ন্যাসী বাবাজী ডাকেন তার ভগবানকে, আর ফুল ডাকে তার খোদাকে। যদিও উচ্চারণ দু’জনার দু’রকম কিন্তু আসলে একজনকেই তারা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ডেকে চলেছে।
সন্ন্যাসী বাবাজী আর কেশব ভজন গান করতো। ফুল অবাক হয়ে শুনতো। তন্ময় হয়ে যেতো। সন্ন্যাসী বাবাজী আর কেশবের ভজনের সুরে।
ফুল অবসর সময় কাটাতো বনের হরিণ-শিশু আর হরিণ-হরিণীদের নিয়ে। ফুলকে দেখলে ওরা পালিয়ে যেতো না, বরং ওকে দেখলে ওরা এগিয়ে আসতো, ঘিরে দাঁড়াতো ফুলের চারপাশে। হরিণ শিশুকে কোলে করে ফুল বসে আদর করতো, মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতো।
তখন হরিণ-হরিণী ফুলের হাত চাটতো বা চিবুক মুখে চেটে সোহাগ জানাতো।
অদূরে দাঁড়িয়ে কেশব উপভোগ করতো এ দৃশ্য। এক সময় এসে বসতো ফুলের পাশে, আবেগ ভরা কণ্ঠে ডাকতো– ফুল!
হরিণ শিশুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আনমনে জবাব দিতো ফুল– বলো?
ফুল, আমার জীবনটা কি তুমি ব্যর্থতায় ভরে দেবে?
ফুল তাকায় কেশবের মুখে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে– কেশব ভাই, যা হবার নয় কেন তুমি তা নিয়ে এতো ভাবো। আমার জীবন রক্ষাকারী তুমি, তোমাকে আমি তিরস্কার করতে পারবো না।
ফুল।
বলো?
তোমার অমতে আমি তোমাকে স্পর্শ করবো না ফুল। কিন্তু তুমি মনে রেখো, আমার জীবনে তুমিই প্রথম আমার স্বপ্ন। নারী সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞান ছিলাম ফুল, তুমিই আমার চেতনা এনে দিয়েছো। তোমাকেই আমি ভালবেসে ফেলেছি ফুল–
ফুলের গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুধারা। ঠোঁট দু’খানা কেঁপে উঠে শুধু কিন্তু কোনো কথা বলতে পারেনা।
কেশব এগিয়ে আসে আরও, ফুলের চোখে অশ্রু দেখে সে বিচলিত হয়ে উঠে, বেদনাকাতর কণ্ঠে বলে– তুমি কাঁদছো?
তাড়াতাড়ি আঁচলে চোখের পানি মুছে ফেলে বলে– না না কাঁদিনি, কাঁদিনি কেশব ভাই—
