কলকাতা! প্রথম আমি কলকাতা নগরীতেই কয়েকদিন কাটাবো ভাবছি।
বেশ, তাই ভাল।
আলম!
বলুন স্যার?
আমাদের সঙ্গে তোমার কোনো কষ্ট বা অসুবিধা হচ্ছে না তো?
ন্যা স্যার, আমি বেশ ভালই আছি, তবে দেশের জন্য মনটা বড় কাঁদছে।
আলম, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো- করবো করেও আমার সময় হয়ে ওঠেনি।
বেশ তো করুন?
আমার একবার শ্যালনকে যখন তোমার হাতে সঁপে দেবো মনস্থ করেছি তখন তোমার সম্বন্ধে আমার সব জানা উচিত; আচ্ছা আলম?
বলুন?
তোমার বাড়ি কোথায় তা আজও জানিনা।
কান্দাই শহরের এক অখ্যাত অঞ্চলে।
তার মানে?
মানে, জায়গাটা বড় সুবিধার নয়।
গ্রামাঞ্চলে বুঝি?
হাঁ, গ্রামাঞ্চলই বটে।
তা তোমার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন আছেন কি?
বাবা নেই, মা আছেন। আত্মীয়-স্বজন আছেন কিছু কিছু।
অবস্থা কেমন?
মোটামুটি আছে।
তোমার চেহারা দেখলে কিন্তু খুব বড়ঘরের ছেলে বলে মনে হয়।
আমার বাবা কান্দাই-এর বড় একজন নামকরা জমিদার ছিলেন।
সে রকম আমার ধারণা। দেখ আলম, বাংলায় গিয়ে একটা শুভদিন দেখে তোমার আর শ্যালনের বিয়েটা–
নিশ্চয়ই– নিশ্চয়ই– কিন্তু—
কিন্তু আবার কি?
আমার মায়ের বিনা অনুমতিতে আমি কিছু করতে পারবো না।
তাহলে শ্যালনকে তুমি—
আপাততঃ সম্ভব নয়।
আলম!
ঘাবড়াচ্ছেন কেন, সময় এলে সব হবে স্যার।
ম্যাকমারা আলমের হাত মুঠোয় চেপে ধরলেন–দেখ আলম, তোমাকে ছাড়া আমার শ্যালন কিছু ভাবতে পারেনা। সে শুধু তোমাকেই চায়।
বনহুর কোনো কথা বলতে পারে না।
ম্যাকমারাও নিশ্চুপ।
শুধু জাহাজের একটানা ঝক ঝক শব্দ আর সাগরের জলোচ্ছাসের গর্জন ধ্বনি ক্যাবিনটাকে মুখর : করে তুলেছে।
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললেন ম্যাকমারা– শ্যালনের খুশির জন্য আমার সব বিলিয়ে দিতে পারি। আলম, বলো তুমি কি চাও?
হাসলো বনহুর।
ম্যাকমারা বললেন– জানি তুমি বলবে না। কিন্তু মনে রেখো আলম, আমার অবর্তমানে আমার কন্যা শ্যালন সব ঐশ্বর্যের অধিকারিনী হবে। তোমার কোনো কিছুর অভাব হবে না কোনোদিন।
বনহুর এবার সোজা হয়ে বসলো, বললো সে– স্যার, আমি সব শুনেছি শ্যালনের মুখে, কিন্তু আমারও একটা কথা আছে যা বললে আপনি আপনার সংকল্প ত্যাগ করবেন।
কি এমন কথা বলো আলম?
অনেক দিন থেকে আমিও কথাটা বলবো-বলবো ভাবছি কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি। স্যার, শ্যালনকে বিয়ে করা আমার সম্ভব নয়।
চমকে ওঠেন ম্যাকমারা– কেন!
ইতিপূর্বে আমার বিয়ে হয়েছে– আমি বিবাহিত।
হেসে উঠলেন ম্যাকমারা– তাতে কি আসে যায়! আমাদের মধ্যে যত খুশি বিয়ে করা চলে, কোনো বাধা নেই।
আশ্চর্য হয়ে শুনলো বনহুর।
ম্যাকমারা বলে চলেছেন– আমি দুটি মহিলাকে স্ত্রী বলে গ্রহণ করেছিলাম। সর্বশেষ স্ত্রীর গর্ভে শ্যালন জন্মেছে।
বনহুর ঢোক গিলে বলে–ধন্যবাদ।
ম্যাকমারা বললেন এবার শ্যালনকে তুমি বিয়ে করতে রাজি হলে তাতে আমার বা শ্যালনের কোনো অমত থাকবে না।
বনহুর ভেবেছিলো, শেষ পর্যন্ত বিয়ের কথা বলে ম্যাকমারা এবং শ্যালনের হাত থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু ব্যাপারটা যত সহজ হবে ভেবেছিলো, তা হলোনা। বনহুর বেশ চিন্তাগ্রস্থ হলো।
ম্যাকমারা তখনকার মত বিদায় গ্রহণ করলেন।
বনহুর তার শয্যায় দেহটা এলিয়ে দিয়ে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো। মনের আকাশে ভেসে উঠলো পাশাপাশি দুটি মুখমনিরা আর নূরী–
মনিরার সঙ্গে দেখা করা তার একান্ত প্রয়োজন ছিলো। মা হয়তো তার অন্তর্ধানে পাগলিনী হয়ে পড়েছেন। না জানি নূর কেমন আছে। কান্দাই থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এখন সে রয়েছে। ফিরে যাবার কোনো উপায় নেই, ম্যাকমারার দলের সঙ্গে তাকে যেতেই হবে। বাংলাদেশের নামই সে শুনেছে কিন্তু এবার সে চোখে দেখবে, উপভোগ করবে বাংলাদেশের মাটির আস্বাদ।
*
সারাদিন বনে বনে কাঠ সগ্রহ করে সন্ধ্যায় আশ্রমে ফিরে আসে কেশব; ফুলের জন্য নানা জাতীয় সুস্বাধু ফল সংগ্রহ করে আনে সে।
সন্ন্যাসী বাবাজী তখন হয়তো আশ্রমের অদূরে কোনো বৃক্ষতলে ধ্যানমগ্ন রয়েছেন। কেশব কাঠের বোঝাটা মাথা থেকে নামিয়ে রেখে উঁকি দেয় কুঠিরের মধ্যে, নাম ধরে ডাকে সে– ফুল, ফুল– যোগিনীর মত ধীর-মন্থর গতিতে কেশবের পাশে এসে দাঁড়ায় ফুল, বলে– কেশব ভাই, আমাকে ডাকছো?
হাঁ ফুল, এই দেখ তোমার জন্য আজ নতুন এক রকম ফল এনেছি। কেশব কোচড় থেকে ফল বের করে মেলে ধরে ফুলের সম্মুখে নাও।
ফুল যেমন দাঁড়িয়ে ছিলো তেমনি থাকে, কোন কথা বলে না।
কেশব বলে আবার–ফুল, তোমার জন্য অনেক কষ্ট করে এ ফলগুলো আমি সংগ্রহ করেছি। ভারী সুন্দর আর সুমিষ্ট ফল।
ফুল বলে–কেন তুমি আমার জন্য এতো কষ্ট করতে যাও কেশব ভাই?
ফুল, তোমার জন্য আমি সব কষ্ট হাসি মুখে গ্রহণ করতে পারি। তবু তুমি যদি আমার প্রতি সদয় হও।
কেশব ভাই?
ফুল, তুমি যা বলবে আমি জানি, কিন্তু ফল, তুমি ছাড়া আমার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তাই বুঝি তুমি আমার—
হাঁ ফুল, তোমার অনুগ্রহ আমার কামনার বস্তু। ফুল, আমার প্রতি তুমি সদয় হও।
কেশব ভাই!
নাও, এ ফলগুলো তুমি নাও ফুল।
ফুল হাত দুটি পাতে– দাও।
শুধু আজ নয়– প্রতিদিন কেশব ফুলের জন্য বন থেকে ফল সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। কেশবের। স্বপ্ন-সাধনা সব কিছু ফুল। ফুলকে সে জীবনে ভালবেসেছে, ফুলের মধ্যে সে খুঁজে পেয়েছে নতুন এক আস্বাদ, কিন্তু ফুলকে সে কোনোদিন পাবে কিনা তা সে জানেনা।
