হাঁ, তাকে ভয় পাবার কিছু নেই, সেও মানুষ–তুমিও মানুষ।
আচ্ছা আলম, তোমার দস্যু-বন্ধু নাকি মস্ত বড় শক্তিমান?
তার সম্বন্ধে আর কি শুনেছো?
অনেক কথাই শুনেছি। দস্যু বনহুর শুধু দস্যুতাই করেনা–সে নাকি মেয়েদের চুরি করে নিয়ে যায়, তাদের জোর করে…
মিথ্যে কথা শুনেছো শ্যালন, তোমরা শুনেছো আর আমি তাকে দেখেছি। কোনো মেয়েকে সে কোনোদিন কু’অভিসন্ধি নিয়ে চুরি করেনি। কারণ আমার বন্ধু অসৎচরিত্র নয়।
খুব তো বন্ধুর প্রশংসা করছো?
সত্যি যা তা না বলে তো পারছিনে।
আচ্ছা আলম, সত্যি তোমার বন্ধু ঐ দস্যুটা?
হা।
কেমন দেখতে বলোনা ঠিক করে?
যদি বলো আমি তাকে তোমার পাশে নিয়ে আসতে পারি।
এই জাহাজে?
হ্যাঁ, এই জাহাজে।
এ তুমি কি বলছো আলম?
সত্যি কথা বলছি। জানো দস্যু বনহুর যাদু জানে? তুমি তাকে দেখবার জন্য উতলা হয়ে উঠেছে, এ কথা সে জানতে পেরেছে।
বলো কি?
সে আরও জানতে পেরেছে–তুমি তাকে নারী হরণকারী বলে দোষ দিয়েছ।
মিছে কথা।
মোটেই নয়। যাক্, চলো বাইরে ডেকের ধারে গিয়ে দাঁড়ানো যাক।
সে সময় ফিরে এলেন ম্যাকমারা, বললেন–আলম, এসো তোমার ক্যাবিনটা তোমাকে দেখিয়ে দিই।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর–চলুন।
শ্যালনও উঠে পড়লো।
শ্যালনের ক্যাবিনের কায়েকখানার পরই দস্যু বনহুরের ক্যাবিন। এ ক্যাবিনটা অন্যান্য ক্যাবিনের চেয়ে সুন্দর–পরিস্কার ঝক ঝকে।
একদম রেলিং এর ধারেই ক্যাবিনটা, পাশের শার্সী দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি।
বনহুর এ শার্সীর পাশে দাঁড়িয়ে সীমাহীন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে কত কথা। জীবনের সমস্ত ঘটনা এক এক করে ভেসে উঠে চোখের সম্মুখে। তার এই বত্রিশ বছর বয়সের ঘটনা। মা, বাবা, দস্যু কালু খাঁ, রহমান, নূরী, মনিরা, শিশু নূর-সবাই তার মনকে চঞ্চল করে তোলে। ফিরে যাবার জন্য উতলা হয়ে উঠে। আস্তানার সবাই কেমন আছে, কে কি করছে, সব জানার বাসনা জাগে তার মনে।
কিন্তু সব কথা তলিয়ে আজ বার বার মনে পড়ে নূরীর কথা। নূরীর স্মৃতি তাকে আনমনা করে তোলে। নূরীকে হারিয়ে বনহুর হারিয়েছে তার মনিরাকে। ভয় হয় মনিরার পাশে যেতে, হঠাৎ যদি নূরীর স্মৃতি মনিরার কাছে তাকে দুর্বল করে তোলে। মনিরা তার বাস্তবের রাণী আর নূরী তার কল্পনা। ক্ষণিকের জন্য নূরীকে বনহুর পেয়েছিলো, একান্ত আপন করে পেয়েছিলো, কিন্তু সে পাওয়া শুধু বেদনাই দিয়ে গেলো–আনন্দ নয়।
নূরীকে ভুলতে গিয়ে বনহুর ভুলে গেছে তার জীবনের সব কিছু। নিজেকে সে হারিয়ে ফেলেছিলো–এমন দিনে সে পেয়েছিলো মীরাকে, মীরা তার জীবনে একটা ধ্রুবতারার মত জ্বলে উঠেছিলো, কিন্তু মীরা তার মানসপটে আসন গাড়তে পারেনি। বনহুরের বুকে যখন একটা তীব্র বেদনা খা খা করে ফিরছে, তখন সে পেলো শ্যালনকে। শ্যালনের সচ্ছ সুন্দর স্বভাব তার মনকে আকৃষ্ট করলো। শ্যালনের মধ্যে বনহুর খুঁজে ফিরতে লাগলো তার নূরীকে।
হঠাৎ ক্যাবিনে প্রবেশ করলো শ্যালন, বনহুরকে অন্যমনস্কভাবে চিন্তা করতে দেখে পা টিপে টিপে অগ্রসর হলো। পিছন থেকে বনহুরের চোখ দুটো টিপে ধরলো সে।
বনহুরের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে গেলো, তার বলিষ্ঠ হাত দু’খানা দিয়ে শ্যালনের হাত দু’খানা ধরে ফেললো, শান্ত মিষ্ট কণ্ঠে বললো–শ্যালন!
খিল খিল করে হেসে উঠলো শ্যালন–আলম, কি ভাবছিলে?
বনহুর শ্যালনকে মুক্তি না দিয়ে গভীরভাবে আকর্ষণ করলো। হেসে বললো–তোমার কথা। মুখটা ওর নূয়ে এলো শ্যালনের সুন্দর সরু দুটি ঠোঁটের উপর।
শ্যালন বনহুরকে বাধা দিলোনা।
২.০৮ বাংলাদেশে দস্যু বনহুর
বনহুরের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বললো মিস শ্যালন– বড় দুষ্ট তুমি!
বনহুর কোনো কথা বললো না, মুখভাব তার গম্ভীর হয়ে উঠেছে। মুক্ত জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। একটা তীব্র অনুভূতি তার সমস্ত দেহ-মনে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে, নিজেকে বড় উত্তেজিত মনে করলো বনহুর। অধর দংশন করে বললো– যাও, যাও শ্যালন, এখানে আর এক মুহূর্ত বিলম্ব করো না– যাও তুমি–
শ্যালনের মুখভাব রাঙা হয়ে উঠেছে, হঠাৎ বনহুরের গম্ভীর হয়ে যাওয়ার কারণ সে ভেবে পেলো না। ধীর পদক্ষেপে সে ক্যাবিন ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো।
বনহুর পায়চারী করতে লাগলো, বার বার আংগুল দিয়ে মাথার চুলগুলো টেনে ছিঁড়তে লাগলো, অধর দংশন করে আপন মনে বলে উঠলো–না না তা হয়না, সে দস্যু হতে পারে কিন্তু সে লম্পট নয়। কোন অসহায় নারীর জীবনকে সে বিনষ্ট করতে পারে না। শ্যালন অবলা-অসহায় বুদ্ধিহীন, তাই বলে তার সর্বনাশ সে করতে পারেনা।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করে ম্যাকমারা, হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে ডাকে– আলম!
বলুন স্যার?
আমরা এখন বাংলাদেশ অভিমুখে চলেছি। প্রথমে কোথায় আমরা অবতরণ করবো এখনও ঠিক করিনি। তোমার কাছে এলাম কথাটা জিজ্ঞেস করতে।
বনহুর ম্যাকমারাকে আসন গ্রহণ করতে বলে নিজেও আসন গ্রহণ করলো।
ম্যাকমারা একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে বললেন– এখন আমাদের জাহাজ ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে চলেছে। আমরা দু’সপ্তাহ পর বঙ্গোপসাগরে পৌঁছতে সক্ষম হবো, তারপর আমাদের জাহাজ একসময় পৌঁছবে ডায়মণ্ড হারবার বন্দরে।
বনহুরের চোখ দুটো খুশিতে চক চক করে উঠলো, বাংলাদেশের দৃশ্যগুলো তার চোখে কল্পনার রঙ ছড়িয়ে দিলো। বললো বনহুর প্রথমে কোন্ শহরে অবতরণ করতে চান স্যার?
