মনে মনে হাসে বনহুর কত নারীর মুখে সে এ কথা শুনেছে, কিন্তু শ্যালনের মুখে যত মিষ্টি লাগছে তেমন করে বুঝি আর লাগেনি। বনহুর ভাবে–শ্যালন আর তাদের মধ্যে রয়েছে অনেক পার্থক্য। শ্যালন ফুলের মত সুন্দর-পবিত্র, যেন একগুচ্ছ রজনীগন্ধা।
বনহুর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শ্যালনের মুখের দিকে।
শ্যালন বলে- কি দেখছো?
শ্যালন!
বল আলম?
শ্যালন, আমাকে পেয়ে তুমি খুশি হয়েছে সত্য কিন্তু আমি তো তোমাকে খুশি করতে পারবো না কোনোদিন।
তার মানে?
যাক, পরে তার মানে বলবো।
না, এখনই তোমাকে বলতে হবে।
চলো তোমার ক্যাবিনে যাই।
এবার শ্যালন খুশি হলো, বললো–চলো, সত্যি এতোক্ষণ তোমাকে আমার ক্যাবিনে নিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিলো। বাবাটা যেন কি, কোথায় যে কি কাজ নিয়ে মেতে আছেন কে জানে।
যাক, উনি ব্যস্ত আছেন।
বনহুরকে নিয়ে শ্যালন নিজের ক্যাবিনে আসে।
সেখানে পৌঁছতেই প্রফেসার ম্যাকমারাকে দেখতে পেলো ওরা। ম্যাকমারা বললেন–হ্যালো আলম আমি তোমাদের জন্যেই অপেক্ষা করছি। এসো আলম, এসো তোমরা। বসো। ম্যাকমারা হাত দিয়ে পাশের আসন দুটো দেখিয়ে দিলেন।
বনহুর আর শ্যালন আসন গ্রহণ করলো।
ম্যাকমারা সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেট অগ্নি সংযোগ করে একমুখ ধোয়া ছাড়লেন, তারপর গম্ভীর গলায় বললেন–আলম, আমরা কোথায় চলেছি এখনও তোমাকে জানানো হয়নি। শ্যালনও শোনেনি।
শ্যালন বলে উঠলো–আমরা হাঙ্গের শহরে আমাদের দেশে ফিরে যাচ্ছি।
না মা, দেশে ফিরে যাচ্ছিনে।
তবে কোথায় যাচ্ছে বাবা?
সে এক নতুন দেশে। এবার কথা বললো বনহুর–নতুন দেশ!
হা। বাংলাদেশে যাবো এবার।
শ্যালন ও বনহুর এক সঙ্গে উচ্চারণ করলো বাংলাদেশ!
আমরা বাঙানি হয়েও আজও বাংলাদেশ চোখে দেখিনি। বাংলাদেশের কাহিনী শুনে আমাদের মনে কত কথা জেগেছে, বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য নাকি মানুষকে অভিভূত করে ফেলে…একটু আনমনা হয়ে যান ম্যাকমারা।
প্রফেসার ম্যাকমারার কথাগুলো বনহুরের মনেও আঁচড় কাটে। সত্যি, সেও তো বাঙালির ছেলে, অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কোনো পরিচয় নেই। বনহুর মায়ের মুখে শুনেছে, তাদের পূর্ব-পুরুষের একজন বাংলাদেশ থেকে কান্দাই চলে আসেন কোনো কার্যোপলক্ষে। তারপর তিনি আর ফিরে যান নি। স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে কান্দাই শহরের বাইরে একটি ভাল জায়গা দেখে ঘর বাঁধেন। কিন্তু চৌধুরী বংশের অমর্যাদা করেননা। কান্দাই শহরেও তিনি ঘরবাড়ি তৈরি করে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন, বহু জমি জায়গা তিনি সন্তান-সন্ততিদের জন্য ক্রয় করেন, এবং কান্দাই শহরে চৌধুরী পরিবার রূপে পরিচিত হন। বনহুরের পিতা এই চৌধুরী বংশেরই সন্তান।
ম্যাকমারার কথায় বনহুরের ধমনীতে জেগে উঠলো এক নতুন উন্মাদনা। বাংলাদেশের স্বপ্ন সে দেখেছে কিন্তু বাংলার আস্বাদ সে পায়নি। নূরীকে হারিয়ে বনহুর ভেবেছিলো বাংলায় যাবে কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়ে তা হয়ে ওঠেনি। মনে মনে খুব খুশি হলো বনহুর।
ম্যাকমারা বলতে শুরু করলেন–আফ্রিকার জঙ্গল আমার মনে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে তার পরিপূর্ণ আশায় আমি বাংলায় যেতে চাই। জানিনে, সেখানে আমি সম্পূর্ণ শান্তি ফিরে পাবো কিনা। আলম, তুমি যদি আমাদের সঙ্গে থাকো তবে আমি অনেক খুশি হবো।
শ্যালন বলে উঠলো-উনি তো আমাদের সঙ্গেই রয়েছেন।
বনহুর বললো–কিন্তু আমার একবার কান্দাই যাওয়া দরকার ছিলো।
কান্দাই! চমকে উঠে কথাটা বললেন ম্যাকমারা।
হ, কান্দাই আমার দেশ।
শ্যালন ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো–দস্যু বনহুরের নাম তাহলে জানা আছে তোমার?
কান্দাই যখন আমার বাড়ি তখন নিশ্চয়ই তার সঙ্গে আমার জানাশোনা থাকতে পারে।
বলো কি আলম! বললেন ম্যাকমারা।
হাঁ, দস্যু বনহুর আমার পরিচিত ব্যক্তি।
আশ্চর্য তো! বললেন ম্যাকমারা। আচ্ছা আলম, তুমি তাকে দেখেছো?
বললাম তো সে আমার পরিচিত জন।
সত্যি বলছো?
হাঁ শ্যালন।
এমন সময় ক্যাপ্টেন এসে ডাকলেন–প্রফেসার, একটু আসুন, আপনার সঙ্গে কথা আছে।
ম্যাকমারা ক্যাপ্টেনের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন।
শ্যালনের চোখের বিস্ময় কাটেনি তখনও, বললো সে কেমন দেখতে দস্যু বনহুর?
তোমার কেমন মনে হয়?
বলোনা, দস্যু বনহুর কেমন দেখতে?
তাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি?
না না, তাকে দেখতে চাইনে….
কেন?
দস্যু বনহুর নাম শুনলেই আমার বুকটা ধক ধক্ করে।
তাহলে তার চেহারার বর্ণনা শুধু শুনতে চাও?
হ।
যদি বলি ঠিক আমার মত।
যাও ঠাট্টা করোনা…শ্যালন বনহুরের সোফার হ্যাণ্ডেলে বসে গলা জড়িয়ে ধরে–তোমার মত সুন্দর হবে দস্যু বনহুর, কি যে বলো!
তাহলে ধরো তোমার সেই গরিলা মহাশয়ের মত।
যাও ও কথা বলোনা, গরিলাটার কথা মনে হলে এখনও আমার প্রাণ শুকিয়ে যায়।
আর দস্যু বনহুরের কথা শুনে কেমন হয়?
উঃ! কি সাংঘাতিক দস্যু সে; গরিলা তবু ভাল! তার চেয়েও অতি ভয়ঙ্কর ঐ দস্যু বনহুর। দিনে দুপুরে লোকের বুকে ছোরা বসাতে এতোটুকু কুণ্ঠা বোধ করেনা।
কিন্তু শ্যালন, তুমি জানোনা–সে আমার বন্ধু।
তোমার বন্ধু, আশ্চর্য!
আশ্চর্য হবার কিছু নেই শ্যালন, দস্যু বলে সেকি মানুষ নয়? যাক সে তো আর এ জাহাজে আসছে, তার কথা শুনে কোনো লাভ নেই।
না, তোমাকে আরও বলতে হবে। তুমি যখন দস্যু বনহুরের বন্ধু, তাহলে তাকে আমি ভয় করিনে, তোমার সঙ্গে থাকলে সে আমাকে নিশ্চয়ই কিছু বলবেনা।
