বনহুর শাল-বৃক্ষের অদূরে আর একটা মাঝারি বৃক্ষ বেয়ে দ্রুত উপরে উঠে গেলো, এবং কৌশলে সে চলে এলো পাশের বিরাট বৃক্ষটায়।
বনহুর সতর্ক কণ্ঠে ডাকলো–শ্যালন, শ্যালন…
কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকলো বনহুর-শ্যালন…
এবার করুণ ভয়ার্ত একটি কণ্ঠস্বর–আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও…
শ্যালন…শ্যালন…
আলম! আলম…
আমি এসেছি, শ্যালন ভয় নেই আমি এসেছি। বনহুর অতি কৌশলে শাখা বেয়ে এগুতে লাগলো শ্যালনের দিকে। অনেক চেষ্টায় কিছুক্ষণের মধ্যে বনহুর পৌঁছে গেলো শ্যালনের পাশে। সুউচ্চ শাখার দুটি ডালের ফাঁকে একটু চওড়া জায়গায় শ্যালনকে রেখেছে গরিলা। জানে, এখানে কেউ তার পুতুল মেয়ের সন্ধান পাবেনা। তাই বুঝি নিশ্চিন্ত মনে দূরে কোথাও ঘুরতে গেছে।
বনহুর নিকটে পৌঁছতেই শ্যালন তাকে জড়িয়ে ধরলো–আমাকে বাঁচাও আলম। আমাকে বাঁচাও…
ভয় নেই শ্যালন। তুমি সাহস নিয়ে আমার সঙ্গে নামতে চেষ্টা করো।
কিন্তু আমি তো গাছে উঠতে জানিনে, নামতেও জানিনে, কি করে নামবো? আমি তোমাকে কিছুতেই ছেড়ে দেবোনা।
তাহলে তোমাকে নিয়ে নামবো কি করে? তুমি বরং আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো, আমি এ গাছ। থেকে ও গাছে যাবো। ঐ গাছটা তবু খাটো আছে, এবং ডালপালা বেশ উঁচু নীচু আছে। নামতে তেমন কষ্ট হবেনা।
শ্যালন তার হাত দু’খানা দিয়ে বনহুরের কাঁধটা বেশ করে ধরে আস্তে আস্তে এগুতে লাগলো। ওকে বাম হস্তে ধরে রাখলো এঁটে।
বনহুরের প্রচেষ্টায় অল্পক্ষণেই শ্যালন নেমে এলো নিচে। আনন্দ আর ধরেনা শ্যালনের, বনহুরের গণ্ড সে চুমোয় চুমোয় ভরে দিলো।
বনহুর হেসে বললো–আগে চলো তাঁবুতে। এখানে বিলম্ব করা আমাদের এক মুহূর্ত উচিৎ নয়। কারণ তোমার সেই প্রিয় নায়ক মহাশয় এসে যেতে পারেন।
সত্যি, তুমি না হলে ওর হাত থেকে কেউ আমাকে রক্ষা করতে সক্ষম হতোনা। আবার শ্যালন বনহুরের কণ্ঠ তার সরু দুটি বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে।
বনহুর এবার তার জবাব দেয়, শ্যালনের কোমল নরম গণ্ডে কঠিন দুটি ওষ্ঠের ছাপ পড়ে। কিন্তু বনহুর আর দেরী করেনা, শ্যালনের হাত ধরে দ্রুত অগ্রসর হয় সে তাঁবুর দিকে।
*
তাঁবুতে ফিরে আসতেই প্রফেসার ম্যাকমারা কন্যাকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর অনেক রোদন। করলেন। বনহুরকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবেন, ভাষা খুঁজে পেলেন না।
বনহুর বললো–ধন্যবাদ জানাবার সময় এখন নেই, এখানে বিলম্ব হলে আবার সে আক্রমণ করতে পারে, কাজেই তাড়াতাড়ি সরে পড়তে হবে। বনহুর নিজেও তাবু গুটাতে ওদের সাহায্য করলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই ওরা রওয়ানা দিলো।
*
প্রফেসার ম্যাকমারা তার দলবল নিয়ে ফিরে চলেছেন, কিন্তু মনে তার পূর্ণ আনন্দ নেই। আসার সময় তারা এসেছিলেন যতগুলো কিন্তু ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের মধ্যে কয়েক জনকে বিসর্জন দিয়ে। বড় বেদনা, বড় দুঃখ এটাই প্রফেসারের সবাই মিলে ফিরে যেতে পারলেন না।
পথে তেমন কোনো বিপদের সম্মুখীন আর হলোনা তারা। তবু একটা আশঙ্কা ছিলো–না জানি কোন মুহূর্তে আবার সেই গরিলা মহারাজ হামলা চালিয়ে বসে। কিন্তু গরিলা মহারাজ আর তাদের আক্রমণ করলোনা। হয়তো সে তার ছোট্ট মেয়েটার জন্য বনে, জঙ্গলে হাতড়ে ফিরছে।
জাহাজে উঠে তবে সবাই নিশ্বাস নিয়ে বাঁচলো।
বনহুরকে তারা এ গহন জঙ্গলে একা ছেড়ে দিলোনা, তাকেও প্রফেসার ম্যাকমারা তাদের জাহাজে সঙ্গে যাবার জন্য অনুরোধ জানালেন।
রাজি না হয়ে কোনো উপায়ও ছিলোনা বনহুরের।
আফ্রিকার জঙ্গল ত্যাগ করে জাহাজ সাগরবক্ষে ভাসলো।
জাহাজে সবার মনেই আনন্দের বান বয়ে যাচ্ছে, আফ্রিকার জঙ্গল হতে প্রাণ নিয়ে ফেরা–এ কম কথা নয়!
মিস শ্যালনের আনন্দ সবচেয়ে বেশি, প্রাণ নিয়ে ফেরার আনন্দের চেয়ে তার আনন্দ অনেক বেশি, কারণ আফ্রিকার জঙ্গলে সে খুঁজে পেয়েছে তার সাথী–তার কামনার জনকে। বনহুর শ্যালনের জীবনে পরম এক সম্পদ।
শ্যালন সব কিছু কষ্ট-ব্যথা ভুলে গেলো, খুশিতে সে আত্নহারা আলম তার সঙ্গে আছে। সে ভাবতেও পারেনি, আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে এমন একটি ব্যক্তিকে সে সাথীরূপে খুঁজে পাবে।
রেলিংএর ধারে পাশা পাশি বনহুর আর শ্যালন দাঁড়িয়ে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলো। বনহুর তাকিয়ে ছিলো দূরে সরে যাওয়া কালো রেখার মত দাগটার দিকে। দাগটা আসলে অন্যকিছুই নয়, আফ্রিকার জঙ্গলটা ক্রমে দূরে সরে গিয়ে একটা রেখার মত মনে হচ্ছিলো।
বনহুর তাকিয়ে ছিলো সে দিকে, প্রায় সপ্তাহ কাল তাকে এ জঙ্গলে কাটাতে হয়েছে, প্রতি মুহূর্তে তাকে মৃত্যুর সঙ্গে বোঝা পড়া করে চলতে হয়েছে। আজ সে জঙ্গল ত্যাগ করে সে চলেছে…আফ্রিকার জঙ্গলের সঙ্গে রয়ে গেলো তার এক গভীর সম্বন্ধ।
শ্যালন বনহুরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে–কি এতো ভাবছো, আলম?
বনহুর ফিরে তাকায় শ্যালনের উজ্জ্বল দীপ্তময় সরল মুখখানার দিকে, হেসে বলে–ভাবছি। আফ্রিকার জঙ্গলটা কেন ত্যাগ করলাম।
উ! কি সাংঘাতিক মানুষ তুমি!
কেন?
আফ্রিকার জঙ্গলের মায়া এখনও তুমি ত্যাগ করতে পারোনি! আমি কিন্তু আর কোনদিন ঐ মৃত্যুভয়াল আফ্রিকার জঙ্গলে যাবোনা।
শ্যালন, মৃত্যুকে তুমি খুব ভয় করো, না?
তোমার বুঝি মৃত্যুকে ভয় নেই?
না শ্যালন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে আমার আনন্দ।
তাই তো তুমি ঐ মৃত্যুভয়াল জঙ্গলটাকে এতো ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু জানো, আমি তোমাকে। আর কোনোদিন ঐ জঙ্গলে যেতে দেবোনা। আলম, তোমাকে পেয়ে আমি কত যে খুশি হয়েছি কি বলবো!
