*
তারপর কেটে গেছে বেশ কিছু মাস, ফুল নতুন জীবন লাভ করেছে। সেদিনের সেই বলিষ্ঠ পুরুষটিকে স্পষ্ট করে দেখেছে, জেনেছে তাকে সে তার কামনার-সাধনার সেই লোক নয়। এ হলো তার জীবন-রক্ষক কেশব।
কেশব ওকে বাঁচিয়ে তুলেছে, ওর কাছে ঋণী সে সর্বতোভাবে। তাই বলে তাকে ভালবাসা যায় না।
ফুল কেশবকে শ্রদ্ধা করে, সমীহ করে, কিন্তু ওকে বিয়ে করতে পারেনা।
ফুল ওকে বিয়ে করতে না চাইলে কি হবে, সন্ন্যাসী বাবাজীও ফুলকে নির্জনে ডেকে বললেন কেশবকে বিয়ে করো। ওকে বিয়ে না করলে আমার তপস্যা নষ্ট হয়ে যাবে।
চমকে উঠলো ফুল–বাবা!
হাঁ মা, আমার জীবনের জীবন হলো ঐ কেশব। ওকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে আমি আমার সর্বস্ব ত্যাগ করে সন্ন্যাসী সেজেছি, শুধু ঐ কেশবকে জীবিত রাখার জন্যে…
বাবাজী, আমি যে বিবাহিতা!
শুনেছি, কেশব আমাকে সেকথা বলেছে।
কি করে আমি কেশব ভাইকে স্বামী বলে গ্রহণ করবো, বাবাজী? এক নারীর কি দুই স্বামী থাকতে পারে?
কেন পারে না মা? তোমাদের মুসলমান ধর্মে না থাকলেও আমাদের হিন্দু ধর্মে চলে।
বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠে ফুল–কোনোদিন তো এমন দেখিনি!
হা দেখোনি, কিন্তু শুনে থাকবে। আমাদের দ্রৌপদীর পঞ্চপতি ছিলো।
বাবাজী!
মা, আমার কেশবের মুখ চেয়ে ওকে তোর বিয়ে করতেই হবে। তাছাড়া তোর স্বামী বেঁচে আছে না নেই, তাও তো জানিসনে। আর আপত্তি করিসূনে মা।
ফুল বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বাবাজীর কথার কোনো জবাব দিতে পারেনা, চলে যায় সেখান হতে। কুঠির মধ্যে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় মাটির বিছানায় খেজুর পাতার চাটাই বিছিয়ে নিদ্রামগ্ন কেশব। পাশের জানালা দিয়ে বেলা শেষের সূর্যাস্ত কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেছে। সে আলোকে কেশবের মুখখানা বড় করুণ বলে মনে হলো, বড় ম্লান বড় অসহায় সে মুখ।
নির্বাক নয়নে ফুল তাকিয়ে আছে কেশবের ঘুমন্ত মুখের দিকে। মনে পড়ে তার আর একখানা। মুখের কথা, না জানি সে মুখ আর জীবনে সে দেখতে পাবে কিনা। ফুলের চোখের সামনে মিশে যায় কেশবের মুখ, তার মানসপটে আঁকা মুখখানা স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠে। কেশব অদৃশ্য হয়, জেগে উঠে তার হারানো জন।
ফুল নিজের অজ্ঞাতে গিয়ে বসে কেশবের শিয়রে, হাত রাখে ওর মাথার চুলে। ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে চলে সে।
হঠাৎ নিদ্রা টুটে যায় কেশবের, চোখ মেলে তাকায়।
সঙ্গে সঙ্গে পালাতে যাচ্ছিলো ফুল।
কেশব পথ রোধ করে দাঁড়ায়–থামো।
না না, আমাকে যেতে দাও কেশব ভাই! আমাকে যেতে দাও।
তবে কেন এসেছিলে বলো? ফুল, জানি তুমি আমাকে ভালবাসো, কিন্তু কেন তোমার এতো দ্বিধা?
না না, আমি তোমাকে ভালবাসিনে। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি।
ফুল!
পথ ছাড়ো কেশব ভাই?
না, আমি তোমার পথ ছাড়বো না।
কেন?
ফুল, নারী কি বস্তু আমি জানতাম না। নারী সম্বন্ধে আমার কোনো উত্তেজনা ছিলো না। কিন্তু তুমি–তুমিই আমার চোখে নারীর রূপ তুলে ধরেছে। আমার হৃদয়ে তুমিই জাগিয়েছো পৌরুষত্ব ভাব। আমার ধমনীতে তুমিই…
থামো থামো কেশব ভাই, দয়া করে থামো।
ফুল!
গভীর বেদনা ভরা দৃষ্টি নিয়ে এগুতে থাকে কেশব ফুলের দিকে ফুল, আমার হৃদয় তুমি শুস্ক মরুভূমি করে দিও না। যদি তাই করতে চাও, তবে কেন এসেছিলে আমার পাশে। কেন আমার মাথায় তুমি হাত রেখেছিলে? বলো বলো ফুল?
আজকের মত আমাকে মুক্তি দাও।
মুক্তি! ফুল, তুমি আমার কাছ থেকে কোনোদিন মুক্তি পাবে না। আমার সাধনা তুমি। কেশব ওর হাতখানা ধরে ফেলে চট করে। আবেগ ভরা কণ্ঠে ডাকে–ফুল!
কেশবের বলিষ্ঠ হাতের মুঠায় ঘেমে উঠে ফুলের নরম কোমল হাতখানা। নিজেকে বাঁচিয়ে নেবার জন্য সে প্রাণপণ চেষ্টা করে চলে। কিন্তু কেশবের হাতের মুঠা থেকে নিজের হাতখানা ছাড়িয়ে নিতে পারে না ফুল।
এমন সময় বাবাজীর কণ্ঠ শোনা যায়–কেশব! কেশব!
কেশব ফুলকে মুক্ত করে দিয়ে বেরিয়ে আসে কুঠির হতে, বলে–বাবা, তুমি ডাকছো?
হাঁ। শোন কেশব, রাজবংশের ছেলে হলেও তুমি আজ আমারই সন্তান। সন্ন্যাসী-পুত্র হয়ে কোনো অসংযত কাজ করা অন্যায়। ফুলকে তুমি ভালবাসতে পারো কিন্তু স্পর্শ করতে পারো না।
বাবাজী, আমাকে ক্ষমা করুন।
যাও, আজ হতে সাবধান থাকবে, বুঝলে?
কেশব নতমস্তকে বেরিয়ে গেলো সেখান হতে।
*
অদ্ভুত জীবটা যে পথে চলে গেলো বনহুর ঠিক সে পথেই অগ্রসর হলো। সে জানে, ঐ ভয়ঙ্কর সাংঘাতিক জীবটা যে রাস্তায় চলে যাবে সে পথে সহজে কোনো হিংস্র জন্তু আসবে না।
বনহুর বেশ কিছুটা অগ্রসর হলো। এদিকে ক্রমান্বয়ে ডিজেল-ইঞ্জিনের মত শব্দটা মিলিয়ে যেতে লাগলো। বনহুর তবু চলেছে। হঠাৎ একটা গাছের ডালে দৃষ্টি চলে গেলো তার। মস্ত বড় একটা শালগাছ। উঁচু একটা ডালে সাদা ওড়নার মত কিছু ঝুলছে বলে মনে হলো। বনহুর ভালভাবে লক্ষ্য করতেই বেশ বুঝতে পারলো–উঁচু ডালের একটি ফাঁকে মিস শ্যালনকে রাখা হয়েছে। আশে-পাশে কোথাও গরিলা মহারাজ আছে কিনা দেখে নিয়ে বনহুর গাছটার গুঁড়ির নিকটে এসে দাঁড়ালো।
বিরাট উঁচু গাছ। গাছের গুঁড়িটা প্রায় চল্লিশ হাত প্রশস্ত হবে। নিচের দিকে কোনো ডালপালা না থাকায় বনহুর খুব চিন্তায় পড়লো। গাছে উঠা তার সমস্যা হবে না, কিন্তু শ্যালনকে নিয়ে নামাটা মুস্কিল হবে। সুচতুর গরিলা তার খেলনা মেয়েটিকে এবার গুহায় না নিয়ে গিয়ে রেখেছে গাছের ডালের ফাঁকে, যেখান থেকে সে নিজেও নামতে পারবে না বা কেউ তাকে চুরি করেও নিয়ে যেতে পারবে না।
