ফুল!
হাঁ, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
কোথায় তোমার স্বামী? কে তোমার স্বামী?
জানিনে সে এখন কোথায় জানিনে তার সন্ধান।
কে–কে তোমার স্বামী, ফুল? বলো, বলো কে তোমার স্বামী?
আজ নয়, বলবো–আরও পরে বলবো তার পরিচয়।
কেন কিসের জন্য তোমার স্বামীর পরিচয় তুমি গোপন রাখতে চাও?
তা ও জানাবো পরে।
কিন্তু ফুল, বিয়ের নাম করে তুমি আমাকে ফাঁকি দিতে পারবেনা। যদি সত্যিই তুমি বিবাহিত হও তবু তোমাকে আমি গ্রহণ করতে রাজি আছি।
তা হয়না।
ফুল, কেন তুমি নিজেকে এভাবে বিনষ্ট করছো? যাকে তুমি হারিয়েছে তাকে আর কোনোদিন ফিরে পাবে কিনা সন্দেহ। সে এখন জীবিত না মৃত তাই বা কে জানে।
কেশব ভাই, ও কথা বলোনা। আমার মন বলছে সে জীবিত আছে।
ফুল, মনের কাছে তোমার এ দূর্বলতা শোভা পায়না। যদি সে জীবিতই থাকে ক্ষতি কি, সেতো আর এখানে ফিরে আসবেনা কোনোদিন। ফুল, এসো আবার আমরা নতুন করে ঘর বাধি? এই সুন্দর আকাশ, সুন্দর বাতাস, এই গহন বনের নিস্তব্ধতা, পাখির গান, ঝরণার কল কল ধ্বনি। সব আমরা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করি। বাবা এতে খুশি হবেন, আশীর্বাদ করবেন আমাদের দুজনাকে। ফুল…
কেশব ফুলের হাতখানা ধরে ফেলে।
ফুল ওর বলিষ্ঠ হাতের মধ্য থেকে হাতখানা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে বলে–কেশব ভাই, তোমাকে আমি শ্রদ্ধা করি সমস্ত মন-প্রাণ দিয়ে…
না না শ্রদ্ধা আমি চাইনে, আমি চাই তোমাকে। ফুল, আমি তোমাকে ছাড়া কিছুই চাইনে। তুমি মুসলমান; আমি হিন্দু ব্রাহ্মণ সন্তান, তবু আমি তোমাকে কোনো সময় ভিন্ন মনে করিনি। তুমি বিবাহিত জেনেও আমি তোমাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারবোনা, তুমি আমার নয়নের আলো।
কেশব ভাই, ছেড়ে দাও–ছেড়ে দাও আমার হাত।
আগে কথা দাও তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
যা সম্ভব নয় কি করে তা হবে বলো, কেশব ভাই?
কেন কিসের জন্য সম্ভব নয়, তুমি বিবাহিত আর আমি অবিবাহিত, তাই?
না। আমি এর জবাব দিতে পারবোনা। ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও আমাকে…ফুল কেশবের হাতের মুঠা থেকে নিজের হাতখানা ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে পালিয়ে যায়।
কেশব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ফুলের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে।
কেশব কোনোদিন মেয়ে মানুষ দেখেনি, সে আজীবন এই গহন বনে পবর্তের গুহায় সন্ন্যাসী রঘু বাবাজীর আশ্রয়ে মানুষ। তার জীবনে ফুল নতুন এক সৃষ্টি। ফুলকে সে যখন প্রথম দেখলাৈ তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলো ভীষণভাবে। তার আর ফুলের মধ্যে সে তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করেছিলো পার্থক্যটা। ফুলকে সে আবিষ্কার করেছিলো এক নতুন আস্বাদ নিয়ে।
ফুলকে সে শিকার করতে গিয়ে বনের মধ্যে তীরবিদ্ধ অবস্থায় কুড়িয়ে পেয়েছিলো। অজ্ঞান ফুলকে কাঁধে বয়ে নিয়ে এসেছিলো সে আশ্রমে। প্রথমে ওকে মৃত মনে করেছিলো কিন্তু আশ্রমে নিয়ে আসার পর সন্ন্যাসী বাবাজী ওকে পরীক্ষা করে বলেছিলো–ওর মৃত্যু হয়নি, এখনও সে জীবিত। সন্ন্যাসী বাবাজী এবং কেশবের অক্লান্ত সেবা-যত্নে ফুল জীবন লাভ করেছিলো।
ফুলকে বাঁচাতে গিয়ে কেশব অনেক কষ্ট স্বীকার করেছে।
সন্ন্যাসী বাবাজীর কথা মত তাকে বন হতে বনান্তরে গাছ-গাছড়া হতে ঔষধ সংগ্রহ করতে হয়েছে। ফুলের শরীর থেকে অত্যন্ত রক্তপাত হওয়ায় তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছিলো। হতাশ হয়ে পড়েছিলেন সন্ন্যাসী বাবাজী।
কিন্তু কেশব হতাশ হয়নি, সন্ন্যাসী বাবাজী যা বলেছেন সে ভাবে সে কাজ করে গেছে। গহন বনে একরকম ফুল পাওয়া যায়। সে ফুল ভক্ষণ করলে শরীরে রক্ত জন্মে। কিন্তু সে ফুল সংগ্রহ করা অতি মারাত্নক ব্যাপার। রক্তপায়ী বৃক্ষেই জন্মে সে ফুল। কেশব মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সে ফুল সংগ্রহ করে আনতো, আর সন্ন্যাসী বাবাজী সে ফুলের রস তৈরি করে খাওয়াতো যুবতীকে।
এভাবে যুবতীর দেহে রক্ত সৃষ্টি করলো তারা। একদিন সত্য সত্যই যুবতী আরোগ্য লাভ করলো। কেশব ওকে অবাক হয়ে দেখতো, ভাল লাগতো ওর।
তারপর যুবতীর সান্নিধ্য কেশবকে নতুন এক জীবন দান করলো। সে নিজের মধ্যে অনুভব করলো পৌরুষচিত মনোভাব। যুবতীর নাম কেশবই রেখেছিলো ফুল। কারণ ফুলের রস খেয়েই ও বেঁচে উঠলো।
কিন্তু যুবতী বেঁচে উঠলেও সে তার পরিচয় জানালোনা সন্ন্যাসী বাবাজী বা কেশবের কাছে।
কেশবের মনে দাগ কাটলো ফুল। কেশব ওকে ভালবেসে ফেললো অত্যন্ত গভীরভাবে।
সন্ন্যাসী বাবাজী বুঝলেন, তিনি বাধা দিলেন না কেশবকে। কারণ তিনি নিজেও নিজের জীবনটাকে বিফল করে ফেলেছেন। কেশব যাতে তার জীবনটা শুস্ক মরুর মত করে না তোলে সেজন্য তিনি লাগাম ছেড়ে দিলেন।
কেশব ইচ্ছামত ফুলের সঙ্গে মিশতো।
কেশব মিশতে চাইলেও ফুল সরে থাকতো কেশবের কাছ থেকে। কিন্তু কেশবের অবুঝ অন্তরের কাছ হতে সরে যেতে পারতোনা। সে জোর করে ওকে টেনে নিয়ে আসতো সন্ন্যাসী বাবার পাশ থেকে।
হাসতেন সন্ন্যাসী বাবাজী, ভাবতেন দোষ কি মিশতে একদিন ওদের বিয়ে দেবেন মনস্থির করে। নিলেন।
ফুল যখন জ্ঞান লাভ করেছিলো তখন সে প্রথম দেখেছিলো ছায়ার মত একটি বলিষ্ঠ পুরুষকে। তার মন ভরে উঠেছিলো আশায়, আনন্দে, হাত বাড়িয়ে তার হাতখানা ধরেছিলো, বুকে মাথা রেখে শান্তি লাভ করেছিলো। কিন্তু যে মুহূর্তে সে তার কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলো– বাবা, এ এমন করছে কেন। গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে সরে গিয়েছিলো ফুল। তারপর আর কোনোদিন ওর বুকে মাথা রাখেনি সে। দৃষ্টিশক্তি সচ্ছ হলে সে দেখেছিলো–যাকে সে পরিচিত আপনজন বলে মনে করেছে–এ সে নয়। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলো ফুল সেদিন।
