যুবতী বলে উঠলো –সেই শিশু এখন কোথায় বাবা?
তিরিশ বছর আগের সেই শিশু আজও কি শিশু আছে মা। সে এখন যুবক, তার আগের সে কচি রূপ এখন আর নেই, সে হয়েছে একজন বলিষ্ঠ সুন্দর সবলদেহী পুরুষ।
তবে কি?
হ্যাঁ, মা সেই শিশুই আমার আজকের এই কেশব।
বাবাজী, আপনি সত্যিই অপরূপ মানুষ। আপনার মহৎ হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে আমি ভাষা হারিয়ে। ফেলেছি–
মা, তাই আমি তোর কাছে একটা দাবি জানাই। আমার কেশবকে গ্রহণ করে ওকে সার্থক কর মা, ওকে সার্থক কর।
বাবা, জানো না, তা কিছুতেই সম্ভব নয়।
কেন, কেন তা সম্ভব নয়? আমার কেশব কোনো হীন বা নীচু ঘরের সন্তান নয়। আমার কেশব অমূল্য সম্পদ।
বাবা, আমি আপনার কেশবের যোগ্য নই।
কেন, কিসে তুই যোগ্য নস মা?
আমার পরিচয় যদি জানতে তাহলে আমাকে তুমি কিছুতেই একথা বলতে না।
মা, তুই মানুষ–এইতো তোর বড় পরিচয়। এর বেশি আমার জানতে হবে না। তাছাড়া কেশব তোকে চায়–মা, আমি যে কেশবের জন্য সব মেনে নিতে পারি।
বাবা, আমি মুসলমান, একথা জেনেও–
সন্ন্যাসী বাবাজীর চোখ দুটো ধক্ করে জ্বলে উঠলো, পর মুহূর্তে বললেন তিনি একথা তুমি এতোদিন বলোনি কেন?
হয়তো আপনি আমাকে—
ত্যাগ করবো এই ভয়ে, না?
হ্যাঁ, আমি যখন জানতে পারলাম আপনারা ব্রাহ্মণ জাতি তখন আমার ভয় হলো আমি মুসলমান কন্যা, আপনি ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী। মাথা গুজবার একটু স্থান তবু পেয়েছি তাও যদি হারিয়ে যায়, তাই–
তাই তুমি গোপন করে আসছো তোমার পরিচয়?
হা।
কিন্তু একথা জানো না সন্ন্যাসীদের কোনো বিশিষ্ট ধর্ম বলে কিছু নেই। তাদের কাছে সবাই সমান হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান সব এক। তুমি মুসলমান বেশতো, তোমার ধর্ম তুমি মেনে চলবে, কেশব তার নিজের ধর্ম মেনে চলবে, তাতে কোনো দোষ নেই। আমি এখনই কেশবকে ডেকে তার মতামত জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছি। এবার উচ্চ-কণ্ঠে ডাকলেন সন্ন্যাসী বাবাজী–কেশব–কেশব!
কক্ষে প্রবেশ করলো কেশব–বাবা!
কেশব তুমি বসো, কথা আছে তোমার সঙ্গে।
বাবা, আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি। আমার জীবন ইতিহাস থেকে ফুলের জাতি ধর্ম সব শুনেছি।
সন্ন্যাসী শব্দ করে উঠলেন –সব শুনেছো?
হ্যাঁ বাবা। আমি কে, কি আমার পরিচয়–তুমি আমার কে, সব শুনেছি। বাবা–আমি জানতাম তুমি আমার পিতা, কিন্তু তুমি আমার পিতা নও, তবু তুমি আমার রক্ষক পিতার চেয়েও বড় তুমি–
কেশব!
বাবা, এতোদিন তুমি আমার কাছে সব গোপন রেখে ভালই করেছো।
জানি নে ভাল করেছি কি মন্দ করেছি। অনেকদিন ভেবেছি তোর পরিচয় তোকে জানিয়ে তোর আত্মীয়-স্বজনের কাছে তোকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবো। কিন্তু তোর মায়া আমাকে সব কাজ থেকে বঞ্চিত করেছে, তোকে আর ফিরিয়ে দিতে পারিনি।
এটাই তুমি ভাল করেছো বাবা! তোমার স্নেহময় বন্ধনে আমি মানুষ-জীবন লাভ করেছি। আমি খুঁজে পেয়েছি আমার জীবনটাকে। তোমার অনেক আপত্তি সত্ত্বেও আরাকানে আমি গিয়েছি। দেখেছি। শহরের মানুষ নামের জীবগুলোকে। যাদের মানুষের মত সব আছে–নেই মানুষের মত প্রাণ। রাজবংশের ব্যক্তিদের সঙ্গেও আমার পরিচয় ঘটেছে–কিন্তু আমি তাদের আচরণে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। রাজবংশের জীব বলে তাদের যে অহঙ্কার, সে অতি সাংঘাতিক। মানুষকে তারা মানুষ বলে মানে না, তারা সবাইকে নগণ্য ঘূণ্য জীব বলে মনে করে। অর্থ আর নারী পিপাসা তাদের অন্ধ করে ফেলেছে। বাবা আমি ওদের মনের পরিচয় পেয়ে শিউরে উঠেছি, পালিয়ে এসেছি তাদের সংশ্রব থেকে। কি জঘন্য, কি সাংঘাতিক ওদের মনোবৃত্তি!
সন্ন্যাসী বাবাজীর চোখে মুখে বিস্ময়, অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তিনি তাকিয়ে আছেন কেশবের মুখের দিকে! কথাগুলো বলতে গিয়ে কেশবের সুন্দর মুখমণ্ডল রক্তাভ হয়ে উঠেছে, ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত হয়ে উঠেছে ওর। বললেন সন্ন্যাসী বাবাজী–ধন্য কেশব, ধন্য তুমি! আমার সাধনা সার্থক হয়েছে।
বাবা!
কেশব, তোমার আত্ম-পরিচয় পেলাম, এবার তোমার হৃদয়ের পরিচয় চাই। ফুলকে তুমিই গহন বন হতে কুড়িয়ে এনেছিলে। তোমার প্রচেষ্টায় সে জীবন লাভ করেছে। তুমিই ওকে বাঁচিয়েছো, কাজেই আমি ফুলকে তোমার হাতেই সঁপে দিয়ে নিশ্চিত হতে চাই। কিন্তু তার জাতি ধর্ম তোমার। স্বজাতি নয়–সে মুসলমান কন্যা।
আমি সে কথাও শুনেছি–একটু পূর্বে ফুল যখন আপনাকে তার কথা জানাচ্ছিলো।
সে মুসলমান জেনেও তাকে বিয়ে করতে চাও?
হা।
খুশি হলাম তোমার কথা শুনে কেশব।
মানুষ মানুষই তার আবার জাতি ধর্ম কি?
*
ফুল, আর কতদিন আমাকে এভাবে বঞ্চিত করবে?
কেশবের কথায় চমকে উঠলো ফুল, বললো আমি তোমার আশাকে কোনোদিন পূর্ণ করতে পারবো না। কেশব ভাই, আমি তোমার কাছে ঋণী…কিন্তু সে ঋণ শোধ করবার মত আমার কিছু নেই।
আমি শুধু তোমাকে চাই। ফুল, আমি আর কিছু চাই নে। বাবা বলেছেন তোমার-আমার বিয়ে। হবে তাতে কোন বাধা নেই। তবে কেন, কেন তোমার এতো আপত্তি?
কেশব ভাই একটা কথা আমি আজ তোমাকে বলবো?
বলো?
কেশব ভাই, আমি জানি তুমি আমাকে রক্ষা না করলে হয়তো এতদিন আমি মিশে যেতাম মাটির বুকে। আমার কোনো অস্তিত্ব থাকতো না। আমার জন্য তুমি অনেক কষ্ট করেছো একথা আমি কোনোদিন অস্বীকার করবোনা বা করতে পারবোনা।
কিন্তু…
বলো-থামলে কেন?
বিয়ে আমি কোনোদিন করতে পারবোনা।
কেন?
কেশব ভাই, আমি বিবাহিত…
