বাবাজী আজ আমি সব তোমাকে খুলে বলবো, কিন্তু তারপর তুমি আমাকে আর এক তিল এখানে রাখবেনা।
ছিঃ মিছেমিছি ওসব চিন্তা করছিস কেন মা?
বাবাজী, আমি বড় অসহায়!
তাইতো তোকে আমি আমার মায়ের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছি।
তাহলে কেন তুমি বার বার ঐ কেশবের কথা বলো বাবাজী?
মা–এই কচি বয়স, সুন্দর ফুলের মত একটি জীবন এভাবে নষ্ট করে দিবি? তাছাড়া কেশব মন্দ ছেলে নয়। তার বংশ মর্যাদা, তার আত্ম-পরিচয়, তার সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা, তার পৌরুষোচিত স্বভাব। সবই যে কোনো নারীর কামনার বস্তু। তাই আমি বলেছিলাম ওকে স্বামী বলে গ্রহণ করে তোরা সুখের সংসার বাঁধবি। জীবনে আমি যা পাইনি তা থেকে আমি কাউকে বঞ্চিত করতে চাইনে।
বাবাজী, তুমি যা বলছো আমি সব বুঝতে পেরেছি, কিন্তু তা হবার নয়।
একই কথা আর কতদিন শোনাবি মা?
যতদিন আমি নিজের মনকে শান্ত করতে না পারবো।
মা, আজ তোকে বলতেই হবে।
কি বলবো বাবাজী?
তোর পরিচয়।
আমিতো বলেছি আমার কোনো পরিচয় নেই।
তা হয়না; মানুষ হয়ে জন্মেছিস অথচ পরিচয় নেই–এ কখনও হতে পারে!
অতি অশোভনীয় আমার পরিচয়–
আমি তোর পিতৃস্থানীয়, আমার কাছে এতো সঙ্কোচ কেন মা? জানিস্ মা, এই নির্জন গহন বনে আমি কি করে এলাম?
না বাবা, আমি জানিনে।
তবে আমার পরিচয়টা আগে শুনে রাখ।
যুবতী অবাক হয়ে শুনতে থাকে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বাবাজীর কথাগুলো।
সন্ন্যাসী বাবাজী বলেন–মা, আজ থেকে তিরিশ বছর আগে আমি আরাকান শহরের একজন নাগরিক ছিলাম। ধনকুবের শিবাজী রঘু নামে আমি শহরে পরিচিত ছিলাম। আমার কাজ ছিলো বাণিজ্য করা। দেশ-বিদেশ থেকে আমার মাল আসতো, আর নিজের দেশের মাল চালান দিতাম। আমি বিভিন্ন দেশে সওদাগর বা বণিক হিসেবে আমি লোকের কাছে পরিচিত হলেও আসলে সওদাগরি নামটা ছিলো আমার খোলস মাত্র; আসলে আমার ব্যবসা ছিলো পরের ধন লুটে নেয়া। জাহাজে আমার যে সব মাল দেশ-বিদেশে যেতো সেগুলো সত্যিকারের মাল থাকতো না আজে বাজে জিনিসে জাহাজ ভর্তি থাকতো। আর তার মধ্যে থাকতো আমার বিশ্বস্ত অনুচরগণ।
বাবা।
হাঁ মা, কিন্তু আজ আমি আর সেই তিরিশ বছর আগের শিবাজী রঘু নই– হাঁ কি বলছিলাম মা? হাঁ, জাহাজ ভর্তি আমার অনুচর থাকতো, তাদের সঙ্গে থাকতো মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্র। জল পথে আমার বাণিজ্য চলতো, কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ দেখলেই আমার ইংগিতে আমার অনুচরগণ তৈরি হয়ে নিতো। তারপর সেই জাহাজটিকে আক্রমণ করে, যাত্রীদের করা হতো নির্মমভাবে হত্যা, আর তাদের মালপত্র সব লুটে নেয়া হতো। ঐ সব মালপত্র আমার খালি জাহাজ ভর্তি হয়ে উঠতো। তারপর ফিরে চলতাম স্বদেশে। লোকে জানতো–সওদাগরি করে ফিরে এলাম–
যুবতীর চোখে-মুখে বিস্ময়, একটি কথাও তার মুখ দিয়ে বের হচ্ছেনা। নির্বাক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে সে সন্ন্যাসী বাবাজীর মুখের দিকে।
সন্ন্যাসী বাবাজী বলে চলেন– একদিন একটা জাহাজ লুট করে নেবার সময় আমার অনুচরগণ একটি মহিলাকে হত্যা করে তার সন্তানটিকে কেড়ে নেয়, তারপর সে শিশুটিকে সাগরবক্ষে নিক্ষেপ করে তামাসা দেখবে বলে প্রস্তুত হয়ে নেয়। আমি সে মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হই, হৃদয়হীন পাষাণ হলেও এ দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারিনি। আমার অনুচরটির হাত থেকে শিশু সন্তানটিকে ছিনিয়ে নেই, শিশু আমাকে জড়িয়ে ধরে। মনে হয় সে আমর বুকে আশ্রয় পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছে। আমি তাকে হত্যা করতে পারিনে, নিয়ে আসি আমার আস্তানায়। পরে জানতে পারি, সে শিশুটি আরাকানের রাজবংশের ছেলে। কিন্তু আর তাকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি, তার মাকে আমরা হত্যা করেছি কার কাছেই বা ফিরিয়ে দেবো। সে শিশুই আমার জীবনে আনে পরিবর্তন।
থামলেন সন্ন্যাসী বাবাজী, দু’চোখে তার অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তিনি বহুদিন আগের দৃশ্যগুলো স্মরণ করে চললেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন মা, বলতে যখন শুরু করেছি তখন সব। বলবো। শিশুটিকে পেয়ে ভুলে গেলাম আমি আমার পাপ-কার্য। আমার অনুচরগণ আমার মধ্যে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো। আমি তাদের মনোভাব বুঝতে পেরে আশংকিত হলাম। আমার ভয় হলো, শিশুটিকে ওরা হত্যা করে না বসে। দল থেকে সরে রইলাম, গোপনভাবে শিশুটিকে বাঁচাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু দলের সমস্ত অনুচর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করলো, তারা নতুন দলপতি বানিয়ে আমাকে পর্যন্ত নিহত করবার মতলব আটতে লাগলো।
যুবতীর মুখে কোনো কথা নেই, সে স্তব্ধ হয়ে শুনছে সন্ন্যাসী বাবাজীর কথাগুলো। অস্ফুট কণ্ঠে বললো সে–তারপর বাবাজী?
হাঁ মা, তারপর আমি শিশুটিকে বাঁচাবার জন্য উতলা হয়ে উঠলাম, তার সঙ্গে নিজেকেও বাঁচাতে হবে। আমি একা আর আমার বিদ্রোহী অনুচরগণ প্রায় একশতেরও বেশি। শুধু সংখ্যায় তারা বেশি বলে নয়, তাদের আচরণ অতি নৃশংস, দয়া-মায়া বলে তাদের প্রাণে কিছু ছিলো না। যে কোনো মুহূর্তে আমাকে ওরা হত্যা করতে পারে। শিশুটিকে বাঁচাতে চাই বলেই তাদের কাছে আমি এতোবড় দূর্বল। মনের সঙ্গে অনেক দ্বন্দ্ব করলাম, ভাবলাম কি হবে একটা শিশুর নাগপাশে বন্দী হয়ে। জীবনে। কোনোদিন কাউকে ভালবাসিনি–বাসতে পারিনি, অর্থের লালসা আমাকে উন্মাদ করে তুলেছিলো, অর্থই আমাকে দিয়ে ছিলো প্রাণ। তবু পারলামনা শিশুটির মায়ার কাছে আমি পরাজিত হলাম। অর্থ ঐশ্বর্য সব সরে গেলো, সব মোহ কেটে গেলো আমার শিশুটিকে বুকে পেয়ে। মা, বিয়ে আমি জীবনে করিনি। নারীকে আমি প্রথম জীবন থেকেই শ্রদ্ধা করতাম। মায়ের আসনে আমি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম তাদের, তাই নারীকে ভালবেসেও আমি গ্রহণ করতে পারিনি। শিশুটিই আমার সব আশা পূর্ণ করেছিলো। ওর মধ্যেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার জীবনের সব পাওয়া। মায়ায় আকৃষ্ট হয়ে আমি ভুলে গেলাম আমার পাপ জীবন। আমি আমার পাপ কাজ উপার্জিত সব ঐশ্বর্য ত্যাগ করে একদিন নিরুদ্দেশ হলাম। আমার সঙ্গী শুধু সেই শিশু সন্তান আর মাত্র কিছু খাবার। মা, সেই হতে আমি এ গভীর জঙ্গলে পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করে রইলাম। গাছের ফল আমার ক্ষুধা নিবারণ করে, আর ঝরণার পানি আমার পিপাসা নিবারণ করে। সে শিশুই আমার জীবনে এনেছিলো পরিবর্তন। আমি সন্ন্যাস-ধর্ম গ্রহণ করে সেই হতে এই গভীর জঙ্গলে বাস করছি। আমার সঙ্গী-সাথী এবং আমার অনুচরগণ আমার সন্ধান করেও আর আমাকে খুঁজে পায়নি।
