বিস্ময়ের ধাপ আরও চরমে উঠলো বনহুরের, যখন সে নিজের চোখে দেখলো সর্পরাজের সমস্ত দেহটা অদ্ভুত জীবটার উদর মধ্যে প্রবেশ করেছে। সেকি ভীষণ মুখ গহ্বর! সর্পরাজের দেহটা যেন কোথায় উড়ে গেলো।
জীবটা এবার একটু ঝাঁকুনি দিয়ে নড়ে উঠলো, বোধ হয় সর্পরাজের বিরাট দেহটাকে তার উদর মধ্যে গুছিয়ে গোলা করে নিলো।
বনহুরের দুচোখে রাজ্যের বিস্ময়, জীবটা আবার গড়াতে গড়াতে চলে গেলো গহন বনের মধ্যে। জীবটার নাসিকার ডিজেল ইঞ্জিন ধরনের শব্দ সমস্ত বনভূমিকে কম্পিত করে তুলেছে।
জীবটা অদৃশ্য হতেই বনহুর ঝোপের মধ্যে হতে বাইরে বেরিয়ে এলো। হাঁফ ছেড়ে যেন নিশ্বাস নিলো। অদ্ভুত জীবটাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলো সে।
বনহুর হাতঘড়িটা দেখে নিলো, সর্পরাজের কবল থেকে নিজেকে সে আজ উদ্ধার করতে পারতো কিনা সন্দেহ। এসবে তার প্রায় তিন ঘন্টা কেটে গেছে, বনহুর আবার দক্ষিণ হস্তে রিভলভার চেপে ধরে অগ্রসর হলো।
*
সন্ন্যাসী বাবাজী ওর পিঠে হাত রেখে শান্ত কণ্ঠে বললো–মা, আজও তুই তোর পরিচয় আমাকে জানালিনা? জানিনা কে তুই, কোথায় তোর ঘর–
বাবাজী, তুমি আমাকে মা বলে ডাকো–এই তো আমার পরিচয়। তোমার মত পুত্রের মা হবার সৌভাগ্য কি আমি আমার তুচ্ছ নামের আড়ালে ঢাকা ফেলতে পারি।
বেশ তুই যা ভাল মনে করিস তাই হবে। তবে জানিস মা আমার মত বুড়ো ছেলের মা হয়ে চিরদিন কাটাতে পারবিনা।
কেন, কেন বাবাজী?
এই কচি নতুন বয়স, বুড়ো ছেলের মা হয়ে নষ্ট করে দিবি?
বাবাজী, তুমি তো জানো–আমি বয়সে কচি হলেও মন আমার কচি নয়। এ বয়সে আমার জীবনে এসেছে কত পরিবর্তন, কত ব্যবধান। আমি নামে মাত্র বেঁচে আছি, জীবনে আমি মৃত।
মা!
বলো, আমায় মা বলে ডাকো বাবাজী।
মা, আর তোকে কোনো কথা জিজ্ঞাসা করে মনঃকষ্ট দেবোনা। বেশ, তুই তোর বুড়ো ছেলের মা হয়েই থাক। চলে গেলো সন্ন্যাসী বাবাজী।
যুবতী হঠাৎ আঁচলে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। দু’চোখে নেমে এলো অশ্রুর বন্যা।
এমন সময় পাশে এসে দাঁড়ালো আশ্রমের এক যুবক, নাম ওর কেশব। কেশব ডাকালো-ফুল!
চোখ তুলে তাকালো যুবতী–কেশব ভাই!
ফুল, কান্নাই কি তোমার সাথী?
হাঁ, কেশব ভাই।
অতো কাঁদলে তুমি বাঁচবে কি করে ফুল?
কাঁদতে পাই বলেই বেঁচে আছি আজও।
ফুল, বাবাজী তোমাকে কি বললেন?
আমার পরিচয় তিনি জানতে চান।
হাঁ, তোমার পরিচয় শুধু তিনি নন, আমরাও জানার জন্য সর্বক্ষণ উৎসুক হয়ে রয়েছি। কিন্তু জানি নে, তোমার পরিচয় কেন তুমি গোপন রাখো?
আমার কোনো পরিচয় নেই। আর যে পরিচয় আছে তা বলে আমি নিজকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো না।
ফুল, সব সময় তুমি শুধু হেঁয়ালী ভরা কথা বলো। তোমার কথা কিছুই আমরা বুঝতে পারি নে। কে তুমি, কোথায় তোমার ঘর, কি তোমার পরিচয়?
কেশব ভাই!
না, আমি তোমার কেশব ভাই নই। ফুল, আমাকে তুমি শুধু কেশব বলে ডাকবে।
আশ্চর্য হয়ে তাকায় ফুল কেশবের মুখে।
কেশব বলে চলে–ফুল, আমি তোমাকে ভালবাসি—
কিন্তু জানো না আমাতে তোমাতে কত প্রভেদ।
আমি জানতে চাইনে কোন কথা। ফুল, আমি তোমাকে ভালবাসি, তোমাকে আমি বিয়ে করবো!
তা হবার নয়।
আমিই তোমাকে খুঁজে পেয়েছি, আমিই তোমার জীবন রক্ষা করেছি
তবুও সম্ভব নয়।
ফুল!
হাঁ।
কিন্তু কতদিন তুমি আমার কাছ থেকে সরে থাকতে পারবে?
যতদিন তোমার মন সচ্ছ না হবে।
ফুল!
জানি তুমি কি চাও কেশব ভাই।
আবার তুমি আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করছো?
তুমি আমার জীবন রক্ষা করে আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছে, কাজেই তোমাকে আমি কোনোদিন অশ্রদ্ধা করতে পারবোনা।
তাই বুঝি?
হাঁ, আমার অন্তরের শ্রদ্ধা দিয়ে তোমাকে ভাই-এর আসনে প্রতিষ্ঠা করেছি। কেশব ভাই, তুমি—
ভাই-ভাই-ভাই–ও শব্দ আমি শুনতে পারিনে। আমাকে তুমি কিছু বলে ডেকোনা।
তুমিও আমাকে ফুল বলে আর ডেকোনা। যদি ডাকো বোন বলে ডেকো। ফুল আমার নাম নয়।
ফুলের মত তুমি সুন্দর, তাই আমি তোমাকে ফুল বলে সম্বোধন করেছিলাম, কিন্তু—
কিন্তু কি? কি বলতে চাও তুমি?
কিন্তু সে নামের মর্যাদা তুমি রাখলেনা।
আমি ফুল নই, কাজেই ফুলের মর্যাদা আমি চাইনে।
এমন সময় সন্ন্যাসী বাবাজীর আবির্ভাব হয়, ডাকে সে-মা।
বাবাজী!
তোমাদের আবার কি হলো মা?
কেশব দ্রুত চলে যায়।
সন্ন্যাসী বাবাজী বলেন–আমার কাছে লুকোসনে মা। জানি কেশব তোকে ভালবেসে ফেলেছে, তাই সে–
বাবা!
মা, সে যদি আজ তোকে না রক্ষা করতো তাহলে জীবনে বেঁচে থাকতে পারতিস্ নে।
বাবাজী–
জানি, সব জানি, কিন্তু কেশবকে তুই বিমুখ করতে পারিসূনে। সে পুরুষ–তুই নারী। মা, আমি তোর সন্তান, তবু বলছি, বলতে বাধ্য হচ্ছি তোদের উভয়েরই প্রয়োজন উভয়কে।
বাবাজী–বাবাজী।
জানি তোর লজ্জা, আমি সন্ন্যাসী আজীবন নারী জাতিকে আমি মায়ের আসনে স্থান দিয়ে এসেছি। তবু আমি বলছি, তোরা দু’জন দু’জনাকে বিয়ে করে সুখী হবি।
তা সম্ভব নয় বাবাজী। তা সম্ভব নয়—
কেন মা?
বাবাজী।
বসো মা, কথা আছে তোমার সঙ্গে।
যুবতী বসলো সন্ন্যাসীর পাশে।
সন্ন্যাসী বাবাজী ইতোপূর্বে আসন গ্রহণ করেছিলেন, এবার তিনি বললেন–মা, আজ প্রায় বছরের বেশি হয়ে এলো তুই এসেছিস আমার আশ্রমে, কিন্তু আজও তুই মনের কথা আমাকে খুলে বলিস নি। আমিও তেমন করে জানতে চাইনি, কারণ যখনই তোকে তোর পরিচয় জানাতে বলেছি বা চেয়েছি। তখনই তোর চোখে-মুখে আমি দেখেছি এক গভীর বেদনার ছাপ তাই আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস আমার হয়নি। একটু থেমে পুনরায় বললেন সন্ন্যাসী জানিনে কে মা তুই? কোথা হতে এসেছিলি? কি করেই বা তোর এ অবস্থা হয়েছিলো?
