বনহুর গতকাল যে পথে অগ্রসর হয়েছিলো আজও ঠিক সে পথেই অগ্রসর হলো, যদিও সে বুঝতে পেরেছে আজ শ্যালনকে নিয়ে গরিলা আগের দিনের সেই গুহায় যায়নি। অবশ্য বনহুরের সন্দেহ গরিলা পূর্বের দিনের সাবধানতার চেয়ে আজ অন্যভাবে সে সতর্ক হয়েছে। কিন্তু বনহুর গরিলার চেয়ে অনেক বেশি ধূর্ত। গরিলার জন্ম জঙ্গলে, আর বনহুরও মানুষ হয়েছে জঙ্গলে। জঙ্গল দেখলেই বনহুরের মনে আনন্দ হয় বেশি। হিংস্র জীব-জন্তু বনহুরের যেন সহচর। ভয়ের চেয়ে ওদের বেশি ভালবাসে সে, মনে হয় ওরাই যেন তার আপন জন।
আবার ওদের সঙ্গেই হয় তার লড়াই, এতে বনহুর দুঃখের চেয়ে বেশি তৃপ্তিবোধ করে, বড় বড় হিংস্র ব্যাঘ্র বা সিংহের সঙ্গে লড়াই করার পর যখন সে তাদের পরাজিত করে ঘর্মাক্ত কলেবরে সোজা হয়ে দাঁড়ায় তখন সে রাজ্য জয়ের মত আনন্দ উপভোগ করে।
অদ্ভুত চরিত্র বনহুরের। সে মানুষের মত মানুষ–পুরুষের মত পুরুষ।
বনহুর শপথ গ্রহণ করেছে শ্যালনকে সে উদ্ধার করবেই করবে। বন জঙ্গল ভেদ করে সে অগ্রসর হচ্ছে। চারদিকে তার নিপুণ দৃষ্টি। বাম হস্তে টর্চ ও দক্ষিণ হস্তে রিভলভার, কোমরের বেল্টে সূতীক্ষ্ণ ধারাল ছোরা।
দেহে মজবুত শিকারীর ড্রেস, পায়ে বুট, মাথায় ক্যাপ; মাঝে মাঝে প্যান্টের পকেট থেকে দূরবীণ বের করে চোখে লাগিয়ে দেখছিলো সে।
তাদের তাবু ছেড়ে বেশ অনেক দূরে চলে এসেছে বনহুর।
একটা উঁচু মত জায়গায় দাঁড়িয়ে চোখে দূরবীণ লাগিয়ে দূরে লক্ষ্য করছিলো, হঠাৎ তার পিছনে বিরাট কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করলো, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দাঁড়ালো বনহুর, কিন্তু ফিরে দাঁড়িয়েই সে অবাক হলো। বিরাট একটা অজগর তার দেহটা সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ধরেছে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই একটা অজগর বনহুরের পিছন থেকে তাকে আক্রমণ করে ফেলেছে। টিলাটার পাশেই জঙ্গলে ছিলো সে, বনহুর একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো সে সুযোগে সর্পরাজ সুযোগ করে নিয়েছেন।
অজগর বনহুরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলো যে একটু নড়তে পারছে না। বনহুরের হাত দুখানাও সর্পরাজের দেহের আবেষ্টনীতে আটকা পড়ে গেছে।
অল্পক্ষণেই বনহুর পড়ে গেলো মাটিতে।
অজগর আর বনহুরের মধ্যে চললো ভীষণ ধস্তাধস্তি। বনহুর তার দক্ষিণ হাতখানা বের করে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু অজগরটা পূর্বের সেই অজগরের চেয়ে দ্বিগুণ আকার : হবে। তার দেহেও ছিলো অসীম বল। বনহুর যেন আর পেরে উঠছিলো না।
ঠিক সেই মুহূর্তে অদ্ভুত একটা আওয়াজ তার কানে এলো। যেন ডিজেল ইঞ্জিনের হুস হুস শব্দের মতই মনে হলো। বনহুর আর সর্পরাজ তখনও সমানে লড়াই করে চলেছে। বনহুরের ইচ্ছা থাকলেও দেখবার উপায় নেই, যুদ্ধ করছে বটে কিন্তু কান তো আর বন্ধ নেই। বনহুর শুনতে পাচ্ছে শব্দটা ক্রমান্বয়ে এদিকে এগিয়ে আসছে, সে কি ভীষণ শব্দ! সত্যিই কি তবে কোনো ডিজেল ইঞ্জিন পথ ভুল করে আফ্রিকার জঙ্গলে প্রবেশ করেছে।
শব্দটা অতি নিকটে মনে হলো। বনহুরের কানে যেন তালা লেগে আসছে। সে কি ভীষণ আওয়াজ।
আচমকা একটা অনুভূতি অনুভব করলো বনহুর, সর্পরাজের নাগপাশ থেকে সে মুহূর্তে মুক্তিলাভ করলো। সর্পরাজ ট্রেনের হুইসেলের মত একটা তীব্র আওয়াজ করে ফিরে দাঁড়ালো।
বনহুর তখন ভীষণ হাঁপিয়ে পড়েছে, সম্মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার নির্ভীক প্রাণ শিউরে উঠলো। অদ্ভুত একটা জীব তার বিরাট দেহ নিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসছে। জীবটার পা বলতে কিছু নেই, হাতও নেই, দেহটা একটা মস্তবড় শাল বৃক্ষের গুঁড়ির মত গোলাকার লম্বায় প্রায় দু’শো হাতের বেশি হবে। মুখ বা মাথাটা একটা জালা বা ড্রামের মত; দু’পাশে দুটো সাদা ধপধপে সূতীক্ষ্ণ দাঁত বেরিয়ে আছে, আগুনের গোলার মত দুটো চোখ, মাথাটা চ্যাপটা ড্রামের তলার মত সেকি অদ্ভুত জীব, নাকের দুটো ছিদ্রি যেন দুটো উনুনের গর্ত। সেই বিরাট চোঙ্গের মত ছিদ্র দিয়ে ডিজেল ইঞ্জিনের মত শব্দের সঙ্গে সঙ্গে গরম হাওয়া বের হচ্ছিলো।
সর্পরাজ বনহুরকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত পালাতে গেলো, কিন্তু অদ্ভুত জীবটা সর্পরাজের পিছন দিকটা তার জালার মত মুখে চেপে ধরলো।
বনহুর কিছুদূর দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে, সে আশ্চর্য হলো অদ্ভুত জীবটার কার্য কলাপ দেখে। সর্পরাজের
লেজটা চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে সাপটা আর একচুলও এগুতে পারলোনা, ছটফট করতে লাগলো। সাপটা। বনহুর বুঝতে পারলো–সর্পরাজের চেয়ে দ্বিগুণ শক্তি রাখে জীবটা তার দেহে। আরও অবাক হলো বনহুর জীবটা ক্রমান্বয়ে সর্পরাজকে মুখের মধ্যে টেনে নিচ্ছে।
সর্পরাজ জীবন রক্ষার জন্য ভীষণভাবে ছটফট করতে লাগলো। জীবটার নিশ্বাসে বনহুরের মনে হলো আশে পাশে ভীষণ ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে কানফাটা ডিজেলের শব্দ।
বনহুর হতবুদ্ধির মত এই অদ্ভুত জীব দুটির কার্য লক্ষ্য করতে লাগলো। একটু পূর্বে যে সর্পরাজ তাকে গ্রাস করার জন্য কি সংগ্রামই না শুরু করে ছিলো, এখন তাকেই গ্রাস করতে চলেছে আফ্রিকার জঙ্গলের এক অজানা ভয়ঙ্কর জীব।
বনহুরের হৃদপিণ্ড ধক ধক করছে, সে দুর্দান্ত হতে পারে কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর সাংঘাতিক জীব সে কোনোদিন দেখেনি। একটা ঘন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বনহুর দেখছে শেষ পর্যন্ত সর্পরাজের ভাগ্যে কি হয়।
